জাহাজের প্রিমিয়াম দ্বিগুণ, এলপিজি সরবরাহে টান

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে জাহাজের প্রিমিয়াম এক লাফে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। বাড়তি ব্যয়ে পণ্য আমদানিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন আমদানিকারকদের একটি অংশ। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের বিইআরসি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১৫০ টাকায়। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি সিলিন্ডারে ভোক্তাকে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৫৬৫ টাকা।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, পরিবেশকদের কাছে চাহিদাপত্র পাঠিয়েও আগের তুলনায় কম পরিমাণ এলপিজি পাচ্ছেন তারা। ফলে সরবরাহ কমার পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে দামও বেড়েছে। একজন খুচরা বিক্রেতা জানান, আগে ৫০০ সিলিন্ডারের চাহিদা পাঠালে পুরোটা পাওয়া গেলেও এখন দেওয়া হচ্ছে ২৫০টি। আগে চাহিদাপত্র পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ পাওয়া গেলেও এখন অন্তত সাত দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

আমদানিকারকরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) জানিয়েছেন, এলপিজি পরিবহনে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে টনপ্রতি এ খরচ ৩০০ ডলারে পৌঁছেছে। অথচ গত মাসে বিইআরসি এ খাতে ১৬০ ডলার নির্ধারণ করেছিল। আমদানিকারকদের দাবি, গত মাসে টনপ্রতি এ খরচ ১২০ থেকে ১৬০ ডলারের মধ্যে ছিল। এখন তা বেড়ে যাওয়ায় কেউ কেউ এলপিজি আমদানি থেকে বিরত থাকছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাড়তি ব্যয়ে এলপিজি আমদানি করলেও সেই অতিরিক্ত খরচ তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ নেই। বিইআরসি প্রিমিয়ামের পরিমাণ না বাড়ানো পর্যন্ত আমদানিকারকরা বাড়তি খরচ বিক্রয়মূল্যে সমন্বয় করতে পারেন না। সেপ্টেম্বরের জন্য কমিশন নির্ধারিত মূল্যে টনপ্রতি ১৬০ ডলার জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম ধরা হয়েছে। ফলে এর চেয়ে বেশি খরচে এলপিজি আমদানি করলে সেই ব্যয় সমন্বয়ের নিশ্চয়তা থাকছে না। এ কারণে নতুন চালান আনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন আমদানিকারকদের কেউ কেউ।

বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে খুচরা বাজারে আগে থেকেই এর চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে। গত দুই মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে ২ হাজার ১৫০ টাকা হয়েছে।

এমনিতেই গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে ভুগছেন সাধারণ মানুষ। পাইপলাইনের গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহকদের একটি অংশ রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভর করছেন। গ্যাসের চাপ কম থাকা ও সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবেও এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি এলপিজির চাহিদাও বাড়ছে। এর মধ্যে দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা শারমিন মুস্তফা জানান, বৃহস্পতিবার তিনি ২ হাজার ১৫০ টাকায় একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন। অথচ গত দুই মাসে পরপর দুইবার তিনি ১ হাজার ৮০০ টাকা করে দিয়েছেন।

রাজধানীর হাতিরপুলের একজন এলপিজি ডিলার জানান, সরবরাহ কমে যাওয়ায় তার দোকানে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার রাখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না বলে তাদের জানানো হচ্ছে।

সেপ্টেম্বরের জন্য সৌদি আরামকোর ঘোষিত দরে প্রোপেনের মূল্য ছিল টনপ্রতি ৬২৫ ডলার এবং বিউটেন ৬৬০ ডলার। এর সঙ্গে টনপ্রতি ১৬০ ডলার জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম যোগ করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। দেশে ব্যবহৃত এলপিজিতে প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫।

তবে এলপিজি সরবরাহে সংকটের কথা মানতে নারাজ বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, প্রতি মাসে দেশে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টন এলপিজি আসে। অথচ আগস্টে এসেছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত এসেছে ১ লাখ ১৯ হাজার টন। ফলে সংকটের কারণ তিনি দেখছেন না।

তিনি বলেন, আমদানিকারকরা প্রিমিয়াম বেড়ে ৩০০ ডলার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে তার মতে, এটি বাড়তি চাহিদার কারণে হতে পারে। সৌদি আরব থেকে জাপান পর্যন্ত জাহাজ ভাড়া বেড়েছে—এমন তথ্য পাওয়া গেলেও তা এতটা বেড়েছে বলে মনে করছেন না তিনি।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী আজম জে চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশে এলপিজির চাহিদা এখন আরও বেড়েছে। আগের চাহিদাই পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হতো না। এখন যেসব জাহাজে এলপিজি আসছে, সেগুলো বাড়তি দামে আনতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বেশি দামে এলপিজি এনে কম দামে লোকসানে বিক্রি করা কোনও ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়। আগে থেকেই চ্যালেঞ্জ ছিল, তবে বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।