‘ভাই! সৌদি যাইতাছি। দোয়া কইরেন।‘ চায়ের দোকানে এক তরুণকে এই কথা বলতে শোনা গেলো। তার চোখে-মুখে নতুন জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই তরুণটি কি জানেন তিনি সৌদি আরবে গিয়ে কী কাজ করবেন? ভাষা জানেন? কোনও দক্ষতা আছে? বিদেশ মানেই কি শুধু রেমিট্যান্সের পেছনে ছুটে যাওয়া?
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ কাজের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, তাদের অধিকাংশই যাচ্ছেন অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত অবস্থায়। বিদেশ মানেই উন্নত জীবন নয়, এই বাস্তবতাটা তারা দেশে থেকে অনুধাবন করতে পারেন না। ফলে বিদেশে গিয়েও তারা দিনশেষে নির্মাণ শ্রমিক, হাউজকিপার, ক্লিনার, গুদাম সহকারী কিংবা কৃষিকাজের মতো সর্বনিম্ন বেতনের কাজের মধ্যে আটকে থাকেন।
যেকোনও একটি দেশের নাম ধরুন। যেমন, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত, সর্বত্রই দেখা যাবে হাজার হাজার বাংলাদেশি রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে দিন পার করছেন। অথচ পাশের দেশ ফিলিপাইন বা শ্রীলংকার অনেক কর্মী একই দেশে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেতন পায়, কারণ তারা দক্ষ।
আপনি যে দেশে যাবেন, যদি সেই দেশের ভাষাই না বোঝেন, তাহলে সেখানে কীভাবে কাজ শিখবেন, কীভাবে কথা বলবেন বা কীভাবে অধিকার আদায় করবেন?
বহু বাংলাদেশি শ্রমিকই মাসের পর মাস শুধু ‘ইয়ালা-ইয়ালা’ বা ‘মাফি-মাফি’ শব্দেই কাজ সারেন। তারা নিজে থেকে কোনও সমস্যা বোঝাতে পারেন না, বোঝাতে পারলেও সমাধান চান না। কারণ একটাই, ভাষার ভয়।
এমনকি, জরুরি সময়ে চিকিৎসকের সাথে কথা বলা, পুলিশকে কিছু বোঝানো, ব্যাংকে নিজে কাজ করা বা বাসা ভাড়া নেওয়ার মতো মৌলিক কাজেও তাদের অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয়। এক কথায়, প্রবাসে তাদের অবস্থান হয়ে দাঁড়ায় নীরব ও নিরুপায়।
বিদেশে যাওয়ার আগে যদি অন্তত ছয় মাসের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ নেওয়া হতো, যেমন- ইলেকট্রিক কাজ, প্লাম্বিং, ওয়ার্ডপ্রেস বা ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, পেইন্টিং, এসি মেরামত, হেয়ার কাটিং বা কুকিং ইত্যাদি তাহলে বিদেশের শ্রমবাজারে তারা নিজেদের ‘দক্ষ কর্মী’ হিসেবে পরিচিত করতে পারতো।
এছাড়া, যারা কোরিয়ায় যাচ্ছেন তাদের জন্য কোরিয়ান ভাষার পরীক্ষা (EPS-TOPIK) অপরিহার্য। একইভাবে জাপানে যেতে হলে JLPT, এবং ইউরোপে যেতে হলে ইংরেজি বা সে দেশের ভাষার ভিত্তিমূলক দক্ষতা প্রয়োজন। কিন্তু বহু মানুষ এ বিষয়গুলোতে অবহেলা করে ‘দালাল’ বা ‘কথিত এজেন্সি’র ওপর ভরসা করে বিদেশ পাড়ি দেন।
দেশে থেকে কোনও প্রস্তুতি না নিয়ে যখন প্রবাসে পাড়ি দেওয়া হয়, তখন একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে ভাগ্য। এই ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গিয়ে তারা হাজার হাজার টাকা দালালকে দিয়ে দেন, ভুয়া প্রশিক্ষণ সেন্টারের সার্টিফিকেট কেনেন।
ফলাফল কী? বিদেশে গিয়ে কাজ মেলে না, কিংবা মেলে অমানবিক পরিশ্রমের বিনিময়ে সামান্য আয়। অথচ এই পুরো প্রক্রিয়ার আগে তারা যদি একটি ভাষা শেখার কোর্স, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কিংবা বৃত্তিমূলক শিক্ষার কোনও ডিপ্লোমা করে নিতেন, তাহলে ভালো বেতনে চাকরি জোগাড় হয়ে যেতো। আবার জীবিকার অনিশ্চয়তাও এড়ানো যেতো।
একজন অদক্ষ প্রবাসী শ্রমিকের জীবন অত্যন্ত কষ্টকর। ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ, নির্দিষ্ট কোনও ছুটি নেই, খারাপ খাবার, খারাপ আবাসন, চিকিৎসা সুবিধার অভাব ইত্যাদি সব মিলিয়ে জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। অনেক সময় মাসের পর মাস বেতনও পান না। কেউ দাবি করলে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়। এর চেয়েও বড় সমস্যা, অদক্ষ প্রবাসীদের এই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দেশে ফেরার পর আর কাজে লাগে না। কারণ দেশে ফিরে তিনি একই রকম অদক্ষ অবস্থায় আবারও কর্মহীন হয়ে যান। এখন মূল বিষয় হচ্ছে, সমাধান কোথায়? সমাধান অবশ্যই আছে, যদি আমরা ঠিকঠাক মেনে চলি।
১. যে কেউ বিদেশ যেতে চাইলে তাকে অন্তত একটি কারিগরি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। অনেকেই প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেন কিন্তু তিনি সেই বিষয়ে কিছুই জানেন না। এটা যেন না হয়। প্রয়োজনে দক্ষতা অর্জনের প্রমাণ দিতে হবে।
২. দেশের প্রতিটি জেলা শহরে ভাষা শেখার উপযোগী আধুনিক ভাষাকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। বিদেশে যাওয়ার আগে অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ের আরবি, ইংরেজি, কোরিয়ান, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ বা জাপানি ভাষা শেখা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বিদেশগামীদের পুরো প্রক্রিয়া হতে হবে সরকারি তত্ত্বাবধানে, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর। দালালের দাপট কমানোর জনসচেতনতা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার সর্বত্র প্রয়োজন।
৪. আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ একচেটিয়া মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে এখনই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার শ্রমবাজারকে অনুসন্ধান করা জরুরি। মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়া, বেলারুশ, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ড, ব্রাজিল, চিলি এমন আরও অনেক দেশ এখন দক্ষ ও আধাদক্ষ কর্মীর সংকটে ভুগছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে এই বাজারগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিক রফতানির নতুন সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
৫. বিশ্ব শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে কী ধরনের দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বেশি, তার তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ দরকার। সেই অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের কোর্স চালু করা যেতে পারে।
বিদেশে যাওয়া মানে শুধু টাকা রোজগারের সুযোগ নয়। এটা নিজের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের সঠিক প্রস্তুতি না থাকলে, জীবনের অপচয়ও হতে পারে।
যারা বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, বিদেশে যাবার আগে নিজেকে প্রস্তুত করুন। দক্ষ হন, ভাষা শিখুন, প্রশিক্ষণ নিন। তাহলেই বিদেশ আপনার জন্য হয়ে উঠবে উন্নয়নের পথ।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।