‘বহ মিঞা, এই সব গল্প পাইবা কই?’

আহসান কবির
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৩ আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৯

এক.
ডাকনাম দিয়েই শুরু করি। কয়েকবার দেখা হওয়ার পরে প্রথমে জানতে চাইতাম ‘টুলু’ ভাই কেমন আছেন? উনি চোখ বড় করে আমাকে মাপতেন। বলতেন, শোনো মিঞা তোমার সাথে পরিচয় আমি আমীরুল ইসলাম হইবার পরে। তুমি মিঞা আমার মহল্লার কিংবা স্কুল জীবনের কেউ না। ডাকনামে ডাকো কেন? বলতাম আরও কয়েকবার ডাকবো। যখন আপনি আর রাগবেন না তখন আমীরুল ইসলাম নামেই ডাকবো! তাকে রাগানোর আরও একটা উপায় ছিল। কেউ শুনবে না, এমনভাবে কানের কাছে যেয়ে বলতাম –‘ভাই আপনি নাকি নিজের নামেই লিখেন না, অন্যের নামে বা অন্যের জন্যও লিখে দেন?
ভাইয়ের চেহারাটা তখন দেখার মতো হতো। আমীরুল ইসলাম ভাই পৃথিবী কাঁপানো ‘নাইন ইলেভেনে’ (১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকল রাগের ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন!

দুই.
আমীরুল ভাই ঊর্ধ্বেই ছিলেন। আড্ডা দিতেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে।  একদিন বললেন, ওই মিঞা এই খানে আসো না কেন? আমি বললাম, আমি নিচুতলার মানুষ। উপর থেকে ছোটদের আরও ছোট দেখায়! ভাই বললেন, আরে বহ। দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দর্শন ঝাইড়ো না! তোমগো খুলনার চুইঝাল দিয়া গরুর মাংস আমার খুব প্রিয়। একদিন রান্না কইরা খাওয়ামুনে। আইজকা আড্ডা দেই মিঞা। আমীরুল ইসলাম ভাইয়ের রান্নার বাতিক ছিল। আমি বললাম, চুইঝাল দিয়া গরু রান্না হইলে খবর দিয়েন। আসুমনে। এরপর আর কখনও এটা রেধেছেন কি না জানতে পারিনি।

তিন.
আমি আসলে অনেক কিছুই জানতে চাইনি। কখনো তার একা একা জীবনের ভেতরে ঢুকতে চাইনি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কিংবা তার কর্মস্থলেও পাঁচ ছয়বারের বেশি যাইনি। তার গল্পের ভাণ্ডরের চেয়ে ‘বিতর্ক’ ছিল নিত্যসঙ্গী। উনি শ্রদ্ধেয় রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, আবদুল্লাহ আবু সাঈদ ও ফরিদুর রেজা সাগর সাহেবের কথা বেশি বলতেন। প্রাবন্ধিক আহমদ মাযহার আর ছড়াকার আসলাম সানী ভাইয়ের কথাও অসংখ্যবার বলেছেন। উনি বলতে পছন্দ করতেন। রান্না করে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। আমি তাকে দেখলেই বলতাম দুই পাঞ্জাবী পরা মানুষের ঘোরবিরোধী আমি। আপনি এই দুইজনকেই পছন্দ করেন। তাই আপনার কাছ থেকে দূরে থাকি। আমীরুল ভাই নিজেই শেষমেষ দূরে চলে গেলেন।

