কুড়িগ্রামে যে কারণে সার নিয়ে ‘হাহাকার’

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০১আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০১

কুড়িগ্রামে চলতি আমন মৌসুমে সার নিয়ে একের পর এক বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটছে। বিগত বছরের তুলনায় জেলাজুড়ে বরাদ্দ বাড়লেও সার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের ‘হাহাকার’ দেখা দিয়েছে। 

কৃষি বিভাগ বলছে, বরাদ্দ বাড়লেও সার নিয়ে গুজবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন কৃষকরা। সার সংকট না থাকলেও কৃষকরা আস্থা সংকটে ভুগছেন। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী অঞ্চলের কৃষকরা আসছে রবি মৌসুমকে সামনে রেখে আগাম সার সংগ্রহে ঝুঁকছেন। এতে করে অতিরিক্ত চাহিদায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় সারের কোনও সংকট নেই। প্রত্যেক এলাকায় পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। আমন ধানে ইউরিয়া সার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা শেষ পর্যায়ে। আসছে রবি মৌসুমে ভুট্টা ও আলু এবং শীতকালীন সবজি চাষকে সামনে রেখে অক্টোবর-নভেম্বরে আরও বরাদ্দ বাড়ানো হবে। কৃষকদের সার না পাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। এ অবস্থায় সার নিয়ে আতংকিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

চলতি আমন মৌসুমে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী ও রৌমারী উপজেলায় সার নিয়ে বিক্ষোভ এমনকি কয়েকটি ডিলার পয়েন্ট ভাঙচুর করে সারের বস্তা তুলে নিয়ে যাওয়ারও ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ সোমবার রৌমারীতে এক ডিলারের গুদাম ভেঙে বেশ কিছু সারের বস্তা তুলে নিয়ে যান কৃষকরা। সংকট না থাকলেও বিতরণে দেরি হওয়ায় ধৈর্যহারা হয়ে কিছু কৃষক এ ঘটনা ঘটান। পরে অনেকে সেই সার ফেরতও দেন।

বরাদ্দ বেড়েছে, তবু কেন ‘হাহাকার’

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত বছর আমন মৌসুমে আগস্ট মাসে জেলায় ইউরিয়ার বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ২৫৩ মেট্রিক টন। এ বছর তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৮৭৫ মেট্রিক টন। ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭০ মেট্রিক টন। এ বছর তা দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৭২ মেট্রিক টন।
গত বছর আগস্টে মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৫৭০ মেট্রিকটন। এ বছর একই সময়ে তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৬৪৮ মেট্রিক টন। ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) বরাদ্দ ছিল ৮০৯ মেট্রিকটন। এ বছর আগস্টে তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৯২৪ মেট্রিক টন।

সেপ্টেম্বরেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে ইউরিয়ার বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৮৯৪ মেট্রিক টন। এ বছর তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন। ডিএপি বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ২০১ মেট্রিক টন। এ বছর সেপ্টেম্বরে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন। টিএসপি বরাদ্দ ছিল ৪৫২ মেট্রিক টন। এ বছর প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে বরাদ্দ হয়েছে ৮০২ মেট্রিক টন। এমওপি ১ হাজার ১১০ মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩২৬ মেট্রিক টন দেওয়া হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী গত বছরের চেয়ে চলতি বছর বরাদ্দ বাড়ানো হলেও সার নিয়ে কৃষকদের ‘হাহাকার’ যেন শেষ হচ্ছে না। মাসের পুরো বরাদ্দের বড় অংশ মজুত থাকলেও সার নিয়ে কৃষকদের শোরগোল নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

কৃষকরা বলছেন, ডিলার পয়েন্টে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে করতে তাদের কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে। ভোর বেলা থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে সার নিতে হচ্ছে। অনেক সময় নির্ধারিত সময় পার হলেও ডিলাররা সার বিক্রি শুরু করছেন না। এতে ধৈর্যহারা হয়ে কৃষকরা বিক্ষোভ করছেন।

সোমবার দুপুরে রৌমারী মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় ডিলারের গুদামে ভাঙচুরের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী কৃষক জাকির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বন্দবেড় ইউনিয়নের কৃষকরা সার সংগ্রহের জন্য ভোররাত থেকেই ওই ডিলারের গুদামের সামনে জড়ো হন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ডিলারের দেখা না পাওয়ায় একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। বেলা ১১টা বাজলেও সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে গোডাউনের টিনের বেড়া ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং শতাধিক বস্তা সার নিয়ে যান।’

কৃষকরা বলছেন, ওই ডিলার পয়েন্টে সার সংকট ছিল না। বেলা ১১টা পেরিয়ে গেলেও সেখানে ট্যাগ অফিসার কিংবা পুলিশের উপস্থিতি ছিল না। মূলত বিক্রি শুরু দেরি করায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষকরা বিরক্ত হয়ে পড়েন। রোদ ও গরমে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। সেই থেকে হুড়োহুড়ি এবং ডিলার পয়েন্ট ভেঙে সারের বস্তা নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

একই দিন বেলা ১১টার দিকে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের পাটেশ্বরী ব্রিজপাড় এলাকায় আমজাদের সারের দোকানের সামনে সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ কৃষকরা সড়কে বাঁশ ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। সেখানে থাকা কয়েকজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। সার নিতে গেলে পুরো দিন চলে যায়। এতো দিনের আয়রোজগার বন্ধ হয়। খোলাবাজারে সার বিক্রি করা হলে কোনও রকম ঝামেলা ছাড়াই সার পাওয়া যাবে।’

ডিলার ও স্থানীয় লোকজনের দাবি, আসছে রবি মৌসুমে সংকটের শঙ্কায় অনেকে ভুট্টা ও আলু চাষের জন্য আগে থেকে সার সংগ্রহে ঝুঁকছেন। এক ওয়ার্ডের কৃষকদের জন্য সার বিতরণের কথা থাকলেও অন্যান্য ওয়ার্ডের কৃষকরা সার নিতে ভিড় জমাচ্ছেন। এতে কৃত্রিম সংকট দেখা দিচ্ছে, বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। কেউ কেউ কৃষকদের উসকে দিচ্ছে। বিক্ষোভ করে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।

খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারদের যোগসাজশের অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিলাররা আগে থেকে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বেশি দামে সার বিক্রি করতেন। বর্তমানে খুচরা বিক্রি বন্ধ। ফলে খুচরা বিক্রেতারা ভাড়াটে শ্রমিক সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে লাইনে দাঁড় করিয়ে সার সংগ্রহ করছেন। তারা একবার সার নিয়ে ফের লাইনে দাঁড়ান। সার সংগ্রহ করে অবৈধ মজুত করছেন। তাদের কারণে অনেক সময় কৃষকরা সার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। এই অনুপ্রবেশকারীরা ভিড়ে প্রবেশ করে হঠাৎ উসকে দিয়ে বিক্ষোভ সৃষ্টি করে। ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতাদের দীর্ঘ দিনের চেইন ভেঙে পড়ায় সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা কৃষকদের হাহাকার হিসেবে দেখানো হচ্ছে বলে দাবি করছেন অনেকে।

