ঢাকা একটি শহরই শুধু নয়, হাজারো মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রামের এক অনন্ত ক্যানভাস। স্বপ্নের সাথে সাথে শত শত কন্যাশিশুর স্বপ্নভঙ্গেরও ক্যানভাস এই মেগা শহর। তথ্য-উপাত্ত ও গণমাধ্যমের সংবাদ বলছে, এই শহরেও হচ্ছে শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণের মতো জঘন্য অপরাধ। শহরে সরাসরি শোষণের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে শিশুরা। অত্যন্ত গোপনে সংগঠিত হওয়া এই জঘন্য অপরাধ দমনে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশে পথশিশুদের সুরক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নে সরকার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন সুবিধাসহ পুনর্বাসন নামে একটি প্রকল্প সরাসরি প্রায় ২৫ হাজার শিশুসহ মোট পাঁচ লাখ শিশুর জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। পথশিশুদের সুরক্ষার পাশাপাশি যৌন শোষণের শিকার শিশুদের সুরক্ষাও জরুরি।
শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণ কী?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সংজ্ঞায়, ১৮ বছরের কম বয়সী কোনও শিশুকে অর্থ, পণ্য, সেবা বা অন্য যেকোনও ধরনের পারিশ্রমিক বা সুবিধার বিনিময়ে যৌন শোষণ করা, এবং সেই পারিশ্রমিক শিশুর কাছে অথবা অন্য কোনও তৃতীয় পক্ষ, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে প্রদান করাকে শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণ বলা হচ্ছে। এ ধরনের শোষণের মধ্যে শিশুকে যৌন কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত বা বাধ্য করা, পতিতাবৃত্তিতে ব্যবহার করা এবং অনলাইনে, অফলাইনে পর্নোগ্রাফিক প্রদর্শনী বা উপকরণ তৈরিতে বা প্রচারে ব্যবহার করাও অন্তর্ভুক্ত।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩৪ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে “রাষ্ট্রপক্ষসমূহ শিশুকে সকল প্রকার যৌন শোষণ ও যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা প্রদান করবে।” শিশুর এই সুরক্ষায় তিনটি বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে—ক. কোনও শিশুকে বেআইনি যৌন কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে প্ররোচিত করা বা বাধ্য করা থেকে শিশুর সুরক্ষা। খ. পতিতাবৃত্তি বা অন্য কোনও বেআইনি যৌন কর্মকাণ্ডে শিশুকে শোষণমূলকভাবে ব্যবহার থেকে শিশুর সুরক্ষা এবং গ. পর্নোগ্রাফিক প্রদর্শনী ও পর্নোগ্রাফিক উপকরণে শিশুকে শোষণমূলকভাবে ব্যবহার থেকে সুরক্ষা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণকে বলা হচ্ছে— ‘‘১৮ বছরের কম বয়সী কোনও শিশু বা কিশোর/কিশোরীকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কর্তৃক যৌন উদ্দেশ্যে শোষণ করা, যেখানে ওই শোষণের বিনিময়ে অর্থ বা অন্য কোনও ধরনের পারিশ্রমিক (বস্তু, সেবা বা সুবিধা) শিশু বা কিশোর/কিশোরী অথবা এক বা একাধিক তৃতীয়পক্ষকে প্রদান করা হয়।’’
আইএলও শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণকে মানবাধিকারের জঘন্য লঙ্ঘন হিসেবেও বিবেচনা করে। সংস্থাটি এটিকে বলছে ‘‘দাসত্ব ও জোরপূর্বক শ্রমের মতোই এক ধরনের অর্থনৈতিক শোষণ’’।
১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত শিশুদের প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণবিরোধী বিশ্ব কংগ্রেসে গৃহীত হয় স্টকহোম ঘোষণা (স্টকহোম ডিক্লারেশন) করা হয়। সেই ঘোষণায়ও শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণকে শিশুর বিরুদ্ধে জবরদস্তি ও সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রম এবং আধুনিক যুগের দাসত্বের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার শিশুর সংখ্যা কত
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার শিশু সম্পর্কে নির্ভুল ও হালনাগাদ সংখ্যা পাওয়া যায় না। কারণ অপরাধটি অত্যন্ত গোপনে সংঘটিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনও প্রতিবেদনে এর সামষ্টিক তথ্য পাওয়া যায় না। আইএলও কর্তৃক ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘প্রফিট অ্যান্ড পভার্টি: দ্য ইকোনোমিকস অব ফোর্সড লেবার’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সালে সারা বিশ্বে যেকোনও একটি নির্দিষ্ট দিনে আনুমানিক ৬৩ লাখ (৬.৩ মিলিয়ন) মানুষ জোরপূর্বক বাণিজ্যিক যৌন শোষণের পরিস্থিতিতে ছিল। এই শোষণের শিকার প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে প্রায় চার জনই (৭৮ শতাংশ) নারী ও মেয়ে।
মোট ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রতি চার জনের একজন (২৭ শতাংশ) শিশু (ছেলে ও মেয়ে)। বাংলাদেশে শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণের চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী মানবপাচারের ওপর ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন (টিআইপি)’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে পর পর তিন বছরের টিআইপি প্রতিবেদন বলছে ‘বাংলাদেশে শিশু যৌনপাচার এখনও ব্যাপক আকারে বিদ্যমান; ধারণা করা হয় প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে।’
বাংলাদেশে যৌন শোষণের শিকার শিশুর সংখ্যা বিভিন্ন জরিপেই প্রায় একই রকম। এ বছর ‘ফ্রিডম ফান্ড’ ও ‘পপুলেশন কাউন্সিল’ একটি গবেষণা প্রকাশ করে ‘থ্রু হার আইস’ শিরোনামে। গবেষণার ফলাফল বলছে, শুধু ঢাকা জেলার রাস্তায় প্রায় ৫ হাজার কন্যাশিশু এবং ঢাকা বিভাগের পতিতালয়গুলোতে প্রায় ৭০০ কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে। রাস্তাভিত্তিক (ভাসমান) যৌনকর্মীদের ২২ দশমিক ২ শতাংশ এবং পতিতালয়ভিত্তিক যৌন কর্মীদের ২১ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১৭ বছর বা তার নিচে। গবেষণাটি আরও বলছে— ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় নারী যৌন কর্মীদের মধ্যে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন (প্রায় ২২ শতাংশ) তাদের শৈশবেই যৌন শোষণের শিকার হয়।
বাংলাদেশের প্রজনন স্বাস্থ্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ডা. হালিদা হানুম আখতার ২০২৫ সালে ‘যৌনকর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, “বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ যৌনকর্মী আছে। তার মধ্যে প্রায় ২৯ হাজারই অপ্রাপ্তবয়স্ক। তারা কোনও ধরনের সুরক্ষার আওতায় নেই এবং একটি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী।”
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’-এর একটি গবেষণা অনুযায়ী, এ দেশে যৌনকর্মীদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ এই পেশায় যুক্ত হয় শিশু বয়সে। ১১-১৪ বছর বয়সে প্রবেশ করে ১৮.৫ শতাংশ এবং ১৫-১৭ বছর বয়সে প্রবেশ করে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৩৮ শতাংশ নারী ১৮-২১ বছর এবং ১০ শতাংশ নারী ২২-২৫ বছর বয়সে এই পেশায় আসেন। সেই হিসাবে, বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের মোট সংখ্যার অর্ধেকই শিশু হিসেবেই এই পেশায় আসে। যেটি স্পষ্টভাবেই দেশের বিদ্যমান আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যৌন পেশায় গোপনে শিশুরা যে ব্যবহৃত হচ্ছে তা সামনে আসছে।
শিশুরা কীভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছে?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘আইসিটি অ্যাক্সেস অ্যান্ড ইউজ সার্ভে ২০২৫-২৬’ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ৫৮.৬ শতাংশ। ইন্টারনেট ব্যবহার করেছে। বিবিএস’র ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রতিবেদন বলছে, ৫ বছর ও তার বেশি বয়সী শিশুদের ৩০.৬৮ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। জরিপ অনুযায়ী ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বাড়ছে। এখানে ইন্টারনেট ব্যবহার শুরুটা হিসাব করা হয়েছে পাঁচ বছর থেকে।
ডিজিটাল জগতে শিশুর পদচারণা বাড়ছে। আর এই সুযোগে শিশুদের ব্যবহার করে ও প্রতারণার জালে ফেলছে সক্রিয় দুষ্টচক্র। শিশুদের কৌতূহলী মন। পছন্দের বৈচিত্র্যতাও ব্যাপক। স্বপ্ন ও ইচ্ছাগুলোও রঙিন। আর সেই রঙিন ইচ্ছাগুলো সহজেই চলে যাচ্ছে প্রতারকদের হাতে অ্যালগোরিদমের মাধ্যমে। পরিবার থেকে শিশুর যেসব স্বপ্ন/ইচ্ছা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, প্রতারক চক্র সেই ইচ্ছা পূরণের মিথ্যা ছল করছে। দূরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, বড়দের মতো আয় করা, পছন্দের মানুষের সাথে দেখা করা, হঠাৎ করে অনেক অর্থ হাতে পাওয়া, অনলাইনে আয় করা, বিনাশ্রমে বিশাল অঙ্কের অর্থপ্রাপ্তি, বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন, এক শহর থেকে অন্য শহরে কাজের সন্ধান, ধনী পরিবারের সন্তানের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি সব চাহিদার তথ্য চলে যাচ্ছে প্রতারক চক্রের হাতে। শিশুর এই চাহিদাগুলো সহজে পূরণের স্বপ্ন দেখিয়েই অনলাইনে চলছে প্রতারণার মহোৎসব। অনলাইনে পরিচয়। এবার স্কুল ছুটির পর, খেলার মাঠে, পথে, বাসে, মেট্রোতে চলছে শিশুর স্বপ্ন পূরণের ডিজিটাল প্রতারণা। একবার পা দিলেই শিশুর ভয়াবহ বিপদ।
এসবের পাশাপাশি কিছু পিতামাতা নিজেদের কন্যাশিশুদের এই কাজে পাঠাচ্ছে অর্থ আয়ের জন্যই। সেখানেও দারিদ্র্য প্রশ্নটা আসছে। সাধারণ ইচ্ছা পূরণের কৌতূহল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সেগুলো সহজতর হচ্ছে এবং দরিদ্রতা প্রধান কারণ হিসেবে বারবার সামনে আসছে। সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ও প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদে পড়ছে শিশুরা! পরিবারের আয় সীমিত। ব্যয়ের খাত নানাবিধ। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পরিবারের ভরণ পোষণসহ দৈনন্দিন নানামুখী চাপে থাকেন পরিবার-প্রধান। দেশের মহানগরগুলোর বস্তিতে থাকা পরিবার প্রধানদের চাপ আরও বেশি। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শহরে আসা মানুষ। সামনে আছে বিলাসিতার নানান উপাদান। কিন্তু সেগুলো ছুঁয়ে দেখার সাধ্য নেই। অথচ বস্তি থেকে বের হলেই নানান রঙের হাতছানি।
একদিকে সাধ। অন্যদিকে সাধ মেটানোর সাধ্যের অভাব। এই দুইয়ের মাঝখানে নানান চাপে দিন কাটে শহরের দরিদ্র মানুষের। বিশেষ করে বস্তিবাসীদের। পরিবারের অভাবের চাপ এসে পড়ছে শিশুর শরীর ও মনের ওপর। আর সেই সমস্যাকেই পুঁজি করে চলছে ডিজিটাল প্রতারণা। দেশি-বিদেশি প্রতারক চক্র তাদের ভুলিয়ে নিয়ে আসে রঙিন তবে অন্ধকার দুনিয়ায়।
২০২৬ সালের ৩০ জুলাই জাতিসংঘের বিশ্ব মানবপাচার প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ট্র্যাপড বিহাইন্ড দ্য স্ক্যাম’ অথবা ‘প্রতারণার আড়ালের ফাঁদ’। অনলাইন প্রতারণার আড়ালে মানবিক সংকট ও সাইবার দাসত্বকে তুলে ধরতেই এই প্রতিপাদ্য। সময়োপযোগী এই প্রতিপাদ্য যথার্থ। আর বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও পড়ছে ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদে। ডিজিটাল জগতে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ১৬ বছরের কম ও ব্রাজিল ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। তাছাড়া যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, গ্রিস, স্পেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় ৩৬টি দেশে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বন্ধের প্রক্রিয়া চলমান। বাংলাদেশে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের তেমন কোনও বিধিনিষেধ এখন পর্যন্ত সরকারি পর্যায় থেকে ঘোষণা করা হয়নি। পরিবারে পিতামাতারা কিছু নিয়ম মেনে শিশুদের এ ব্যাপারে কঠোরতা দেখান। শিশুদের অনলাইন থেকে দূরে রাখতে কিছু কৌশলও পিতামাতারা প্রয়োগ করেন। কিন্তু সেটি ঠেকানোর কোনও বাস্তব উপায় অভিভাবকদের আছে কিনা আমার জানা নেই। অনলাইনে শিশুর সুরক্ষায়, ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদ থেকে শিশুকে রক্ষা করতে এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
প্রতারক চক্র, মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আলোচিত বিচার প্রতারণা ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, নিয়মিত শিশু উদ্ধার অভিযান, শিশু নির্যাতনকারী ও শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণকারীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। শিশুদের ব্যবহার করে ব্যবসা করছে প্রতারক চক্র ও মানবপাচারকারীরা। বৈশ্বিকভাবে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। সাম্প্রতিক জেফ্রি এপস্টিনের কেলেঙ্কারির কথা আলোচিত হয়েছে বিশ্বজুড়ে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন শোষণ, যৌনপাচার এবং এসব কর্মকাণ্ডে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত অপরাধ ও বিচারিক ঘটনা।
২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত শিশুদের জন্য মেটার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে ‘মেটা’-কে ৩৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধের নির্দেশ দেয়। রায়ে বলা হয়, মেটা’র মালিকানাধীন ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। মেটা শিশুর যৌনতা বিষয়ক কনটেন্ট ও যৌন শিকারিদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রতারক চক্রকে মোকাবিলা করবো কীভাবে? ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বিভিন্ন হোটেল, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা স্পা সেন্টারে, পতিতালয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি যৌনকর্মে নিযুক্ত শিশুদের উদ্ধারের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
অভিযানের পর মামলাও হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কয়েকটি সফল অভিযান চালিয়েছেন। কয়েকজন ভুক্তভোগী শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। আটক হয়েছে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদেরও। সংশ্লিষ্ট থানায় মামলাও হয়েছে।
পাচারকারীরা চাকরির লোভ দেখিয়ে, প্রেমের ফাঁদে ফেলে, প্রতারণার মাধ্যমে শিশুদের যৌন পেশায় বাধ্য করছে। শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুব একটা চোখে পড়ে না। অপরাধীরা ধরা পড়ছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে জামিনে বেরও হয়ে আসছে। সেজন্যই অপরাধের আগে ও পরে তার মনে যে ভয় থাকার কথা, সেটি থাকছে না। এখানেই পরিবর্তনের দাবি।
অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। নতুবা শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণের মতো জঘন্য অপরাধ ঘটতেই থাকবে।
সাম্প্রতিক আলোচিত কয়েকটি শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দেশব্যাপী বিচারের দাবি ওঠায় ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুবিচারের আশ্বাস দেওয়া হয় এবং বিচারও দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়। শুধু আলোচিত শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নয়, শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণের সকল ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তাহলেই সব শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
লেখক: উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত একজন ফ্রিল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী