এক ভাই সারাক্ষণ গান গায়, জোরে কথা বলে বা টেবিলে টোকা দেয়। অন্য ভাই বা বোনটি বারবার বলে, “চুপ করো”। কিন্তু তাতেও কাজ হয় না। একসময় বিরক্তি চরমে পৌঁছে বড় ঝগড়া বাধে।
বেশির ভাগ পরিবারই এমন ঘটনাকে স্বাভাবিক ভাইবোনের ঝগড়া বলে মনে করে। কিন্তু সব সময় কি বিষয়টি এতটা সহজ?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্বের পেছনে থাকে একেবারেই ভিন্ন একটি কারণ—ইন্দ্রিয়গত চাহিদার পার্থক্য।
সব ঝগড়ার কারণ এক নয়
একজন শিশু বেশি শব্দ, আলো কিংবা নড়াচড়ায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে। অন্যজন একই পরিবেশেই অস্বস্তিতে পড়তে পারে।
ফলে একজন যখন নিজের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণে শব্দ করছে বা নড়াচড়া করছে, অন্যজন সেটিকেই অসহ্য বলে অনুভব করছে।
এক্ষেত্রে কেউই ভুল করছে না। বরং তাদের মস্তিষ্ক পরিবেশকে ভিন্নভাবে অনুভব করছে।
বিশেষ করে অটিজম, মনোযোগঘাটতিজনিত সমস্যা (এডিএইচডি) বা অন্যান্য স্নায়ুবিক বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে এমন পার্থক্য বেশি দেখা যায়।
কেন হয় এই দ্বন্দ্ব?
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, প্রত্যেক মানুষের ইন্দ্রিয়গত চাহিদা আলাদা। কেউ বেশি শব্দ, স্পর্শ বা নড়াচড়ায় স্বস্তি পান, আবার কেউ শান্ত পরিবেশ, কম আলো বা কম শব্দেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন একই পরিবারের দুই সদস্যের চাহিদা একেবারে বিপরীত হয়।
ধরুন, এক শিশু গান গেয়ে বা শব্দ করে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে চায়। কিন্তু তার ভাই বা বোনের কাছে সেই শব্দই মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনাও বড় ধরনের দ্বন্দ্বে রূপ নিতে পারে।
তাহলে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমেই বুঝতে হবে—এটি ইচ্ছাকৃত আচরণ নয়। শিশুকে “দুষ্ট”, “বদমেজাজি” বা “অতিরিক্ত সংবেদনশীল” বলে দোষারোপ না করে তার ইন্দ্রিয়গত চাহিদা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
খোলামেলা কথা বলুন
শিশুর বয়স অনুযায়ী সহজ ভাষায় বোঝান, সবার মস্তিষ্ক একইভাবে কাজ করে না। কেউ বেশি শব্দ পছন্দ করে, কেউ কম। এতে কারও কোনো দোষ নেই।
এ ধরনের আলোচনা শিশুদের নিজেদের এবং ভাইবোনের পার্থক্য সহজে মেনে নিতে সাহায্য করে।
নিরিবিলি থাকার জায়গা রাখুন
যে শিশু কম শব্দ বা কম আলোতে স্বস্তি পায়, তার জন্য বাড়িতে একটি শান্ত কোণ রাখা যেতে পারে।
আলাদা ঘর না হলেও সমস্যা নেই। ছোট একটি নিরিবিলি জায়গাই অনেক সময় যথেষ্ট।
বেশি উদ্দীপনা প্রয়োজন এমন শিশুর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করুন
যে শিশু বেশি নড়াচড়া, শব্দ বা খেলাধুলার মাধ্যমে স্বস্তি পায়, তার জন্য এমন একটি জায়গা রাখা যেতে পারে, যেখানে সে অন্যদের বিরক্ত না করে নিজের মতো সময় কাটাতে পারে।
প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করুন
শব্দ কমানোর হেডফোন, রোদচশমা, চাপ কমাতে সহায়ক খেলনা বা অন্যান্য সহায়ক উপকরণ অনেক শিশুর জন্য উপকারী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা দেখা দেওয়ার পর নয়; বরং আগেভাগেই এগুলো ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
শুধু শিশুরাই নয়, বাবা-মায়েরও প্রয়োজন আছে
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, অনেক সময় বাবা-মায়ের ইন্দ্রিয়গত চাহিদাও সন্তানের সঙ্গে মিল নাও থাকতে পারে। তাই নিজের ক্লান্তি বা অস্বস্তিকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
প্রয়োজনে কিছু সময় নিরিবিলি থাকা, হেডফোন ব্যবহার করা বা আলো-শব্দ নিজের স্বস্তিমতো নিয়ন্ত্রণ করাও স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়।
শেষ কথা
সব ভাইবোনের ঝগড়ার পেছনে যে হিংসা, রাগ বা প্রতিযোগিতাই কাজ করে, এমন নয়।
অনেক সময় এর মূল কারণ এমন ইন্দ্রিয়গত পার্থক্য, যা বাইরে থেকে চোখে পড়ে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের সদস্যরা যদি এ বিষয়টি বুঝতে শেখেন এবং সবার চাহিদাকে সমান গুরুত্ব দেন, তাহলে অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব অনেকটাই কমে আসতে পারে।
কারণ অনেক সময় ঝগড়ার আসল কারণ ভাইবোন নয়; বরং তাদের মস্তিষ্কের পৃথিবীকে ভিন্নভাবে অনুভব করার ধরন।









