ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। প্রধান সড়কে এসব অটোরিকশার অবাধ চলাচলে যানজটের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে। ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) নিয়মিত প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জব্দ ও ডাম্পিং করলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এবার সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, যানজট নিরসন ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে অভিযান জোরদার করেছে ডিএমপি।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, মিরপুর ও হাতিরঝিল এলাকায় পৃথক অভিযান চালায় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।
অভিযানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। একইসঙ্গে চার্জিংয়ের কাজে ব্যবহৃত তার, মাল্টিপ্লাগ, সকেটসহ বিভিন্ন অবৈধ সংযোগ সামগ্রী অপসারণ ও জব্দ করা হয়। এ সময় বেশ কয়েকটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়। অভিযানে ডিপিডিসির কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
তেজগাঁওয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, ভ্যান জব্দ
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় সমন্বিত অভিযান চালানো হয়।
এ সময় প্রধান সড়ক ও সংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি এবং বিতরণ লাইন থেকে নেওয়া বিপুলসংখ্যক অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ শনাক্ত করা হয়। পরে ডিপিডিসির কারিগরি সহায়তায় এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। একই সঙ্গে চার্জিংয়ের কাজে ব্যবহৃত তার, মাল্টিপ্লাগ, সকেটসহ অন্যান্য অবৈধ সংযোগ সামগ্রী অপসারণ ও জব্দ করা হয়।
পুলিশ জানায়, অভিযান চলাকালে স্থানীয় ৪০০ থেকে ৫০০ নারী-পুরুষ পুলিশের সঙ্গে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করেন। তারা আটক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের তৎপরতায় তারা তা পারেননি।
অভিযানে ছয়টি ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও চারটি ব্যাটারি জব্দ করা হয়।
মিরপুরে ৭০ ব্যাটারি জব্দ
একই রাতে রাজধানীর মিরপুরে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালায় ডিএমপির ট্রাফিক মিরপুর বিভাগ ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো)।
রাত সাড়ে ১০টা থেকে মিরপুরের হাজী রোড, ঢাকা কমার্স কলেজ রোড, চিড়িয়াখানা রোড ও আল-কামাল হাউজিং এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজগুলোতে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে ৭০টি ব্যাটারি জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৫টি অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
ট্রাফিক মিরপুর বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন জানান, অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার রোধ, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং সড়কে শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অবৈধ চার্জিং পয়েন্টেও নজর
অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, অটোরিকশার মালিক ও চালকেরা রাস্তার পাশের বিদ্যুতের খুঁটি ও বিতরণ লাইন থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে চার্জিং পয়েন্ট স্থাপন করছেন। এসব অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে নিয়মিত অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার ফলে প্রধান সড়কে আবারও অটোরিকশার চলাচল বাড়ছে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সবসময় চেষ্টা করছে। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীতে অন্তত ৫০০টি অটোরিকশা ডাম্পিং করা হচ্ছিল। এরপরও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “এখন সরকার একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আমাদের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এমন অভিযান চলবে।”
আট জোনে চলবে রিকশা
উল্লেখ্য, রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল বন্ধ এবং রিকশাগুলোকে সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যৌথভাবে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় এক জোনে নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে প্রবেশ করতে পারবে না। রাজধানী ঢাকাকে আটটি ভৌগোলিক এলাকায় ভাগ করে নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রিকশাগুলো নিজ নিজ জোনের মধ্যেই চলাচল করবে। সীমানা অতিক্রম করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রতিটি জোনের রিকশার জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে। এ ছাড়া রিকশায় থাকবে ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও কিউআর কোড। কিউআর কোড স্ক্যান করে চালক ও মালিকের তথ্য জানতে পারবেন ট্রাফিক পুলিশ।
অবৈধ গ্যারেজে বাসাবাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার প্রবণতা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও রয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎচালিত চার্জিং হাব স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্টসংখ্যক রিকশা চলাচলের সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে অতিরিক্ত যানজট সৃষ্টি না হয়।
দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও ট্রাফিক আইন না মানার কারণে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রিকশা ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল জোন ব্যবস্থা চালু হলে অনিবন্ধিত ও অবৈধ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সহজ হতে পারে।









