ডিজিটাল বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে শেখ হাসিনা সরকার প্রণীত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ এবং ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩’ নাগরিক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে যে অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের প্রত্যাশাতেই মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ বা এর সংশোধিত কাঠামোর অবতারণা করে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিগত সরকারের আমলে প্রণীত বিতর্কিত ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩’ বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারির উদ্যোগ নেয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভিন্নমত দমন ও মুক্ত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘স্পিচ অফেন্স’ বা মতপ্রকাশজনিত ধারাগুলোর অবসান ঘটানো। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পূর্ববর্তী নিপীড়নমূলক আইনের অধীনে দায়েরকৃত রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, তদন্ত বাতিল এবং দণ্ডিতদের সাজা ও জরিমানা মওকুফের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
নতুন অধ্যাদেশে প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট সংযোগের অধিকারকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, এআই-নির্ভর ডিপফেক অপরাধ ও নারীর সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নির্বাহী ব্লকিংয়ের ক্ষেত্রে আদালতের পূর্বঅনুমোদন ও তালিকা প্রকাশের মতো কিছু ইতিবাচক পদ্ধতিগত সংস্কার আনা হয়। সমকালীন বিশ্বে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো রক্ষা, প্রাণঘাতী ম্যালওয়্যার আক্রমণ প্রতিহত করা, নন-কনসেনসুয়াল পর্নোগ্রাফি, শিশু যৌন নিপীড়নমূলক উপাদান এবং এআই-নির্ভর ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে একটি আধুনিক সাইবার প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
সেই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ পাস হয়। তবে আইনটি কার্যকরের অল্প সময়ের মধ্যেই ডিপফেক, এআই-উৎপাদিত ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ এবং গুজব ও অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে সরকার পুনরায় ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ বা এর সংশোধনী বিল উত্থাপন ও পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির মাধ্যমে এই সংশোধনীর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের শাসনামলের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর দমনমূলক ধারাগুলোর অবসান ঘটিয়ে নাগরিক স্বাধীনতার বাতাবরণ সৃষ্টির যে অঙ্গীকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকাশ করেছিল, নির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ পাস হওয়ার মাত্র কয়েকমাসের মাথায় তার উল্টোযাত্রা দৃশ্যমান হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ, ডিপফেক প্রতিরোধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘গুজব ও অপতথ্য’ মোকাবিলার প্রশাসনিক তাগিদ দেখিয়ে সরকার যেভাবে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা ও পাসের তৎপরতা শুরু করেছে— তা কার্যত পুরোনো দমনমূলক ব্যবস্থারই এক আগ্রাসী পুনরাবৃত্তি।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬-এর দ্বিতীয় অধ্যায় এবং ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ধারায় পরিকল্পিত জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি, সিআইআরটি, ফরেনসিক ল্যাব এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখাটি কারিগরি দিক থেকে আধুনিক এবং একইসাথে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সমস্যাজনক বুদাপেস্ট কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রটোকলের সাথে সংগতিপূর্ণ হলেও তা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মানদণ্ডে এক চরম কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতায় আক্রান্ত।
এজেন্সিকে কোনও স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ কমিশনের রূপ না দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আজ্ঞাবহ সংযুক্ত দফতর বানিয়ে রাখা, বেসামরিক ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যুক্ত করা এবং সংসদের আওতা এড়িয়ে ঢালাও নির্বাহী বিধিমালার ওপর এজেন্সির ক্ষমতা, নেটওয়ার্ক লগ বিনিময় ও নজরদারির মানদণ্ড নির্ধারণের সুযোগ দেওয়ায় পুরো ব্যবস্থাটি প্রশাসনিক দমনযন্ত্রে রূপ নেওয়ার পথ তৈরি করেছে।
একইভাবে রাষ্ট্রের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হিসেবে গঠিত জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিব এবং ডিজিএফআই, এনএসআই ও এনটিএমসির মতো গোয়েন্দা ও নজরদারি সংস্থাগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য একে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক সংস্থায় পরিণত করেছে— যেখানে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বা তথ্য কমিশনের নামমাত্র উপস্থিতি থাকলেও নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন অংশীজনদের কার্যকর কোনও ভারসাম্য নেই। ফলে বিচারিক পরোয়ানা ও তদারকি ছাড়াই এই কাউন্সিলের একক নির্দেশনায় অনলাইন কনটেন্ট ব্লকিং, ট্রাফিক নজরদারি ও সেন্সরশিপ আরোপের অবারিত ক্ষমতা নাগরিকের গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।
তদুপরি কাউন্সিলের গঠনগত ত্রুটি বা সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ না করার আইনি সুরক্ষা নির্বাহী স্বেচ্ছাচারিতাকে বিচারহীন ছাড় দেওয়ার শামিল, যা প্রযুক্তিগত সুরক্ষার আড়ালে নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বের এক অতি-কেন্দ্রীভূত প্রাতিষ্ঠানিক বলয় কায়েম করে।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনের ৮ ধারাটি সাইবার শৃঙ্খলা রক্ষার আড়ালে মূলত প্রশাসনিক সেন্সরশিপ ও নির্বাহী আধিপত্য কায়েমের পথ উন্মুক্ত করেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আইনের শাসনের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে গভীরভাবে সাংঘর্ষিক। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মতপ্রকাশ সীমিত করার ক্ষেত্রে ‘আইনি নির্দিষ্টতা’, ‘বৈধ উদ্দেশ্য’ এবং ‘আনুপাতিক প্রয়োজনীয়তা’র যে কঠোর শর্ত (Three-part test) রয়েছে, তা এখানে লঙ্ঘিত। উপধারা (২)-এ ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা’ কিংবা ‘রাষ্ট্রের অবমাননা’র মতো অস্পষ্ট ও অনির্ধারিত পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে
আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রকে সমালোচনা থেকে বিমূর্তভাবে আড়াল করার কোনও সুযোগ নেই; তদুপরি ‘রাবাত প্ল্যান অব অ্যাকশন’ অনুযায়ী সহিংসতার প্রত্যক্ষ ও তাৎক্ষণিক ঝুঁকি (Imminent Harm) ছাড়া কেবল প্রশাসনিক ‘আশঙ্কা’র বশে কনটেন্ট ব্লকিং বেআইনি। বৈশ্বিক ‘ম্যানিলা নীতিমালা’ অনুযায়ী ডিজিটাল কনটেন্ট অপসারণে স্বাধীন আদালতের পূর্বানুমোদন আবশ্যক হলেও এখানে মহাপরিচালক, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও মন্ত্রণালয়কে সরাসরি ব্লকিংয়ের একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। উপধারা (৪)-এ ঘটনার পর আদালতে বা খোদ এজেন্সির কাছে প্রতিকার চাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে, যা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
