কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত, মাঠে ঘাম ঝরানো কৃষক কি পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন? উত্তরটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক। আমরা যখন বাজারে গিয়ে এক কেজি বেগুনের দাম ১০০ টাকা দেখি, তখন হয়তো একই সময়ে সেই বেগুন কৃষক মাঠ পর্যায়ে বিক্রি করছেন মাত্র ২০ টাকায়। মাঝখানের এই বিশাল ব্যবধান হয়ে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী বা তথাকথিত সিন্ডিকেটের কারণে।
এ জন্য বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট উৎপাদনে নয়, বিপণনে। কৃষক মাঠে ফসল ফলান, কিন্তু সেই ফসলের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা তার হাতে থাকে না। উৎপাদনের শুরু থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত দীর্ঘ যে সাপ্লাই চেইন, সেখানে কৃষক রয়েছে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়। আড়তদার, পাইকার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার স্তর পেরিয়ে পণ্য যখন ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তখন দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়; কিন্তু সেই বাড়তি দামের খুব সামান্য অংশই কৃষকের ভাগ্যে জোটে। এই বাস্তবতায় ‘কৃষক থেকে ভোক্তা: সরাসরি বিপণন’ শুধু একটি বিকল্প ব্যবস্থা নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবি।
বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের বাজার ঐতিহাসিকভাবে মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভর। পরিবহন, সংরক্ষণ, বিতরণ ও বাজার সংযোগে তাদের বিশাল প্রভাব রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়, যখন এই মধ্যস্বত্বভোগীরা শক্তিশালী সিন্ডিকেটে রূপ নেয় এবং বাজার দর নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। তখন কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন এবং ভোক্তা বাধ্য হন উচ্চমূল্যে পণ্য কিনতে। অর্থাৎ একই ব্যবস্থায় উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, লাভবান হয় কেবল মধ্যবর্তী একটি শ্রেণি।
এই প্রেক্ষাপটে সরাসরি বিপণন ব্যবস্থার অর্থনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি বিপণন বলতে বোঝায়, কৃষক যেন নিজের উৎপাদিত পণ্য কোনও অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্তর ছাড়াই সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারেন। এটি হতে পারে ফার্মারস মার্কেট, সমবায়ভিত্তিক বিক্রি, চুক্তিভিত্তিক কৃষি কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। এই ব্যবস্থায় মূল্য শৃঙ্খল সংক্ষিপ্ত হয়, লেনদেন খরচ কমে এবং কৃষকের আয়ের অংশ বৃদ্ধি পায়।
আমাদের প্রথাগত কৃষি বিপণন ব্যবস্থায় একটি পণ্য ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে কমপক্ষে ৪ থেকে ৬টি হাত বদল হয়। ফড়িয়া, ব্যাপারী, আড়তদার, পাইকারি বিক্রেতা এবং সবশেষে খুচরা বিক্রেতা। প্রতিটি স্তরে লভ্যাংশ যোগ হতে হতে পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়। অথচ কৃষক তার উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খান। সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা চালু হলে এই স্তরের সংখ্যা কমে আসবে। তথ্যমতে, সাপ্লাই চেইন থেকে অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দিতে পারলে কৃষকের আয় ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব এবং ভোক্তার খরচ ১৫-২০ শতাংশ কমানো সম্ভব। এর অর্থ, একই উৎপাদনে কৃষকের আয় দ্বিগুণের কাছাকাছি হতে পারে, যা দারিদ্র্য হ্রাস ও গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখবে। ভোক্তার দিক থেকেও সরাসরি বিপণন লাভজনক। মধ্যস্বত্বভোগীর অতিরিক্ত মুনাফা বাদ পড়ায় পণ্যের দাম তুলনামূলক কম থাকে। পাশাপাশি পণ্যের গুণগত মান ও সতেজতা নিশ্চিত করা সহজ হয়। শহরাঞ্চলে নিরাপদ খাদ্য ও ন্যায্যমূল্যের যে চাহিদা বাড়ছে, সরাসরি বিপণন সেই চাহিদার কার্যকর জবাব দিতে পারে।