চার.
বিখ্যাত ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, আসলাম সানী আর শিল্পী ধ্রুব এষ এর অনেক গল্পও শুনেছি তার মুখে। একবার কী এক বাজি হলো তাদের মধ্যে। সত্যি মিথ্যা জানি না। বাজি জিততে সানী ভাই বাংলামোটর মোড়ে কিছু একটা খুলে নাকি দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপরের কাহিনী আরও চমকপ্রদ। যা খুলে দাঁড়িয়েছিলেন সেটা পরিয়ে দিতে নাকি আমীরুল ভাইদেরই যেতে হয়েছিল। লেখার বিল তুলতে যেয়ে কলিজার সিঙ্গাড়া খাওয়ানো, কোন সাহিত্য সম্পাদক কীসে আসক্ত এসব আমীরুল ভাই রসিয়ে রসিয়ে বলতে পারতেন। পুরোনো ঢাকার কৌতুক বলতেন দরাজ গলায়। যেমন ছয়ফুট লম্বা এক লোক মাছ কিনতে এসেছে। মাছ দেখে বিক্রেতাকে বললো, ওই মিঞা তোমার মাছ তো পচা। বিক্রেতার ঝটপট উত্তর, আবে দেখতাছেন তো দুইতলা থাইক্কা! 

আমীরুল ইসলাম ভাই এখন কী আমাদের ওপর থেকে দেখবেন?

পাঁচ.
নিজের চারদিকে একটা দেয়াল গড়ে তুলেছিলেন আমীর ভাই। সাংবাদিক গোলাম মোর্তজা, বিপ্লব মোস্তাফিজ, জাগৃতির ফয়সাল আরেফীন দীপন থেকে শুরু করে লেখক সুরকার তানভীর তারেক কিংবা মনজুর কাদের জিয়ার মতো ছোট বড় অসংখ্য গুনগ্রাহী ছিল আমীরুল ভাইয়ের। সবাই ছিল শ্রোতা। বলতেন তিনি একাই। প্রধানত জীবন তার আড্ডার। তিনি জানতেন এবং বলতেন কোনও আড্ডাতেই মানুষেরা চিরস্থায়ী নয়। সময় বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়। ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলায় পরিস্থিতি আর মানুষের অবস্থান। তিনি বদলে যাননি। আড্ডা দিয়েছেন, প্রচুর পড়েছেন এবং লিখেছেন। শিশুদের জন্য এসব ছড়া, রস রচনা, গল্প কিংবা উপন্যাস মিলিয়ে কয়েক শত বই লিখেছেন। ১৮ বা ১৯ বছর বয়সে পেয়েছেন শিশু সাহিত্য পুরস্কার। এরপর একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন জীবনে। সম্মান পাওয়ার পরে নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, যা আছে তার ছড়ার বইয়ের নামকরণে-‘হ্যাঁ ছড়া না ছড়া’! যে দেয়াল গড়েছিলেন নিজের চারপাশে সেটা ভেদ করতে পারেনি কেউ। তাই তার ভেতরের গল্প তেমন নেই। যদিও ছড়ায় তিনি বলে গেছেন, ‘আমীরুল কথা শোন, আর কত ঘুরবি?/..নিজের আগুনে তুই আর কতো পুড়বি?’ নিজের কথা না থাকলেও আছে তার দরাজ গলায় অন্যের গল্প শোনার আহ্বান, ‘আরে বহ মিঞা। এমন গল্প আর কোথাও পাইবা না।’

আমীরুল ভাই নিজেই গল্প হয়ে গেছেন। মানুষ হারায় গল্প বেঁচে থাকে!

ছয়.
আমীরুল ইসলাম বেঁচে থাকবেন ছোট বড় সকল শিশুর হৃদয়ে। শিশুদের জন্য আমীরুল ভাইয়ের লেখা মনে রাখার মতো। বিদেশি যত রূপকথা অনুবাদ করেছেন বা ‘নিজস্বকরণ’ করেছেন সেটা হয়তো অনেকেই জানেন না। খুব অল্প বয়সে উপন্যাস লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে জাতীয় পত্রিকায়, অলংকরণ করতে এসে বিখ্যাত অভিনেতা আফজাল হোসেন মনে করেছেন, লেখক হয়তো কোনও বয়স্ক স্কুল শিক্ষক! একা একা জীবনে তার চাচা হাবীবুর রহমান ও মায়ের প্রভাব ছিল। মা’কে নিয়ে অনেক লেখার একটা বলি, ‘‘মা তো আমার দেবীর মতো/নীল আকাশের পরী/যখন ছড়া হয় না লেখা মাকে স্মরণ করি।” নিজের দুঃখটাও প্রকটভাবে আছে তার ছড়ায়। অভিনয়ের জগতে হাসতে হাসতে যে মনভাঙ্গা কান্না সেটাও ছিল তার ছড়ায়। যেমন- ‘মহাকালের গর্ভে আমার কী বা এমন মূল্য? কেউ পড়ে না লেখা আমার জীবদ্দশায় ভুললো!’ 

আমীরুল ইসলামকে ভোলা সম্ভব না। মনে পড়বে বাজখাই গলার সেই আহ্বান-‘ওই মিঞা মইরা যাবার পরে দুই লাইন লিখখো’!

সাত.
জীবনের শেষদিনগুলো ভালো কাটেনি আমীরুল ভাইয়ের। শেষ দেখা হয়েছিল তার কর্মস্থলেই। হাঁটতে কষ্ট হতো। বেশিক্ষণ বসে থাকতেও পারতেন না। ডায়াবেটিস আর কিডনি জটিলতার কারণে দাঁত আর চোখের দৃষ্টিও কমে এসেছিল। উচ্চ রক্তচাপও ছিল। জীবনের কোনও চাপকেই তিনি আসলে গ্রাহ্যসীমায় রাখেননি। হয়তো প্রতীক্ষায় ছিলেন। হয়তো দেয়াল দিয়ে আড়াল করে রাখা জীবনের গল্প দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে হাসিরঙ দিয়ে আঁকতেন। আমি কিংবা আমরা হয়তো সেই হাসিটাই দেখতাম। মনেও করিনি সেই গানের লাইন, ‘এমনও হাসি আছে বেদনা মনে হয়’!

যিনি সবার গল্প বলতেন তার জীবনের গল্পটা শেষমেষ হারিয়ে গেলো। কেউ কী আছেন দেয়ালের আড়ালে থাকা আমীরুল ভাইয়ের গল্প আমাকে বলতে পারবেন?

/আইএএম/
সম্পর্কিত
অরাজনৈতিক হেফাজতের ‘নেতৃত্বে’ সাত ইসলামিক দল
 ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের ইতিহাসের উত্তরাধিকার
সমাজে সহনশীলতা কমছে কেন?
সর্বশেষ খবর
মানুষের জীবন বদলের গল্প নিয়ে ‘সুখ ফুটেছে মুখের রেখায়’ প্রদর্শনী শুরু
মানুষের জীবন বদলের গল্প নিয়ে ‘সুখ ফুটেছে মুখের রেখায়’ প্রদর্শনী শুরু
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
বর্ণিল আয়োজনে পালিত হচ্ছে হ্যালোইন: দিনটি ঘিরে ঢাকায় যত আয়োজন
বর্ণিল আয়োজনে পালিত হচ্ছে হ্যালোইন: দিনটি ঘিরে ঢাকায় যত আয়োজন
ইনানীতে গ্যাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে তেলও, আগুন আরও কতদিন জ্বলবে
ইনানীতে গ্যাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে তেলও, আগুন আরও কতদিন জ্বলবে
সর্বাধিক পঠিত
শততম ছবিতে চমক, শেষ ছবিতে বিদায়: আলমগীর-শাবানা জুটির গল্প
শততম ছবিতে চমক, শেষ ছবিতে বিদায়: আলমগীর-শাবানা জুটির গল্প
প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে ভিন্ন বার্তা প্রভার
প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে ভিন্ন বার্তা প্রভার
ধানক্ষেতে আত্মগোপন করেও শেষ রক্ষা হলো না আওয়ামী লীগ নেতার
ধানক্ষেতে আত্মগোপন করেও শেষ রক্ষা হলো না আওয়ামী লীগ নেতার
প্রথম দিনে বাজারে ঢুকেছে হাজার টন ইলিশ, দাম কত?
প্রথম দিনে বাজারে ঢুকেছে হাজার টন ইলিশ, দাম কত?
হাজারো মোমবাতির আলোয় আলোকিত গারো পাহাড়
হাজারো মোমবাতির আলোয় আলোকিত গারো পাহাড়