ইন্টারনেটের যুগে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক আলোচনা বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ব্লক করার পর দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে তথ্যের উপযোগিতা নষ্ট হয়ে যায়, যা বাস্তবে নীরব সেন্সরশিপ ও ব্যাপক ‘চিলিং ইফেক্ট’ তৈরি করে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সরকারের নির্দেশে দ্রুত কনটেন্ট সরাতে বাধ্য করার ফলে মধ্যস্থতাকারীদের আইনি সুরক্ষা বিনষ্ট হবে এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ রুদ্ধ হবে।
এছাড়া উপধারা (৫)-এর মাধ্যমে মূল সংসদীয় আইনের বাইরে নির্বাহী বিধিমালার ওপর ক্ষমতা সম্প্রসারণের পথ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক সাইবার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে অস্পষ্ট পরিভাষাগুলো সম্পূর্ণ বাতিল করা, কনটেন্ট ব্লকিংয়ের ক্ষেত্র কেবল প্রত্যক্ষ সহিংসতা ও মারাত্মক অপরাধের মধ্যে সীমিত রাখা এবং যেকোনও নির্বাহী পদক্ষেপের পূর্বে স্বাধীন বিচার বিভাগের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা অপরিহার্য।
প্রস্তাবিত সংশোধন আইনের ২৩, ২৫, ২৬ ও ২৬ক ধারাগুলো আধুনিক সাইবার হুমকি ও গুরুতর ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলার বাস্তবমুখী উদ্যোগ ধারণ করলেও অস্পষ্ট পরিভাষা, অতি-বিস্তৃত প্রয়োগক্ষেত্র এবং শাস্তির চরম অসামঞ্জস্যতার কারণে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও আইনের শাসনের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে গভীর সংঘাত তৈরি করেছে।
২৩ ধারায় ম্যালওয়্যার হামলা, প্রাণহানি ঘটানো কিংবা বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ধ্বংসকে সাইবার সন্ত্রাস হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ডের বিধান আন্তর্জাতিক সাইবার আইনের আধুনিক কৌশলের সাথে সংগতিপূর্ণ; এমনকি বৃহত্তর জনস্বার্থে তথ্য ফাঁসের জন্য হুইসেলব্লোয়ারদের দায়মুক্তির বিধানটি একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি।
তবে একই ধারায় ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ’ বা ‘জনশৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা’-র মতো ব্যক্তিনিষ্ঠ ও দূরবর্তী অনুমানের ভিত্তিতে অনুপ্রবেশকে সাইবার সন্ত্রাসের রূপ দেওয়া হয়েছে, যা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গঠনমূলক বিশ্লেষণকে রাষ্ট্রদ্রোহ বা সন্ত্রাসের সমতুল্য করার ঝুঁকি তৈরি করে।
একইভাবে ২৫ ধারায় নন-কনসেনসুয়াল পর্নোগ্রাফি, শিশু যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট (CSAM), সেক্সটর্শন, ব্ল্যাকমেইল এবং এআই প্রযুক্তিনির্ভর ডিপফেকের মতো গুরুতর ডিজিটাল যৌন অপরাধ রোধে কঠোর শাস্তির বিধান নারী ও শিশুর মানবাধিকার সুরক্ষায় অত্যন্ত সময়োপযোগী। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ থেকে দেওয়ানি প্রতিকারের আওতায় নেওয়ার যে সর্বজনীন নীতি রয়েছে, তা উপেক্ষা করে এখানে মানহানি ও ব্যক্তিনিষ্ঠ অসম্মানবোধ বা ‘হেয়প্রতিপন্ন’ করাকে অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। কাউকে অপমানিত মনে করানোর মতো ঢালাও ও অনির্ধারিত সংজ্ঞাকে গুরুতর যৌন সহিংসতার সমান্তরালে রেখে ফৌজদারি কাঠামোর ভেতর সাজা দেওয়ার বিধানটি রাজনৈতিক সমালোচনা ও বাকস্বাধীনতা স্তব্ধ করার একটি বিধ্বংসী অস্ত্রে রূপ নিতে পারে।
অন্যদিকে, ২৬ ও ২৬ক ধারায় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও অপতথ্য মোকাবিলার আড়ালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত হানা হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাবাত কর্মপরিকল্পনার ছয় স্তরের কঠোর পরীক্ষা—বিশেষ করে সহিংসতার প্রত্যক্ষ ও তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মানদণ্ড—উপেক্ষা করে ধারা ২৬-এ কেবল ‘উদ্বেগ সৃষ্টি’র মতো শিথিল অনুভূতির ভিত্তিতে অপরাধের পরিধি টানা হয়েছে। এর চেয়েও বিপজ্জনক ধারা ২৬ক, যেখানে ‘অযাচাইকৃত তথ্য’ বা ‘বিভ্রান্তির সম্ভাবনা’ হিসেবে গুজবের চরম অস্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড এবং চল্লিশ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