সারের নয়, সংকট আস্থার

কৃষি বিভাগ বলছে, সারের সংকট নেই। চলতি আমন মৌসুমে সারের প্রয়োজনীয়তা শেষ পর্যায়ে। মাস ভিত্তিক বরাদ্দ ও সরবরাহ স্বাভাবিক। কিন্তু সামনে সারের সংকট দেখা দিতে পারে এমন একটি গুজব থেকে কৃষকদের মধ্যে এক ধরণের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলবেষ্টিত এলাকার কৃষকদের মাঝে এই আস্থার সংকট প্রবল। তারা ভাবছেন, সামনে ভুট্টা ও আলু চাষের সময় সারের সংকট দেখা দিতে পারে। ফলে এখন থেকে সার সংগ্রহ করে মজুতের চেষ্টা করছেন।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারের কোনও সংকট নেই। এলাকাভিত্তিক মাসিক চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার রয়েছে। বরং বিগত বছরের চেয়ে বেশি বরাদ্দ রয়েছে। বর্তমানে আমন এবং সবজি ক্ষেত ছাড়া সারের প্রয়োজন নেই। চলতি মাসের অর্ধেক সময় পার হলে আমন ক্ষেতে ইউরিয়া দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু কিছু কৃষক সংকটের গুজবে কান দিয়ে আগাম অতিরিক্ত সার সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন। বিক্ষোভ করছেন। এমন বিক্ষোভ প্রশ্ন তৈরি করে। এখানে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে।’

সারের জন্য কৃষকদের বিক্ষোভ কিংবা ‘হাহাকারকে’ বাস্তবতার বিপরীত উল্লেখ করে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেকে সার সংকটের গুজবে কান দিয়ে রবি মৌসুমের জন্য আগাম মজুতের জন্য সার কেনার চেষ্টা করছেন। চরাঞ্চলের কৃষকরা ভাবছেন হয়তো ভুট্টা কিংবা আলু চাষে সারের সংকট হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেই সম্ভাবনা নেই। রবি মৌসুমকে সামনে রেখে আগামী অক্টোবর ও নভেম্বরে সারের বরাদ্দ আরও বাড়বে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
‘সারের মজুতে সমস্যা নেই, কোথাও কোথাও বিতরণগত সংকট’
‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ চালালে পারস্য উপসাগর অবরুদ্ধ করার হুঁশিয়ারি ইরানের
কর্ণফুলী ইউরিয়া সার কারখানায় আবারও উৎপাদন বন্ধ
সর্বশেষ খবর
বোয়িং কেনায় তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ পড়বে না: তথ্য উপদেষ্টা
বোয়িং কেনায় তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ পড়বে না: তথ্য উপদেষ্টা
সাবেক ইসরায়েলি সেনাকে নিয়ে বিজ্ঞাপন, অ্যাডিডাস বয়কটের ডাক
সাবেক ইসরায়েলি সেনাকে নিয়ে বিজ্ঞাপন, অ্যাডিডাস বয়কটের ডাক
চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা পেলেন ১৬ কোটি টাকার বোনাস
চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা পেলেন ১৬ কোটি টাকার বোনাস
সুগন্ধি চাল রফতানিতে ৫০ শতাংশ কোটা কমালো সরকার
সুগন্ধি চাল রফতানিতে ৫০ শতাংশ কোটা কমালো সরকার
সর্বাধিক পঠিত
৪০০ হিট, ৫০ ব্লকবাস্টার: অমিতাভ-শাহরুখ-রজনীকান্তকে পেছনে ফেলা ভারতের সবচেয়ে সফল অভিনেতা
৪০০ হিট, ৫০ ব্লকবাস্টার: অমিতাভ-শাহরুখ-রজনীকান্তকে পেছনে ফেলা ভারতের সবচেয়ে সফল অভিনেতা
সিগারেটের দাম বাড়লো ৩ টাকা, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
সিগারেটের দাম বাড়লো ৩ টাকা, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
দুধে ডিটারজেন্ট আছে কি না সহজে জানবেন যেভাবে
দুধে ডিটারজেন্ট আছে কি না সহজে জানবেন যেভাবে
হিজড়া ‘গুরুমাকে’ হত্যা করে আরেক নেত্রীর ঘরে আশ্রয়, জানালেন খুনের কারণ
হিজড়া ‘গুরুমাকে’ হত্যা করে আরেক নেত্রীর ঘরে আশ্রয়, জানালেন খুনের কারণ
গতকাল নতুন বাসায় উঠেছিলেন চিকিৎসক, আজ মিললো লাশ
গতকাল নতুন বাসায় উঠেছিলেন চিকিৎসক, আজ মিললো লাশ