বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হলো হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগরে প্রবেশের এই সরু জলপথটি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশও এই রুট দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে তা শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে গভীর ও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এই প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
প্রথমত, বিশ্বব্যাপী জ্বালানির সরবরাহ সংকট দেখা দেবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলো তাদের তেল ও গ্যাস রফতানি করে। দীর্ঘসময় ধরে এই পথ বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ হঠাৎ করেই কমে যাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। অতীতে ছোটখাটো উত্তেজনাতেও তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বন্ধের ক্ষেত্রে তেলের দাম দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাবে। জ্বালানি প্রতিটি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে খাদ্য, শিল্পপণ্য, নির্মাণসামগ্রীসহ সবকিছুর দাম বাড়ে। এতে করে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হয়। উন্নত দেশগুলো সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা আবার বিনিয়োগ কমিয়ে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ব্যাহত হবে। আধুনিক অর্থনীতি আন্তঃনির্ভরশীল সরবরাহ ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে আছে। জ্বালানি সংকটের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে, শিপিং সময় বাড়বে এবং অনেক ক্ষেত্রে পণ্য পরিবহন বিলম্বিত হবে। এর ফলে শিল্প উৎপাদন কমে যেতে পারে, বিশেষ করে যেসব খাত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যেমন- ইস্পাত, সার, কেমিক্যাল, এবং পরিবহন শিল্প।
চতুর্থত, শেয়ারবাজার ও আর্থিক খাতে অস্থিরতা দেখা দেবে। তেলের দাম বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে দরপতন হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারে, যেমন- স্বর্ণ বা সরকারি বন্ড।
এখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটির প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রথমত, জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ তার অধিকাংশ জ্বালানি, বিশেষ করে তেল ও এলএনজি আমদানি করে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে সরকারের আমদানি ব্যয় বাড়বে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ ফার্নেস অয়েল, ডিজেল এবং এলএনজি’র ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে করে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে। তেলের দাম বাড়লে সড়ক, নৌ ও বিমান পরিবহন খরচ বাড়ে। এর ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যা সরাসরি ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চতুর্থত, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব খাদ্যসহ সব পণ্যের ওপর পড়ে। বাংলাদেশে আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে করে সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে।
পঞ্চমত, রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাতে কাঁচামাল আমদানি এবং পণ্য রফতানির জন্য আন্তর্জাতিক পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। পরিবহন খরচ ও সময় বৃদ্ধি পেলে রফতানি প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হ্রাস পেতে পারে।
ষষ্ঠত, প্রবাসী আয়ের উপর প্রভাব পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে তাদের কর্মসংস্থান ও আয়ের উপর প্রভাব পড়তে পারে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে।
সপ্তমত, আর্থিক খাতে চাপ সৃষ্টি হবে। মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। সুদের হার বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বিনিয়োগ কমিয়ে দেবে। এতে করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য কিছু নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। তৃতীয়ত, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে সংকটকালে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। চতুর্থত, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। রফতানি বহুমুখীকরণ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে রিজার্ভ শক্তিশালী করা জরুরি। পঞ্চমত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে নিম্ন আয়ের জনগণকে রক্ষা করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সূচনা করতে পারে। এটি শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বরং উৎপাদন, বাণিজ্য, আর্থিক খাত এবং ভূরাজনীতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায়, একটি দূরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক সংকটও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক




