গত কয়েক দিনের পত্রিকার কিছু শিরোনাম আমাদের মনে ভীষণ ভয়ের উদ্রেক করেছে। কয়েকটা উল্লেখ করি –
‘নির্বাচনের আগে অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ছে’;
‘সংসদ নির্বাচন- হলফনামার তথ্য: অস্ত্রের মালিক ১৫৩ প্রার্থী’;
‘গুলি হত্যা অশনি সংকেত’;
‘প্রতিদিন সারা দেশে গড়ে ১১ খুন- খুনের পর খুন’;
‘ভোটের আগে চোরাগোপ্তা হামলা, গুলি, অবৈধ অস্ত্র নিয়ে ভয়’;
‘নির্বাচনে মাথাব্যথা পুলিশের লুণ্ঠিত ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র’।
আমাদের প্রশ্ন– অবৈধ অস্ত্র কি আগে ছিল না? অবশ্যই ছিল।
নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা সত্য। কিন্তু সেটি যে শুধু ভোটের প্রচারকালীন সময় বা দিনকে ঘিরে সীমাবদ্ধ তা আমরা মনে করি না। অবৈধ ও লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে পড়া, প্রকাশ্যে গুলি, টার্গেট কিলিং, মব সন্ত্রাস- এসব মিলিয়ে যে চিত্র আমাদের সামনে উঠে এসেছে, তা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে এই অস্ত্রের ব্যবহার নির্বাচন শেষ হলেও আমাদের নিরাপত্তার জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী হুমকি হয়ে থাকবে।
প্রশ্নটি তাই শুধু ‘নির্বাচন নিরাপদ হবে কী না’ নয়; প্রশ্নটি আরও গভীরে। এই অস্ত্রগুলো নির্বাচনের পর সমাজে কীভাবে ব্যবহৃত হবে? এগুলো কাদের হাতে থাকবে? রাষ্ট্র কি আদৌ সেগুলো উদ্ধার করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে?
পত্রিকার প্রতিবেদনগুলো পড়লে বোঝা যায়, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ও সরকার পতনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। সরকারি হিসাবেই বলা হয়েছে, এখনও দেড় হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গুলি উদ্ধার করা যায়নি। আমাদের কাছে মনে হয়, এগুলো সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড, সন্ত্রাস, ভয়ভীতি ও অপরাধের অগাধ রসদ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই এগুলোর প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই।
নির্বাচনের আগে অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ার একটি বড় কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। তবে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের অনেকগুলোই চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। তার অর্থ হচ্ছে, অস্ত্রের ব্যবহার রাজনীতির বাইরেও একটি শক্তিশালী অপরাধ-অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। এই অর্থনীতি নির্বাচন শেষ হলেও শেষ হবে না। বরং ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের পর নতুন করে এলাকা দখল, হিসাব-নিকাশ মেটানো ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কাই বেশি বলে মনে হয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, অনেক দাগি অপরাধী জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়েছে, যারা কারাগার থেকে পালিয়েছে তাদের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। পত্রিকাগুলোতে বলা হচ্ছে, এখনও ৭১০ জন বন্দি পলাতক রয়েছে, যাদের মধ্যে হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিও আছে। এই মানুষগুলো যখন অবৈধ অস্ত্র হাতের কাছে পাবে, তখন নির্বাচনের পর সাধারণ মানুষের জীবন যে নিরাপদ হবে- এমন চিন্তা মনে আসার কোনও কারণ নেই। তখন আর রাজনৈতিক ব্যানার প্রয়োজন হবে না; দরকার হবে শুধু আধিপত্য, ভয় এবং অর্থের।
নির্বাচনের আগে অস্ত্র জমা দিতে বলা হলেও মনে রাখতে হবে যে ১৫৩ জন প্রার্থীর কাছে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আছে; এবং সেটাই দুশ্চিন্তার আরেক কারণ। প্রার্থীরা বলেছেন, এগুলো নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- যখন প্রার্থীরাও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে এতটা শঙ্কিত, তখন সাধারণ ভোটার বা সাধারণ নাগরিক কীভাবে নিরাপদ বোধ করবেন? নির্বাচন শেষে এই অস্ত্রগুলো তো ব্যক্তির কাছেই রয়ে যাবে।
প্রতিবেদনগুলোতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে এসেছে। বিদেশে বসে ঢাকার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা, স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলা এবং আধিপত্যের হানাহানি চালিয়ে যাওয়া আমাদেরকে ইঙ্গিত দেয় যে অবৈধ অস্ত্র কেবল রাজনৈতিক সহিংসতার হাতিয়ার নয়, এটি একটি সুসংগঠিত অপরাধ কাঠামোর অংশ। এরা নির্বাচনকে ব্যবহার করে বটে, কিন্তু নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে ভোট শেষ হলেও এই অস্ত্রগুলো থাকবে, ব্যবহার হবে, আর তার ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষ।
আরও একটি দিক গভীরভাবে ভাবার মতো; তা হচ্ছে মব সন্ত্রাস। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম অবমাননা, সড়ক দুর্ঘটনা বা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মবের হাতে মানুষ খুন হচ্ছে। এখানে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার সব সময় না হলেও, সারা দেশে অস্ত্রের উপস্থিতি ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ এই সহিংস মানসিকতাকে সাহস জোগাচ্ছে। মানুষেরা যখন দেখে প্রকাশ্যে গুলি করেও অপরাধীরা ধরা পড়ে না, তখন আইনের প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধা আর থাকে না। প্রায় সবকিছুই ভেঙে পড়ে। এই ভাঙন নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আরও গভীর হতে পারে।
অপারেশন ডেভিল হান্টের মতো বিশেষ অভিযান চললেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে এগুলো কি মূল সমস্যার সমাধান করছে, নাকি কেবল সাময়িক একটু চাপ সৃষ্টি করছে? প্রতিবেদনগুলোতে বলা হচ্ছে যে গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও প্রত্যাশার তুলনায় কম। পুরস্কার ঘোষণার পরও খুব অল্প অস্ত্র উদ্ধার হওয়া এই প্রমাণ করে যে অবৈধ অস্ত্রের বাজার অনেক গভীরে প্রোথিত। নির্বাচন শেষ হলে যদি এই অভিযানগুলো শিথিল হয়, তবে অস্ত্রধারীরা স্বাভাবিকভাবেই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।
নির্বাচনের পর ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সময় সাধারণত সহিংসতা কমে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যায়। কারণ তখন হিসাব মেটানো, প্রতিশোধ নেওয়া এবং নতুন বাস্তবতায় নিজেদের জায়গা পাকা করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। হাতে যদি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকে, তবে সেই প্রতিযোগিতা রক্তক্ষয়ী হয়ে যাবে। এ অবস্থায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যারা রাজনীতি, আন্ডারওয়ার্ল্ড বা ক্ষমতার খেলায় জড়িত নয় তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সরকারের ওপর আস্থার সংকট। খবরের কাগজগুলোতে সাধারণ মানুষের ভয়, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনাস্থার কথা বেশ অনেকবার উঠে এসেছে। মানুষ প্রশ্ন করছে, দিন-দুপুরে রাজধানী নিরাপদ না হলে তারা যাবে কোথায়? নির্বাচন শেষে যদি এই আস্থা ফেরানো না যায়, তবে অবৈধ অস্ত্র শুধু শারীরিক নিরাপত্তার হুমকি নয়, সমাজ ও নাগরিক মনোবলের ওপরও আঘাত হানবে।
এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে গেলে শুধু নির্বাচনের আগে নয়, নির্বাচনের পরও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে ভাবার প্রয়োজন। অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অভিযান, সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আর্থিক ও সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার- এসব ছাড়া অস্ত্রের সন্ত্রাস দূর হবে না। নির্বাচন শেষ হলেও অস্ত্রের তাণ্ডব চলতেই থাকবে এবং তার মূল্য দেবে সাধারণ মানুষ।
সব কিছু মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে অবৈধ অস্ত্রের এই অনুপ্রবেশ কোনও সাময়িক সমস্যা নয়। এটি একটি গভীর নিরাপত্তা সংকট, যা নির্বাচন শেষে আরও নগ্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। আমরা যদি এখনই এই বাস্তবতা স্বীকার করে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না নেই, তাহলে ভোটের পরও মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাবে। নির্বাচন-পরবর্তী যেই সুদিনের আশা আমরা করছি, সেই আশা পুরনো হবে না। আমাদের আশা কখনোই পূরণ হয় না।
লেখক: গল্পকার।