জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭’কে ঘিরে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ এটিকে সংস্কারমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ প্রশ্ন তুলছেন— রাজস্ব আহরণ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে। তবে বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত অন্য জায়গায়— এই বাজেট দেশের পিছিয়ে পড়া, নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। প্ল্যাটফর্মটির আহ্বায়ক ও সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রশ্ন তুলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে সুফলের কথা বাজেটে বলা হয়েছে, তা আদৌ দেশের দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে কি না।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি বাজেটের সফলতা কেবল রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে সাধারণ মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, ক্রয়ক্ষমতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কতটা শক্তিশালী হয়েছে তার ওপর। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান উন্নত করতে না পারলে কোনও বাজেটই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না।
প্রবৃদ্ধি আছে, কিন্তু মানুষের জীবনে স্বস্তি কোথায়?
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম নিম্ন হার।
অন্যদিকে মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর, যাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ব্যয়ে চলে যায়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। গত এক বছরে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে বাস্তবে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। অর্থাৎ মানুষ আগের মতোই কাজ করছে, কিন্তু সেই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কিনতে পারছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু বর্তমান ভোগব্যয়কে প্রভাবিত করছে না, বরং পরিবারগুলোর সঞ্চয় ক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় জিডিপির প্রায় ২৬ শতাংশ ছিল, বর্তমানে তা ২১ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে। ফলে অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কর্মসংস্থানের মূল খাতগুলোতে ধীরগতি
বাংলাদেশের অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবিকা নির্ভর করে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), তৈরি পোশাক শিল্প এবং অনানুষ্ঠানিক সেবা খাতের ওপর। কিন্তু বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এসব কর্মসংস্থাননির্ভর খাতের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত নয়।
বিশেষ করে বৃহৎ শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৭৬ শতাংশে। তৈরি পোশাক খাত এখনও দেশের প্রধান রফতানি খাত হলেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, বাজার সংকোচন এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাচ্ছে। কৃষি ও এসএমই খাতেও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ বাড়েনি। ফলে তরুণ, নারী, শিক্ষিত বেকার, ক্ষুদ্র কৃষক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কর্মসংস্থানমুখী খাতগুলোকে শক্তিশালী না করে শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করলেও তার সুফল সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে পৌঁছাবে না।
বৈদেশিক খাতের চাপও পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর
বাজেট বিশ্লেষণে বৈদেশিক খাতকে অন্যতম ঝুঁকির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি আয় প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। অথচ দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। রফতানি কমে গেলে প্রথম ধাক্কা পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর। নতুন নিয়োগ কমে যায়, অতিরিক্ত সময়ের কাজ হ্রাস পায় এবং অনেক ক্ষেত্রে আয়ও কমে যায়।
একইসঙ্গে ডলারের উচ্চ মূল্য ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে— একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে।
ভ্যাটনির্ভর রাজস্ব কাঠামো কতটা ন্যায়সঙ্গত?
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আহরণের বড় অংশ নির্ভর করছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)-এর ওপর। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং অতিরিক্ত রাজস্ব বৃদ্ধির ৪০ শতাংশের বেশি আসবে ভ্যাট থেকে।
সমস্যা হলো, ভ্যাট এমন একটি কর— যা ধনী ও গরিব উভয়কেই একই হারে দিতে হয়। ফলে এটি তুলনামূলকভাবে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে।
সিপিডির মতে, নতুন রাজস্ব আহরণের প্রায় ৫৯ শতাংশই আসবে পরোক্ষ কর থেকে। ফলে করব্যবস্থায় ন্যায়বিচার ও আয়বৈষম্য কমানোর প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কর সংস্কারে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ
তবে বাজেটে কর ব্যবস্থায় কিছু স্বস্তিদায়ক পদক্ষেপও রয়েছে। ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের অনেক মানুষ করের বাইরে থাকবেন। এ ছাড়া চাল, গম, মাছ, ভোজ্যতেল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি ও লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানো হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ক্যানসারের ওষুধ, ডায়ালাইসিস, ওপেন হার্ট সার্জারি এবং উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট কিছু সেবায় কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।
যদি এসব সুবিধার সুফল সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো যায়, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা লাঘব হতে পারে।
নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সুবিধা
বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য করমুক্ত টার্নওভারের সীমা ৭০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে নারী করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য নয় বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতির সুবিধা রাখা হয়েছে, যা ডিজিটাল অর্থনীতি বিকাশে সহায়ক হতে পারে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ২১ ধরনের সহায়ক যন্ত্রপাতি শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ এবং করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির উদ্যোগও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষায় রেকর্ড বরাদ্দ, তবু ঘাটতি রয়ে গেছে
বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ২ দশমিক ১১ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ১৫ দশমিক ৩৯ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
সরকার পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, ডিজিটাল উপকারভোগী ডাটাবেজ, জি-টু-পি পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ কোটির বেশি মানুষ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাতা পাবেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের আলোকে এই বরাদ্দ এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নগর দরিদ্র, বেকার তরুণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।
কল্যাণ রাষ্ট্রের অঙ্গীকার, কিন্তু বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ
বাজেটে ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ গঠনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা ও পুনর্বণ্টনমূলক নীতির ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় সম্মিলিত ব্যয় জিডিপির মাত্র ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এখনও অনেক কম।
এ ছাড়া ধনসম্পদ কর, উত্তরাধিকার কর কিংবা আয়বৈষম্য কমানোর জন্য শক্তিশালী পুনর্বণ্টনমূলক ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। বেকারত্ব ভাতা চালুর মতো উদ্যোগও বাজেটে স্থান পায়নি। একই সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী, আদিবাসী, দলিত, হিজড়া সম্প্রদায় এবং নগর বস্তিবাসীদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর বিষয়েও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেখা যায়নি।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ নিঃসন্দেহে সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তার এবং দরিদ্রবান্ধব কিছু কর ছাড় বাজেটের ইতিবাচক দিক।
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের ধীরগতি, ভ্যাটনির্ভর রাজস্ব কাঠামো এবং সীমিত পুনর্বণ্টনমূলক নীতির কারণে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য প্রত্যাশিত স্বস্তি কতটা আসবে, তা এখনও বড় প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেছে।
সর্বোপরি, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের ভাষায়, একটি বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে কত টাকা ব্যয় করা হলো তা দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কার পাশে দাঁড়ালো, কার ঝুঁকি কমালো এবং কার জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারলো, তার ভিত্তিতেই।