সহিংসতা উসকানোর সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর হওয়া সত্ত্বেও নিছক অপতথ্য প্রচারের জন্য দশ বছরের সাজার বিধান শাস্তির আনুপাতিকতার নীতিকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে, যা দুর্নীতি অনুসন্ধান ও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে অপরাধীকরণের ঝুঁকি তৈরি করে।
ফলে এই বিধানগুলোর মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা ও প্রকৃত ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হলেও, অস্পষ্ট পরিভাষা ও ফৌজদারি অতিপ্রয়োগের কারণে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় গভীর ভীতি তৈরি এবং রাষ্ট্রীয় ভিন্নমত দমনের কর্তৃত্ববাদী ফাঁদ বহাল থেকে যায়।
আইনের ২৯ ও ৩০ নম্বর ধারা দুটি আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির আর্থিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য আইনি অগ্রগতি দেখালেও, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতি ও বাণিজ্যিক সুরক্ষার দিক থেকে গভীর সংকট তৈরি করেছে।
ধারা ২৯-এর উপ-ধারা (২) ও (৩)-এ করপোরেট সত্তাকে স্বতন্ত্রভাবে বিচারের আওতায় এনে জরিমানা বা কার্যক্রম স্থগিতের ক্ষমতা দেওয়া এবং ধারা ৩০-এ ভুক্তভোগীকে জরিমানার অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিচারিক এখতিয়ার আন্তর্জাতিক বুদাপেস্ট কনভেনশন ও আইসিসিপিআর-এর ‘কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার অধিকার’-এর সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রচলিত কেবল কারাদণ্ডভিত্তিক শাস্তির বাইরে গিয়ে এই বিধান ভুক্তভোগীর আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি নিরাময়ে আন্তর্জাতিক পুনরুদ্ধারমূলক বিচারব্যবস্থার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
তবে ধারা ২৯-এর উপ-ধারা (১)-এ প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের দায়ে কোম্পানির মালিক, প্রধান নির্বাহী, পরিচালক ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ‘নির্দোষিতার পূর্বানুমান’ অগ্রাহ্য করে প্রমাণের দায়ভার উল্টে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর চাপানো হয়েছে, যা সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের মৌলিক স্বীকৃতি এবং সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার অলঙ্ঘনীয় অধিকারের চরম পরিপন্থী।
রাষ্ট্রপক্ষের অপরাধ প্রমাণ করার চিরাচরিত নীতি লঙ্ঘন করে আসামিকে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের বাধ্যবাধকতায় ফেলায় যেকোনো বহিরাগত সাইবার হামলা বা ব্যবহারকারীর অপকর্মের দায়ে প্ল্যাটফর্মের কর্মকর্তাদের ঢালাওভাবে আটক ও ফৌজদারি হয়রানির ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ডিজিটাল উদ্ভাবন, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে।
একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা সামগ্রিক কার্যক্রম বাতিল বা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপরাধের আনুপাতিকতার নীতি কঠোরভাবে মানা না হলে তা সাধারণ কর্মীদের জীবিকা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহকে হুমকির মুখে ফেলবে।
সামগ্রিক বিচারে, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণের আধুনিক রূপরেখা প্রশংসনীয় হলেও, আইনের শাসনকে অক্ষুণ্ণ রাখতে করপোরেট কর্মকর্তাদের ওপর ঢালাও দোষারোপের বিধান বাতিল করে অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা প্রমাণের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রপক্ষের ওপরই ন্যস্ত থাকা অপরিহার্য।
