সরকার জুলাই মাসের জন্য এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমিয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করলেও বাজারে তার কোনও প্রভাব এখনও পড়েনি। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা এখনও আগের মতোই বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। ফলে প্রতি মাসে দাম পুনর্নির্ধারণ হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ গ্রাহক।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনও নতুন দামের এলপিজি তাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। আর ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা বলছেন, দাম বাড়ার কোনও আভাস পেলেই বর্ধিত দামে কিনতে হয়। অথচ দাম কমানোর ঘোষণার একদিন পরও সরকারি নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি মিলছে না।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ঘোষণা করে। জুলাই মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫২৮ টাকা, যা আগের মাসে ছিল ১ হাজার ৮৮৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে দাম কমেছে ৩৫৭ টাকা। ১২ কেজির পাশাপাশি অন্যান্য ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দামও কমানো হয়েছে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। শুক্রবার (৩ জুলাই) দুপুরে যশোর সার্কিট হাউসে জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও বাপবিবোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এলপিজি গ্যাসের ৯৮ শতাংশই আমদানি করতে হয়, যা পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল। এতে আমাদের মা-বোনদের সংসার চালাতে কষ্ট করতে হয়েছে। যখনই বৈশ্বিক পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে, তখনই আমরা মূল্য সমন্বয় করেছি। আশা করি, রাতারাতি মূল্যের বড় সমন্বয় হয়েছে। এতে বাংলাদেশের মানুষের সংসার পরিচালনায় স্বস্তি আসবে। যখনই সুযোগ হবে, তখনই ধাপে ধাপে জ্বালানির দাম কমিয়ে স্বস্তিতে আনা হবে।’
প্রতিমন্ত্রী ‘রাতারাতি মূল্যের বড় সমন্বয়ের’ কথা বললেও বাজারে এর প্রভাব তেমন দেখা যায়নি। শুক্রবার রাজধানীর শান্তিনগর, মালিবাগ, কাঠালবাগান ও ধানমন্ডি এলাকার বাজার ঘুরে দেখা যায়, দোকানে নতুন নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে না। এখনও প্রায় সব জায়গায় আগের দামই রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে কোনও কোনও দোকানে পরিবহন ও অন্যান্য খরচের অজুহাতে আরও বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। ১২ কেজির সিলিন্ডারসহ অনেক জায়গায় দাম রাখা হচ্ছে ৩ হাজার টাকা।
মিরপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘খবরে দেখি দাম কমেছে। কিন্তু দোকানে গেলে বলে আগের দামই দিতে হবে। সরকার দাম কমালেও আমাদের তো কোনও লাভ হয় না। আজ শুক্রবার সকালে গ্যাস শেষ হয়ে যায়। আনতে গিয়ে দেখি ১ হাজার ৭৫০ টাকা দাম। জিজ্ঞেস করলাম, কাল না কমালো? বলল, এই দাম পেতে চাইলে আরও কয়েক দিন পরে আসবেন। আমরা আগের দামে কিনেছি। এখন তো লোকসান দিতে পারবো না। সুতরাং নিরুপায় হয়ে সেই বেশি দামেই সিলিন্ডার কিনে আনতে হয়েছে।’
মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানের বাসিন্দা মোহাম্মদ রানা বলেন, ‘যখন বাড়ানোর আঁচ পাওয়া যায়, কয়েক দিন আগে থেকেই দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। অথচ কমানোর সময় একদিন পরও সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।’
মুগদার গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, ‘প্রতি মাসেই দাম কমা-বাড়ার খবর শুনি। কিন্তু আমরা কখনো ঘোষিত দামে সিলিন্ডার কিনতে পারি না। বাজারে কোনও নজরদারি নেই বলেই এমনটা হচ্ছে। যদি আজই বাজারে গিয়ে মনিটরিং করা হতো, তাহলে হয়তো ভয়ে হলেও দাম কমাতো। সেই আগের দাম নিতে পারতো না।’
কাঠালবাগানের তাকওয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক বলেন, ‘নতুন দামে বিক্রি করতে হলে আগে কোম্পানি থেকে ওই দামে সিলিন্ডার পেতে হবে। আমাদের কাছে এখনও আগের দামে কেনা স্টক রয়েছে। তাই সঙ্গে সঙ্গে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৫০ টাকাই নিতে হবে। কয়েক দিন পরে এলে হয়তো কম দামে পাবেন।’
পশ্চিম ধানমন্ডির জাকির এন্টারপ্রাইজও জানায়, সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেই সব জায়গায় তা কার্যকর হয় না। পরিবহন ব্যয়, ডেলিভারি খরচ ও অন্যান্য ব্যয়ের কারণে অনেক সময় ওই দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। ‘আজ সিলিন্ডারসহ নিলে ৩ হাজার টাকা পড়বে। শুধু গ্যাস নিলে ১ হাজার ৭৫০ টাকা।’
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম নির্ধারণ ও ঘোষণা করে আসছে। তবে কখনোই কোনও এলাকায় ঘোষিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। কার্যকর বাজার তদারকির অভাবে নির্ধারিত দাম কাগজে-কলমেই থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে দাম কমানোর ঘোষণা এলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘গত দুই মাসে এলপিজির যে দাম আমরা নির্ধারণ করেছিলাম, তার চেয়েও কম দামে এলপিজি বিক্রি হয়েছে। এবার দাম কিছুটা কমানো হয়েছে। এটা আমরা নিয়মিতভাবেই মনিটরিং করি। রবিবার অফিস খুললে আশা করি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আমরা আগেও বিষয়টি মনিটরিং করতে জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছিলাম। আবার চিঠি দেবো। এদিকে ভোক্তা অধিকার বিভিন্ন পণ্যের ওপর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে থাকে। মাঝে মাঝে তারা বিপদেও পড়ে, কিন্তু তারপরও অভিযান অব্যাহত আছে।’