বেসরকারি চাকরিজীবী সাদাত হোসেন ঢাকার আজিমপুরে ২ রুমের বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন। তার পরিবারের সদস্য ৪ জন। ঘরে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য বলতে আছে টেলিভিশন, ফ্রিজ আর লাইট ফ্যান। সাধারণত তার বিদ্যুৎ বিল ১৪০০ -১৫০০ টাকার মধ্যে থাকলেও গত জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল এসেছে প্রায় ৬ হাজার টাকা। বিল দেখে তিনি কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। কেন এমন হলো তাও তার জানা নেই। তার প্রশ্ন- এটি কি চুরি না ডাকাতি?
শুধু সাদাত হোসেন নন এমন অভিযোগ সারা দেশজুড়ে অসংখ্য গ্রাহকের। মে মাসের বিল স্বাভাবিক মনে হলেও জুনের বিল তাদের কাছে অস্বাভাবিক কিংবা ভুতুড়ে মনে হচ্ছে। সাধারণ বিলের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বিল এসেছে অনেকেরই। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, এই অস্বাভাবিক বিল আসার ঘটনা খুব বেশি নয়। যাদের অভিযোগ এসেছে তাদের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে শুধু ঢাকা নয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য গ্রাহক অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ তুলেছেন। অনেকের দাবি, বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না থাকলেও আগের মাসের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল এসেছে। পোস্টপেইড ও প্রিপেইড—উভয় ধরনের গ্রাহকদের কাছ থেকেই এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, কোথাও মিটার রিডিং সঠিকভাবে নেওয়া হয়নি, কোথাও অনুমাননির্ভর বিল করা হয়েছে, আবার কোথাও কয়েক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যোগ হওয়ায় বিল বেড়ে গেছে। প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদেরও অভিযোগ, রিচার্জের অর্থ অস্বাভাবিক দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জুন মাসে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছিল। পাশাপাশি মিটার রিডিংয়ের অনিয়ম, বিলিং ত্রুটি বা কয়েক মাসের ইউনিট একত্রে সমন্বয়ের মতো কারণেও কিছু ক্ষেত্রে বিল অস্বাভাবিক হতে পারে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতাও এ ধরনের সমস্যার অন্যতম কারণ। এছাড়া অর্থবছরের শেষে রাজস্ব আয় বা সিস্টেম লসের হিসাব সমন্বয়ের কারণেও বিল বেশি আসতে পারে।
পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিভাগ অভিযোগ তদন্ত ও দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে। মিটার রিডিং বা কারিগরি ত্রুটি প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক সংশোধন এবং অনিয়ম বা অসদুপায়ের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ গ্রহণের জন্য আলাদা সেলও চালু করা হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক মিটার রিডিং, স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। একইসঙ্গে ভুল বিলের কারণে কোনো গ্রাহক যেন হয়রানি বা সংযোগ বিচ্ছিন্নের শিকার না হন, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, জুনে গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার এমনিতে বেড়ে যায়। মে মাসের মিটার রিডিং নেওয়া হয়েছে ঈদের আগে , ঈদ ছিল মাসের শেষে। কিন্তু মিটার রিডিং নেওয়া হয়েছে ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে। জুন মাসের বিলে কিন্তু মে মাসের অন্তত ১০-১২ দিনের মিটার রিডিং যুক্ত হচ্ছে। এই কারণেও বিল বেশি আসতে পারে। তবে তাদের মুল দাবি, প্রতিবছর জুনের বিল বেশি আসে, পরবর্তী মাসে তা সমন্বয় করা হয়।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি অনুযায়ী গ্রাহকরা বলছেন ভিন্ন কথা। গ্রাহকদের দাবি, বিল কিছুটা বেশি আসলেও কি দ্বিগুণ -তিনগুণ হবে?
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা সাংবাদিক এস এম আব্বাস বলেন, “মে মাসের চেয়ে চার থেকে পাঁচগুণ বিদ্যুৎ বিল বেশি জুনে এসেছে আমরা। আমি যখন অভিযোগ জানাতে গেলাম, তখন দেখি শতাধিক গ্রাহক জাপান গার্ডেন সিটির পাশে ডিপিডিসি অফিসে অভিযোগ জানাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, বন্ধ থাকা বাসাতেও মিটার রিডিং বেশি আসছে। আমি গত মাসে বিদ্যুৎ বিল দিয়েছি ১ হাজার ৯৮৪ টাকা। জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল ৯ হাজার ১৯৫ টাকা।”
তার দাবি এবং প্রশ্ন দুই মাসেই একই সমান বিদ্যুৎ ব্যবহার করে জুন মাসে কেন ৬-৭ গুণ বেশি বিল আসবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, গত ৩ জুন দুই পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। এ কারণে বাড়তি দামের চাপ পড়তে পারে। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম জুন থেকেই কার্যকর করা হয়েছে। তবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষকে বাড়তি বিলের চাপ থেকে রেহাই দিতে আবাসিক খাতের দুই শ্রেণির গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
বিইআরসি পরদিন ঘোষণা দেয়, আবাসিক খাতের শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট (লাইফলাইন) এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট (প্রথম ধাপ) পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের বর্ধিত মূল্য পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হলো। ফলে যারা কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন তাদের বিল কম আসবে এবং নতুন মূল্যহারের প্রভাব কম পড়বে।
গ্রাহক হয়রানি লাঘবে বিদ্যুৎ বিভাগ জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য সাধারণ মাসের তুলনায় চলতি জুন মাসে গ্রাহক পর্যায়ে অতিরিক্ত বা ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল আসার তথ্য বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র ও গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে। মাঠপর্যায়ে গ্রাহকদের এই চরম হয়রানি লাঘবের জন্য বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোকে বিলের অসঙ্গতিগুলো যথাযথভাবে স্ক্রুটিনি বা পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় যেসব গ্রাহকের মিটারের সাথে সামঞ্জস্যহীন অতিরিক্ত বিল এসেছে, তাদের সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে অথবা সরকারি অফিশিয়াল হটলাইন ও কল সেন্টারে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও সম্প্রতি বলেছেন, বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।