প্রস্তাবিত সংশোধন আইনের ৩১ থেকে ৩৬ নম্বর ধারাগুলো সাইবার অপরাধ তদন্ত, আলামত সংগ্রহ, তল্লাশি এবং তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু যুগান্তকারী বিচারিক সুরক্ষার দ্বার উন্মোচন করলেও, তদন্তকারী সংস্থার হাতে বিচারহীন ক্ষমতা অর্পণ এবং অনির্দিষ্ট সময়সীমার অবকাশ রেখে নাগরিকের মৌলিক স্বাধীনতা ও গোপনীয়তাকে গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলেছে। ধারা ৩১-এ সংবেদনশীল ও প্রায়শই রাজনৈতিকভাবে অপব্যবহৃত অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে মামলা দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নথি ও আটক ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন মনে হলে প্রাথমিক পর্যায়েই মামলা খারিজ করে আসামিকে তাৎক্ষণিক মুক্তি দেওয়ার যে বিচারিক ক্ষমতা আমলী ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া হয়েছে, তা বেআইনি আটক রোধে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ৯ অনুচ্ছেদের আলোকে একটি বৈপ্লবিক অগ্রগতি; একইসঙ্গে যৌথ তদন্ত দলের বিধান তদন্তের পেশাদারত্ব বাড়াতে সহায়ক।
একইভাবে ধারা ৩৪-এ যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশির ক্ষেত্রে আদালতের বিচারিক পরোয়ানা সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা এবং ধারা ৩৬-এ ডিজিটাল আলামত নষ্ট হওয়া রোধে প্রাথমিক ৯০ দিন সংরক্ষণের পর আদালতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমায় ডেটা সংরক্ষণের বিধান বুদাপেস্ট কনভেনশন ও আনুপাতিকতার নীতির সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ।
তবে ধারা ৩২-এ তদন্তের জন্য মোট ১৩৫ দিনের পর্যায়ক্রমিক সময়সীমা বেঁধে দেওয়া সত্ত্বেও ‘প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার’ অজুহাতে বিচারিক অনুমতি নিয়ে তদন্তকাল অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার সুযোগ আইনের শাসনের সুনির্দিষ্টতা ক্ষুণ্ণ করে এবং দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকারকে ধূলিসাৎ করে ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে বিচারপূর্ব অনিশ্চয়তায় ঝুলিয়ে রাখার পথ তৈরি করে।
প্রস্তাবিত সংশোধন আইনের সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক ও আইনি সংকট তৈরি করেছে ধারা ৩৩ ও ৩৫। ধারা ৩৩-এ আদালতের আগাম পরোয়ানা ছাড়াই তদন্তকারী কর্মকর্তাকে যেকোনো কম্পিউটার, মোবাইল সিস্টেম বা রিমুভেবল ড্রাইভ জব্দ এবং নির্বিচারে তথ্যপ্রবাহের ডেটা হস্তগত করার যে ঢালাও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা আইসিসিপিআর-এর ১৭ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির চরম লঙ্ঘন— যেখানে পরবর্তীকালে আদালতকে কেবল ‘অবহিত’ করার আনুষ্ঠানিকতা কোনোভাবেই স্বাধীন বিচারিক তদারকির বিকল্প হতে পারে না।
উপরন্তু, ধারা ৩৩-এর অধীনে বিশেষজ্ঞ দল নিয়োগের একচ্ছত্র ক্ষমতা নির্বাহী মহাপরিচালকের হাতে থাকায় ডিজিটাল আলামতের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। অপরদিকে ধারা ৩৫-এ গুরুতর অবকাঠামোগত অপরাধের আলামত নষ্টের আশঙ্কায় পরোয়ানা ছাড়া অভিযানের সুযোগ দিতে গিয়ে তল্লাশিকালে উপস্থিত যে কারও ব্যক্তিগত ‘দেহ তল্লাশি’ এবং নিছক আত্মগত সন্দেহের ভিত্তিতে ‘যেকোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতার’ করার অবারিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ বা পরিবারের সদস্যদেরও পুলিশি হয়রানির মুখে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে।
সামগ্রিক মূল্যায়নে স্পষ্ট হয় যে, আমলী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রাথমিক তদারকি, পরোয়ানাভিত্তিক তল্লাশি এবং সময়সীমাযুক্ত ডেটা সংরক্ষণের ইতিবাচক দিকগুলো থাকা সত্ত্বেও তদন্তের সময়সীমার সর্বোচ্চ সীমা না রাখা এবং বিচারিক পরোয়ানা ছাড়াই ঢালাও ডিভাইস জব্দ ও নির্বিচার গ্রেফতারের সুযোগ বহাল থাকায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ফেয়ার ট্রায়ালের মূল চেতনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়— ফলে সাইবার তদন্তে আধুনিক দক্ষতা ও আলামত রক্ষার পাশাপাশি নাগরিকের মৌলিক সুরক্ষায় প্রতিটি তল্লাশি, জব্দ ও আটকের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচারিক পূর্বানুমোদন এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণের কঠোর শর্তারোপ করাই আইনের শাসনের অপরিহার্য দাবি।
