বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চোক পয়েন্টগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। চোক পয়েন্ট হচ্ছে সাধারণত এমন জলপথ বা স্থলপথ, যেটি দিয়ে পণ্য বা যানবাহন যাতায়াত করে এবং যার কোনও সহজ বিকল্প নেই। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্ববাজারে রফতানি হয়, তার বড় অংশই এই সরু জলপথ দিয়ে অতিক্রম করে। প্রণালিটি একদিকে ওমান এবং অপরদিকে ইরানের মাঝখানে অবস্থিত। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বিগত কয়েকদিনের ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তথ্য মতে, নৌপথে বহন করা বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩১ শতাংশ এবং সিএনজির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়।
বাংলাদেশ সরাসরি এই প্রণালির তীরবর্তী না হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে হরমুজ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে তার অভিঘাত আমাদের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়বে, তা প্রায় অনিবার্য।
বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল এবং এলএনজি—সবকিছুর ক্ষেত্রেই আমদানি নির্ভরতা রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী। এদের বেশিরভাগ রফতানি পথই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
যদি দীর্ঘমেয়াদে প্রণালিটি অচল হয়ে পড়ে, তবে প্রথম ধাক্কা আসবে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাবে। মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদনে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে। সরকার যদি ভর্তুকি বাড়ায়, বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে— আর যদি ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হবে।
তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি খাতেই প্রভাব পড়ে না, এটি অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। কৃষি খাতে সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের ব্যয় বাড়ে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট হলে, তা সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে, যা টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানিনির্ভর অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে। ফলে এক ধরনের ‘দ্বৈত চাপ’ তৈরি হবে। একদিকে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি, অপরদিকে বিনিময় হারজনিত চাপ।
উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে এসব দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
তেলের দাম বৃদ্ধি প্রথমদিকে এসব দেশের রাজস্ব বাড়াতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সামরিক উত্তেজনা, বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা ও বাণিজ্য বিঘ্নিত হলে শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। সে ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প। এই খাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা রফতানি আদেশ পূরণে সমস্যা তৈরি করবে।
অপরদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপ ও আমেরিকার ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতায়ও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব এলে পোশাকের মতো পণ্যের চাহিদা কমে যায়। ফলে বাংলাদেশের রফতানি আয় হ্রাসের ঝুঁকিও তৈরি হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বৈশ্বিক এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প টেকসই ব্যবস্থা কী হতে পারে?
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হবে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎস যেমন আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা লাতিন আমেরিকা থেকে তেল ও এলএনজি আমদানির চুক্তি বাড়ানো যেতে পারে। যদিও পরিবহন ব্যয় কিছুটা বেশি হতে পারে, তবু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এটি কার্যকর।
দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো জরুরি। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ালে আমদানিনির্ভরতা কমবে।
অনেক দেশ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ গড়ে তোলে, যাতে বৈশ্বিক সংকটের সময় কয়েক মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। স্বল্প মেয়াদে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা গেলে আকস্মিক সরবরাহ ব্যাহত হলেও তাৎক্ষণিক সংকট এড়ানো সম্ভব।
শুধু সরবরাহ বাড়ানো নয়, চাহিদা ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যুৎ অপচয় কমাতে স্মার্ট গ্রিড ও আধুনিক বিতরণ ব্যবস্থা জরুরি।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ, শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় পথ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি-রফতানি ও গ্যাস পাইপলাইন সংযোগ বাড়ানো গেলে বহুমাত্রিক সরবরাহ নিশ্চিত হবে। এছাড়া, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে কোনো একক অঞ্চলের অস্থিরতা আমাদের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব না ফেলে।
রফতানি বহুমুখীকরণ, প্রবাসী আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম করে। একইসঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী রাখতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে নিম্নআয়ের মানুষ বিপদে না পড়ে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি প্রবাহের এক গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। এটি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকেও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে গভীর সংকটে পড়তে পারে। তবে সংকটের আশঙ্কাই হতে পারে নীতি সংস্কারের সুযোগ। জ্বালানি বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, কৌশলগত মজুত এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ইত্যাদি পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা সহজ হবে। দূরদর্শী পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই অনিশ্চিত বিশ্বেও স্থিতিশীল অগ্রযাত্রা সম্ভব।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক




