৫০ টাকার গাছ ৪০০ টাকায় কিনে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, এক মাসেই যাচ্ছে মরে

লিখন আহমেদ, সিরাজগঞ্জ 
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০১ আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১২

সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় চলতি বছর সিরাজগঞ্জে ৪০ হাজারের বেশি গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে রোপণের এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক চারা মারা গেছে এবং যাচ্ছে। একই সঙ্গে জেলার কয়েকটি ইউনিয়নের নথিপত্রে বাজারমূল্যের কয়েক গুণ দামে গাছ কেনা ও রোপণের ব্যয় দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন সরকারি দফতর ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এসব গাছ লাগানো হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের নথিতে চারা কেনা ও রোপণের পাশাপাশি বাঁশের খুঁটি, বেড়া, পানি দেওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে রোপণের পর এসব কার্যক্রমের তেমন দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

বাজারদরের চেয়ে ৭-৮ গুণ ব্যয়

উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ব্যয়ে অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির জন্য ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই অর্থে ৪৬৯টি গাছ লাগানো হয়েছে। এতে প্রতি গাছের পেছনে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৯৯ টাকা।

তবে স্থানীয় নার্সারির একাধিক মালিক জানান, এসব প্রজাতির চারা ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি করেন তারা। সে হিসাবে উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের দেখানো ব্যয় স্থানীয় বাজারদরের তুলনায় সাত থেকে আট গুণ বেশি।

পাশের রায়গঞ্জ উপজেলার ঘুড়কা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, তাদের ইউনিয়নে ১ হাজার ৮০০টি গাছ লাগানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতি গাছে ৬৫-৭০ টাকা করে খরচ হয়েছে।

উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শামসুল আলম বলেন, ‘বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করেছেন উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন। প্রতি গাছের জন্য প্রায় ৪০০ টাকা করে ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে পরিচর্যা ও বাঁশের খুঁটির খরচও রয়েছে।’

লাগানোর পরই মরছে চারা

উধুনিয়ার বাংলাপাড়া সড়কের একটি অংশ ঘুরে দেখা যায়, সেখানে লাগানো প্রায় ২০০টি গাছের মধ্যে অন্তত ৫০টি পুরোপুরি মারা গেছে। আরও কয়েকটি গাছ মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে। অনেক জীবিত চারাও শুকিয়ে গেছে। কিছু গাছ পড়ে গেছে বা হেলে রয়েছে।

চারাগুলোর আশপাশে নিয়মিত পানি দেওয়ার দৃশ্যমান কোনও চিহ্ন দেখা যায়নি। অধিকাংশ গাছে গবাদিপশু ও মানুষের চলাচল থেকে রক্ষার জন্য বাঁশের খুঁটি বা বেড়াও ছিল না। ফলে রোপণের পরপরই অনেক চারা শুকিয়ে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, গাছগুলোর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত পরিচর্যা করতে তারা দেখেননি। নিয়মিত পানি দেওয়া ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হলে অনেক চারাই বেঁচে থাকতো।

ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন

উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বিউটি খাতুনকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সভাপতি করা হয়েছে। তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার স্বামী মঈনুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু কোথা থেকে গাছ কেনা হয়েছে বা কত টাকা খরচ হয়েছে, সে বিষয়ে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রাক্কলন ও ব্যয়ের হিসাব তৈরির সঙ্গে উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় লোকজন প্রকৃত বাজারদরের তুলনায় ব্যয় বেশি দেখানোর অভিযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে উপসহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব তহবিল থেকে বিভিন্ন ইউনিয়নে গাছ লাগানো হচ্ছে। তবে গাছ লাগানোর পর সেগুলোর বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্টিমেটে পরিচর্যার ব্যয় থাকার দাবি

এলজিইডির উল্লাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদে বৃক্ষরোপণের বরাদ্দে এলজিইডির উপসহকারীরা যে স্টিমেট করেছেন, সেখানে একটি গাছের দাম, গাছ রোপণ, গাছের বেড়া ও পরিচর্যার ব্যয় ধরা আছে।’

তবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা প্রশাসক ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল কাদের বিশ্বাসের বক্তব্যের সঙ্গে ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও এলজিইডির স্টিমেটের অসংগতি দেখা গেছে।

কাদের বিশ্বাস বলেন, ‘গাছ লাগানোর টাকা আছে, কিন্তু পরিচর্যা ও গাছের আনুষঙ্গিক কোনও খরচের বরাদ্দ নেই। তাই গাছের পরিচর্যা করা হয়নি।’

পরিচর্যার অভাবে গাছ মারা যাওয়ার বিষয়ে উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও প্রশাসক/চেয়ারম্যানের। যদি তারা দায়িত্বে অবহেলা করেন, তাহলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) গণপতি রায় বলেন, ‘বৃক্ষরোপণ প্রকল্পটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা গুরুত্ব দিয়ে এটি বাস্তবায়ন করছি। তবে প্রকল্পটি এখনও শেষ হয়নি। জেলার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সরকারি দফতর গাছ লাগাচ্ছে।’

গাছ পরিচর্যার অভাবে মারা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় গাছ মারা যাচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। জেলার কয়েকটি সড়কে ইতিমধ্যে গাছ দৃশ্যমান হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে আমরা নজরদারি আরও বাড়াবো।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
সম্পদের তথ্য গোপন করে স্ত্রীসহ সাজা পেলেন সিভিল অ্যাভিয়েশনের হিরণ
তারিক আহমেদ সিদ্দিককে দুদকে তলব
আইনজীবী অসুস্থ, পেছালো আবেদপুত্র সিয়ামের দুর্নীতি মামলার যুক্তি উপস্থাপন 
সর্বশেষ খবর
শাহজালালে ১৬ লাখ টাকার বিদেশি মদ জব্দ
শাহজালালে ১৬ লাখ টাকার বিদেশি মদ জব্দ
খাদ্য তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে দেড় লাখ টাকা জরিমানা
খাদ্য তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে দেড় লাখ টাকা জরিমানা
রাজধানীতে আওয়ামী লীগের ৪০ নেতাকর্মী গ্রেফতার
রাজধানীতে আওয়ামী লীগের ৪০ নেতাকর্মী গ্রেফতার
সৌদিকে রক্ষায় ‘যেকোনও উপায়’ ব্যবহারের অঙ্গীকার পাকিস্তানের
সৌদিকে রক্ষায় ‘যেকোনও উপায়’ ব্যবহারের অঙ্গীকার পাকিস্তানের
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম আনতে আকাশসীমার অনুমতি কেন দিচ্ছে না, জানালো পাকিস্তান
বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম আনতে আকাশসীমার অনুমতি কেন দিচ্ছে না, জানালো পাকিস্তান
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
শহীদ আবু সাঈদের ঘর ও কবরস্থান উন্নয়নে এক কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা
শহীদ আবু সাঈদের ঘর ও কবরস্থান উন্নয়নে এক কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা
ঘরে টাকার স্তূপ-স্বর্ণ-গাড়ি, গ্রেফতার মাদক সম্রাজ্ঞী
ঘরে টাকার স্তূপ-স্বর্ণ-গাড়ি, গ্রেফতার মাদক সম্রাজ্ঞী
প্রায় দেড় কোটি রুপি জরিমানা দিয়ে দায়মুক্তি পেলো আদানি গ্রুপ
প্রায় দেড় কোটি রুপি জরিমানা দিয়ে দায়মুক্তি পেলো আদানি গ্রুপ