প্রস্তাবিত সংশোধন আইনের ৩৮ থেকে ৪১ক ধারা, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি সংক্রান্ত ধারা এবং ৪৯ ধারার সামগ্রিক বিচার-বিশ্লেষণ উন্মোচন করে যে, প্রযুক্তিগত তদন্তের গতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ইতিবাচক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও এই বিধানগুলো চূড়ান্ত পর্যায়ে নির্বাহী বিভাগ ও পুলিশকে অবারিত কর্তৃত্ব দিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মানবাধিকারের মৌলিক ভিত্তিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ধারা ৩৮ ও ৩৯-এ তদন্তে প্রযুক্তিগত আলামত উন্মোচনে ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সহযোগিতা বাধ্যতামূলক করা, সহযোগিতাকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং তথ্যের অপব্যবহারে শাস্তির বিধান বুদাপেস্ট কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক ডেটা সুরক্ষার ধারণার সাথে সংগতিপূর্ণ হলেও, আদালতের বিচারিক পরোয়ানা ছাড়াই কেবল পুলিশি নোটিশে ব্যবহারকারীর সংবেদনশীল তথ্য হস্তান্তরে বাধ্য করার নিয়ম নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের (ICCPR) ১৭ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত গোপনীয়তার অধিকারকে সরাসরি নস্যাৎ করে।
পদ্ধতিগত ক্ষেত্রে সবচেয়ে মারাত্মক সাংবিধানিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে ধারা ৪০ ও ৪১। ধারা ৪০(১)-এ তৃতীয় পক্ষের অযাচিত মামলার সংস্কৃতি রুখতে কেবল সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও পুলিশের মধ্যে মামলা দায়ের সীমিত রাখার সুরক্ষামূলক উদ্দেশ্য থাকলেও, ধারা ৪০(৪)-এ পুলিশের লিখিত প্রতিবেদন ছাড়া আদালতের বিচারার্থে অপরাধ গ্রহণের (Cognizance) ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে— যার ফলে একজন প্রকৃত ভুক্তভোগী আদালতের কাছে নালিশ ও তথ্যপ্রমাণ দাখিল করলেও বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণভাবে পুলিশের মুখাপেক্ষী হতে হয়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইসিসিপিআর-এর ১৪ অনুচ্ছেদে নিশ্চিতকৃত আদালতে সরাসরি প্রতিকার পাওয়ার অধিকারের ওপর কুঠারাঘাত। একইভাবে ধারা ৪১(৩)-এ সাইবার অপরাধের মতো জটিল, প্রযুক্তিগত ও ফরেনসিক প্রমাণের বিষয়গুলোকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পরিচালিত ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর আওতায় নিয়ে এসে সংক্ষিপ্ত বিচার ও সাজা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আইনজীবী নিয়োগ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো আন্তর্জাতিক ফেয়ার ট্রায়ালের ন্যূনতম শর্তগুলোকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে।
আইনের শাসনের সমতার নীতিকে আরও নস্যাৎ করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রাখা ঢালাও দায়মুক্তির বিধান। ‘সরল বিশ্বাসে’ কৃত কাজের অজুহাতে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলার পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে এটি বেআইনি নজরদারি ও ক্ষতিসাধনের শিকার নাগরিকের জন্য আইসিসিপিআর-এর ২(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার অধিকারকে বন্ধ করে দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি কায়েম করে। অবশেষে ধারা ৪৯-এ ফরেনসিক ল্যাব, এমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ও জরুরি তথ্য পরিকাঠামো রক্ষার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সৃষ্টির সুযোগ রাখা হলেও, ট্রাফিক ডাটা