মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, স্থবির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কৃষক, শ্রমিক, যুবক ও প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি— এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখেই আগামী অর্থবছরের অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর জাতীয় সংসদে সমাপনী আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।” তার ভাষায়, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দলীয় বিভাজনের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা, কৃষক, শ্রমিক, যুবক ও প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার প্রশ্নে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো।”
মানুষের স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই সরকারের প্রথম লক্ষ্য
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়মে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার এবারের বাজেটে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সরাসরি মানুষের ওপর করের চাপ কমানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। বহুল আলোচিত কালো টাকা বৈধ করার সুযোগও পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তকে সরকার জনমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কেন্দ্রবিন্দুতে আস্থা
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের দৃষ্টিতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, ব্যাংক গ্রাহক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস তৈরি না হয়, তাহলে কেবল বাজেট ঘোষণা করেই কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপব্যবস্থা অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। সরকার এসব সমস্যা দূর করে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।”
একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদে নয়; বরং সুশাসন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করে। সে কারণেই অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর বার্তা
গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকট অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সরাসরি আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই অবস্থান বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর জন্য শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, কঠোর বাস্তবায়নও জরুরি।
কৃষক, শ্রমিক, যুবক ও প্রবাসীদের অগ্রাধিকার
সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উৎপাদনমুখী জনগোষ্ঠীকে সামনে আনা। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, কৃষক, শ্রমিক, যুবক এবং প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
বাজেটে কৃষি উৎপাদন, রফতানি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা এবং তরুণদের কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো তরুণ উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক কমিয়ে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং রপ্তানিযোগ্য শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের আশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীলতার চেষ্টা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানান, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার একযোগে কাজ করছে।
এই লক্ষ্যে ৬০টি পণ্যে উৎসে কর কমানো, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
রাজনৈতিক ঐকমত্যের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জুলাই সনদকে পথনির্দেশক ধরে সংবিধান সংশোধনসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সরকার ও বিরোধী দল সংসদের ভেতরে-বাইরে একসঙ্গে কাজ করতে পারে।” তার মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও মানুষের স্বার্থে অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি আরও অঙ্গীকার করেন, বাংলাদেশে আর কখনও ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচারের উত্থান ঘটতে দেওয়া হবে না এবং রাষ্ট্রকে কখনও কোনো পরাশ্রয়ী শক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে দেওয়া হবে না।
বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটে কর ছাড়, বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি ইতিবাচক বার্তা দিলেও প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো না গেলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হবে।
তাদের মতে, মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য কেবল কর কমানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বাজারে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সরকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরেছে। আর সেই রূপরেখার কেন্দ্রে রয়েছে— মানুষের দুর্ভোগ কমানো, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কৃষক, শ্রমিক, যুবক ও প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য টেকসই সুযোগ সৃষ্টি। এখন নজর থাকবে ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা যায়।