বিদেশের উন্নত শহরগুলোতে ‘ফার্মারস মার্কেট’ অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোতেও সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বা নির্দিষ্ট স্থানে শুধু কৃষকদের জন্য বসার সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। যেখানে কোনও ইজারা থাকবে না। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে দরদাম করার সুযোগ পাবেন। এটি কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, বরং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে একটি সামাজিক আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে। ভোক্তা জানবেন তিনি কার উৎপাদিত ফসল খাচ্ছেন, আর কৃষক জানবেন তার ফসলের গুণমান নিয়ে ভোক্তার প্রতিক্রিয়া কী।
বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে বড় সংকট হলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেওয়া। সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা হবে স্বচ্ছ। গুদামজাত করে দাম বাড়ানোর সুযোগ কমে যাবে। যখন কৃষক সরাসরি বাজারে প্রবেশ করবেন, তখন সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাজার ব্যবস্থা অনেকটা মুক্ত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া, সমবায়ভিত্তিক সরাসরি বিপণন কৃষকদের জন্য কার্যকর মডেল হতে পারে। একাধিক কৃষক একত্রিত হয়ে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন করলে পরিসরগত সুবিধা বা ইকোনমিস অব স্কেল তৈরি হয়। এতে পরিবহন খরচ কমে, দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা আসে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে সমবায় ব্যবস্থার ওপর কৃষকদের আস্থা কম। অতীতের দুর্নীতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এই অনাস্থার প্রধান কারণ। এই খাতে নতুন করে কাজ করা প্রয়োজন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি সরাসরি বিপণনের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে কৃষক এখন বাজারদর জানতে পারেন, অর্ডার নিতে পারেন এবং সরাসরি বিক্রি করতে পারেন। কিছু বেসরকারি উদ্যোগ ইতোমধ্যে এই পথে হাঁটছে। কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তখনই সফল হবে, যখন এর সঙ্গে নির্ভরযোগ্য লজিস্টিকস, কোল্ডস্টোরেজ এবং পেমেন্ট সিস্টেম যুক্ত হবে। নইলে এটি কেবল মধ্যস্বত্বভোগীর জায়গায় নতুন এক ডিজিটাল মধ্যস্বত্বভোগী তৈরি করবে।
সরকারের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি বিপণন কোনও স্বাভাবিক বাজার প্রক্রিয়ায় একদিনে গড়ে ওঠে না। এর জন্য নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। কৃষক বাজারের জন্য শহরে নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ, পরিবহন ও সংরক্ষণ সুবিধায় ভর্তুকি, সমবায় ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা ইত্যাদি পদক্ষেপ ছাড়া সরাসরি বিপণন টেকসই হবে না।
বাজার ব্যবস্থায় এমন একটি ভারসাম্য দরকার, যেখানে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, ভোক্তা সাশ্রয়ী দামে পণ্য পাবেন এবং বাজার ব্যবস্থাও কার্যকর থাকবে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে এই বিপণন সংস্কারের ওপর। উৎপাদন বাড়িয়ে, উচ্চ ফলনশীল জাত এনে বা ভর্তুকি দিয়ে কৃষকের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না, যদি তিনি তার উৎপাদনের ন্যায্য দাম না পান। সরাসরি বিপণন সেই কাঠামোগত অসাম্য ভাঙার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
কৃষক ন্যায্যমূল্য পেলে গ্রামীণ আয় বাড়বে, অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই ‘কৃষক থেকে ভোক্তা: সরাসরি বিপণন’ এই বিষয়টিকে কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং কৃষি অর্থনীতির মূলধারায় আনা প্রয়োজন। সরাসরি বিপণন এখন সময়ের দাবি। আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষক যদি তার ফসলের ন্যায্যমূল্য না পায়, তবে আগামী প্রজন্ম কৃষি পেশায় বিমুখ হবে, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। সরাসরি বিপণনের অর্থনীতি যদি আমরা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে একদিকে যেমন কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও সহনীয় পর্যায়ে আসবে।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।