সংগ্রহ, এনক্রিপশন ভাঙা বা ডিক্রিপশন এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লকিংয়ের মতো মৌলিক অধিকার-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে প্রধান আইনের আওতায় সুনির্দিষ্ট না রেখে সরকারের নির্বাহী আদেশে বিধি প্রণয়নের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সারগ্রাহী মূল্যায়নে স্পষ্ট হয় যে, তদন্ত ও প্রতিরক্ষার প্রযুক্তিগত রূপরেখা থাকলেও আদালতকে পুলিশের রিপোর্টের অধীনস্ত করা, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত বিচার পরিচালনা, কর্মকর্তাদের আগাম দায়মুক্তি এবং নির্বাহী বিধির মাধ্যমে ডিক্রিপশন ও নজরদারির অবাধ সুযোগ দেওয়ায় আইনটি একচেটিয়া পুলিশি ও নির্বাহী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে পরিণত হয়েছে— ফলে একটি গণতান্ত্রিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কায়েম করতে হলে তথ্য সংগ্রহ ও ব্লকিংয়ে স্বাধীন বিচারিক পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা, বিচারিক ক্ষমতাকে পুলিশের প্রভাবমুক্ত রাখা এবং মোবাইল কোর্ট ও ঢালাও দায়মুক্তির মতো স্বেচ্ছাচারী বিধানগুলো সম্পূর্ণ বিলোপ করাই আন্তর্জাতিক আইন ও আইনের শাসনের মূল দাবি।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার সংরক্ষণ ও রাষ্ট্রের অপরিহার্য পরিকাঠামোর সুরক্ষা— নাগরিককে সার্বক্ষণিক নজরদারি বা শৃঙ্খলিত করা নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেছিল, তার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল ভিন্নমত দলনকারী ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইন। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে গৃহীত ও প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর সামগ্রিক রূপরেখা প্রমাণ করে যে, কেবল শাসন বদলালেও রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক আইনি চরিত্রের মৌলিক কোনো রূপান্তর ঘটেনি। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার আধুনিক আবরণে সেই পুরোনো দমননীতিরই এক প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বাসন ঘটছে।
আইনের চোখে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে পুলিশের রিপোর্টের অধীনস্ত করা, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত বিচারের সুযোগ রাখা, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’র মতো অস্পষ্ট ধারণায় এক দশক কারাদণ্ডের খাঁড়া ঝুলিয়ে দেওয়া এবং কর্মকর্তাদের আগাম দায়মুক্তি নিশ্চিত করা কেবল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনই নয়, বরং আইনের শাসন ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের ধারণার ওপর চরম কুঠারাঘাত। সাইবার জগতের সত্যিকারের সুরক্ষা কখনোই বাকস্বাধীনতা হরণ, নাগরিকের গোপনীয়তা ধ্বংস এবং মুক্ত সাংবাদিকতাকে অপরাধীকরণের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে না।
অতএব, এই প্রস্তাবিত আইনটিকে কর্তৃত্ববাদী সুর থেকে মুক্ত করে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারবান্ধব করতে হলে ‘স্পিচ অফেন্স’ ও অস্পষ্ট পরিভাষাগুলো সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে; তল্লাশি, জব্দ ও কনটেন্ট ব্লকিংয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচারিক পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করতে হবে; এবং সাইবার এজেন্সিকে নির্বাহী আজ্ঞাবহতার বাইরে এনে একটি নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক নাগরিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। অন্যথায়, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র এই কথিত আইনি বলয় নাগরিকদের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল বন্দিশালায় পরিণত হবে, যা গণ-আকাঙ্ক্ষার সাথে ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী