পুরোনো দিনের সংসারের গল্প আমরা প্রায়ই শুনি। তখন নাকি জীবন ছিল সহজ, পরিবার ছিল গুছানো, নারীরা ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, আর এত মানসিক চাপও ছিল না। আজকের মতো নানা ধরনের ওষুধের ওপরও নাকি তাদের নির্ভর করতে হতো না।
কিন্তু ইতিহাসের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে এই ছবিটা আর ততটা সুন্দর থাকে না।
বিশেষ করে উনিশ শতকের মধ্যভাগের নারীদের জীবন নিয়ে নথিপত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, তখনকার মধ্যবিত্ত নারীদের নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় নিয়মিত ঘুমের ওষুধ, প্রশান্তিদায়ক ওষুধ এবং আফিমজাত ওষুধ দেওয়া হতো। এমনকি নারীদের জন্য আলাদাভাবে বাজারজাত করা অনেক তথাকথিত ওষুধেও ছিল আসক্তি তৈরি করতে পারে এমন উপাদান।
অর্থাৎ ‘আগের দিনের সুখী, শান্ত, ওষুধহীন গৃহবধূ’—এই ছবিটা হয়তো ইতিহাসের চেয়ে আমাদের নস্টালজিয়াতেই বেশি সুন্দর।
নারীর অস্থিরতার সমাধান ছিল ওষুধ
উনিশ শতকের চিকিৎসাব্যবস্থায় নারীদের নানা সমস্যা নিয়ে আলাদা ধরনের ধারণা ছিল।
মাসিকের ব্যথা, মেনোপজ, অনিদ্রা, উদ্বেগ, অস্থিরতা কিংবা তথাকথিত স্নায়বিক দুর্বলতার জন্য চিকিৎসকেরা বিভিন্ন ধরনের প্রশান্তিদায়ক ওষুধ ব্যবহার করতেন।
১৮৫১ সালের একটি চিকিৎসা সাময়িকীতেও মেনোপজের সময় নারীদের আফিম ব্যবহারের উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসকদের মধ্যে নারীদের বিভিন্ন সমস্যায় আফিমজাত ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে থাকে।
ফলে যে সময়টাকে আজ অনেকে ‘স্বাভাবিক ওষুধবিহীন জীবন’-এর আদর্শ সময় হিসেবে ভাবেন, তখনই চিকিৎসাব্যবস্থায় নারীদের নানা সমস্যা সামলাতে মাদকজাত ওষুধের ব্যবহার বেশ প্রচলিত ছিল।
শান্ত রাখার জন্যও ছিল ওষুধ
তখন নারীদের জন্য নানা ধরনের প্রশান্তিদায়ক ওষুধ ব্যবহার করা হতো।
স্নায়বিক অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা কিংবা অতিরিক্ত উত্তেজনা কমাতে পটাশিয়াম ব্রোমাইড ও ক্লোরাল হাইড্রেটের মতো ওষুধ দেওয়া হতো।
এর মধ্যে পটাশিয়াম ব্রোমাইড উনিশ শতকের মাঝামাঝি নারীদের তথাকথিত ‘অতিরিক্ত উত্তেজনা’ কমানোর জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়। আর ক্লোরাল হাইড্রেট ব্যবহৃত হতো ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত অস্থিরতা ও উদ্বেগ কমাতে।
আজ এসব শুনে অস্বস্তি লাগতে পারে। কিন্তু তখনকার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এগুলো মোটেই অস্বাভাবিক ছিল না।
সবচেয়ে বড় ভয় ছিল আফিমজাত ওষুধে
তখন নারীদের জন্য বাজারে পাওয়া যেত নানা ধরনের আফিমজাত ওষুধ।
এর মধ্যে একটি ছিল ম্যাকমানের আফিমের তরল ওষুধ। মাসিকের ব্যথা ও স্নায়বিক দুর্বলতার মতো সমস্যায় এটি নারীদের জন্য ব্যাপকভাবে প্রচার করা হতো।
বিক্রেতাদের দাবি ছিল, ওষুধটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে আফিমের নেশা ধরানোর ক্ষমতা নেই। কিন্তু ১৮৬৪ সালে এক চিকিৎসক এই দাবির অসারতা তুলে ধরেন।
তিনি দেখান, ওষুধ থেকে যে উপাদানটি সরানো হয়েছিল, সেটি আসলে নেশা তৈরির জন্য দায়ী ছিল না। বরং আফিমের সক্রিয় ও আসক্তি তৈরি করতে পারে এমন উপাদানটি তখনও ওষুধে রয়ে গিয়েছিল।
অর্থাৎ ‘নিরাপদ’ বলে যে ওষুধ নারীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল, সেটিই তাদের আসক্ত করে তুলতে পারত।
‘নারীদের ওষুধ’ নামে কী বিক্রি হতো?
সে সময় নারীদের জন্য আলাদাভাবে নানা ধরনের পেটেন্ট ওষুধ বাজারজাত করা হতো।
এর মধ্যে ছিল লিডিয়া পিংহামের সবজিজাত ওষুধের মিশ্রণ। নাম শুনলে একেবারে নিরীহ ভেষজ ওষুধ মনে হতে পারে। এতে নানা উদ্ভিদজাত উপাদান ছিল ঠিকই, কিন্তু এতে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথাইল অ্যালকোহলও থাকত।
অর্থাৎ নামের মধ্যে যতই ভেষজের গন্ধ থাকুক, বোতলের ভেতরের উপাদান একেবারে নিরীহ ছিল না।
আরেকটি জনপ্রিয় ওষুধ নারীদের স্নায়বিক দুর্বলতা, মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা, মানসিক উদ্বেগসহ নানা সমস্যার সমাধান হিসেবে বিক্রি করা হতো। এর পুরোনো সংস্করণে অ্যালকোহল ও আফিমের নির্যাস থাকার কথাও ঐতিহাসিক নথিতে পাওয়া যায়।
তাহলে সেই ‘শান্ত’ নারীরা আসলে কতটা শান্ত ছিলেন?
এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা আসে।
আজ আমরা পুরোনো দিনের গৃহবধূর কথা ভাবলে তাকে প্রায়ই শান্ত, সংসারী, ধৈর্যশীল এবং সবকিছু মেনে নেওয়া একজন নারী হিসেবে কল্পনা করি।
কিন্তু একজন নারী যদি উদ্বিগ্ন হন, ঘুমাতে না পারেন, মানসিকভাবে অস্থির থাকেন কিংবা নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন—তখনকার সমাজ কি তার কথা শুনত?
সবসময় নয়।
অনেক ক্ষেত্রে সমাধান ছিল তাকে শান্ত করে দেওয়া।
আর সেই শান্ত করার দায়িত্ব নিত নানা ধরনের ওষুধ।
১৯০০ সালের দিকে বড় একটি অংশ ছিলেন নারী
ইতিহাসের আরেকটি তথ্য বিষয়টিকে আরও চমকপ্রদ করে।
১৯০০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে আফিমে আসক্ত ব্যক্তিদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিলেন নারী—যদিও এই হিসাব মূলত মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপর করা জরিপ থেকে পাওয়া। মজার বিষয় হলো, এই শ্রেণিই সেই সময়ের আদর্শ গৃহবধূর সামাজিক ছবির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মেলে।
অর্থাৎ যে নারীদের আমরা আজ ‘সংসারী, শান্ত, ঘরকুনো’ জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখি, তাদের মধ্যেও মাদকজাত ওষুধ ব্যবহারের ইতিহাস বেশ গভীর।
সংসারের কষ্ট সামলাতেও ওষুধ
এখানে একটা বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তখন নারীদের অনেকেই ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং নানা ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকতেন। কিন্তু তাদের কষ্টকে সবসময় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়নি।
বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই কষ্টকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা নারীর স্বাভাবিক ‘অস্থিরতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
ফলে সমাধানও ছিল ব্যক্তিকে বদলে দেওয়া।
তিনি যদি উদ্বিগ্ন হন—শান্ত করে দাও।
ঘুমাতে না পারেন—ঘুমের ওষুধ দাও।
অতিরিক্ত অস্থির মনে হলে—আরও প্রশান্তিদায়ক কিছু দাও।
অর্থাৎ সমস্যার কারণ নিয়ে প্রশ্ন করার বদলে অনেক সময় সমস্যা প্রকাশ করা মানুষটিকেই শান্ত করার চেষ্টা করা হতো।
চুপচাপ থাকলেই কি সুখী?
এই প্রশ্নটাই হয়তো পুরো ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
একজন নারী খুব শান্ত। সংসারের কোনো বিষয়ে আপত্তি করছেন না। বেশি কথা বলছেন না। সবকিছু মেনে নিচ্ছেন।
তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় তিনি সুখী?
অবশ্যই নয়।
কারণ ইতিহাস বলছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে নারীর এই নীরবতার পেছনে ছিল এমন ওষুধ, যা তাকে শান্ত, ঘুমন্ত কিংবা অনুভূতিহীন করে রাখতে পারত।
তাই পুরোনো দিনের ‘শান্ত গৃহবধূ’কে শুধু তার হাসিমুখ দিয়ে বিচার করলে তার জীবনের একটা বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।
পুরোনো দিনের জীবন কি সত্যিই কম ওষুধনির্ভর ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তরও বেশ পরিষ্কার।
না, অন্তত নারীদের ক্ষেত্রে এমন দাবি করার মতো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
বরং উনিশ শতকে মধ্যবিত্ত নারীদের চিকিৎসায় প্রশান্তিদায়ক ও আফিমজাত ওষুধের ব্যবহার ছিল যথেষ্ট ব্যাপক। নারীদের নানা সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকেরা এসব ওষুধ লিখে দিতেন, আর বাজারেও নারীদের জন্য আলাদা করে তৈরি করা নানা ধরনের ওষুধ বিক্রি হতো।
তাই ‘আগের দিনের নারী ওষুধ খেতেন না, তাই বেশি সুখী ছিলেন’—এই ধারণা ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না।
হয়তো ‘শান্ত’ থাকার পেছনে অন্য গল্প ছিল
আমরা অতীতকে অনেক সময় নিজের মতো করে সুন্দর করে নিই।
মনে হয়, আগে পরিবার বেশি কাছাকাছি ছিল। মানুষ বেশি সুখী ছিল। নারীরা সংসার নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। এখনকার মতো এত মানসিক চাপ ছিল না।
কিন্তু ইতিহাস এত সরল নয়।
একজন নারী হয়তো বাইরে থেকে খুব শান্ত। কিন্তু তার হাতে থাকা ছোট্ট ওষুধের শিশিটির ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে তার উদ্বেগ, অনিদ্রা, ব্যথা কিংবা প্রতিদিনের ক্লান্তির গল্প।
তাই পুরোনো দিনের ‘সুখী গৃহবধূ’-র ছবিটা নতুন করে দেখতে গেলে শুধু তার হাসিমুখ দেখলে হবে না।
দেখতে হবে তার ওষুধের শিশিটাও।
কারণ কখনো কখনো যে নারীকে খুব শান্ত মনে হয়, সেই শান্তির পেছনে সুখ নয়—থাকতে পারে এমন এক চিকিৎসা, যা তাকে শুধু কষ্ট থেকে নয়, তার নিজের কণ্ঠ থেকেও কিছুটা দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।








