ঢাকা শহরের কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠি

ইকরাম কবীর
১৮ জুলাই ২০২৬, ১৩:১১আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৩:২৮

প্রিয় ঢাকা,

জানি, তুমি ভালো নেই। থাকবেই বা কী করে? আমরা তো তোমাকে ভালো থাকতে দেইনি। তোমাকে ক্ষতবিক্ষত করেছি। তাই আজ ক্ষমা চেয়ে এই চিঠি লিখছি। এই চিঠি পড়ার সময় তুমি পাবে কিনা বা ইচ্ছে করবে কিনা তা জানি না। যদি পড়তে পারো, তাহলে জেনে রেখো, তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার ভাষাও আমাদের জানা নেই, কোন ভাষায় তোমার কাছে ক্ষমা চাইলে তোমার ক্ষতগুলোর শান্তি পাবে, তাও আমাদের জানা নেই। তোমার ক্ষতের গভীরতার সমান কোনও শব্দ উচ্চারণ করতে আমরা এখনও শিখিনি।

তোমাকে আমরা রাজধানী বলে ডাকি, প্রাণের শহর, স্বপ্নের শহর, যাদুর শহর, তিলোত্তমা বলে ডেকেছি। তিলোত্তমার অর্থ হচ্ছে পরম সুন্দরী, অপ্সরা। এসব নামে ডেকে তোমাকে ধোঁকা দিয়েছি। তোমাকে ধ্বংস করতে করতে আমরা তোমার দিকে তাকিয়েও দেখিনি যে তোমাকে এতো সুন্দর বিশেষণে সম্বোধন করা যায় কিনা। শুধু বলেইছি। তোমার বুকের মধ্যে আমাদের মতো যে অসংখ্য প্রতারকের লোভ, অপরাধ, অব্যবস্থাপনা আর উদাসীনতা জমা হয়েছে, তার দায় আমরা কেউ কখনও নিইনি। হয়তো নেবোও না। তাই এই দায় না নেওয়ার অপরাধবোধ থেকেই তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে এই চিঠি লিখতে বসেছি। আমাদের ক্ষমা করো, ঢাকা শহর। সত্যিই ক্ষমা করো।

তোমাকে আমরা একটা শহর হিসেবে নয়, একটা অসীম সহ্য ও ধৈর্যশালী পাথর হিসেবে ব্যবহার করেছি। কুড়ে কুড়ে খেয়েছি। আমরা ধরেই নিয়েছি যে তুমি সবকিছু সহ্য করবে। তুমি আরও মানুষের চাপ নেবে, তোমার বুকের ওপর দিয়ে আরও গাড়ি চলবে, খাই-খাই করে আরও অট্টালিকা তোমার দম বন্ধ করে দেবে, আরও কংক্রিট এসে তোমার হৃদয়ের নালাগুলো আটকে দেবে, আমরা হুহ-হাহ, পঁ-পঁ করে আরও অনেক হর্ন-সাইরেন বাজাবো। তখন তোমার শ্বাসকষ্ট হবে। আমরা কখনও ভাবিনি যে তোমার শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

কয়েকদিন আগে, একটা বিদেশি পত্রিকা আবার জানালো যে বিশ্বের ১৭৩টি প্রধান শহরের মধ্যে বসবাসের যোগ্যতায় তুমি ১৭১তম অবস্থানে আছো। তোমার নিচে রয়েছে শুধু ‘যুদ্ধাহত’ দামেস্ক ও ত্রিপোলি। আমরা তোমার দিকে খেয়াল রাখি না কিন্তু প্রতিবছর এই র‌্যাঙ্কিং দেখলে আমাদের, ঢাকাবাসীদের, গায়ে লাগে। এ যেন আমাদের বিরুদ্ধেই করা আমাদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করার একটা ইনডেক্স। এমন পরিস্থিতি দেখে আমাদের তোমার কাছে শতবার ক্ষমা চাওয়া উচিত।

আমরা তোমাকে একটা নিরাপদ লোকালয় হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। আমরা তোমার রাস্তায়, ভয় ভিয়ে হাঁটাচলা করি। ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে সহিংসতা, রাজনৈতিক পাগলামো, নাগরিক অশান্তি– সবমিলিয়ে আমরা তোমার সুন্দর সত্তাকে প্রতিদিন হত্যা করেছি, করছি। আমাদের নিরাপত্তাবোধ তোমার সবচেয়ে বড় সম্পদ হওয়ার কথা। সেই সম্পদ তোমার কাছ থেকে আমরাই কেড়ে নিয়েছি। আমরা তোমার যোগ্য নই; আমরা সত্যিই তোমার কাছে ক্ষমা চাই।

আমরা যেন সুন্দর চিকিৎসা পাই, সেটা নিশ্চিত করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সরকারি হাসপাতালের দীর্ঘ লাইন ও অব্যবস্থাপনা, বেসরকারি চিকিৎসার অস্বাভাবিক ব্যয়, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, সব মিলিয়ে তোমার অসুস্থ মানুষগুলোকে আমরা আরও অসহায় করে রেখেছি। স্বাস্থ্যসেবা আমাদের সবার মৌলিক অধিকার হওয়ার কথা, কিন্তু সেটাকে আমরা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। আমরা দুঃখিত।

তোমার কাছ থেকে আমরা আকাশ কেড়ে নিয়েছি; আজ আমরা কেউই আর আকাশের দিকে তাকাই না; কারণ তা দেখা যায় না। যেখানে একসময় মেঘের আনাগোনা ছিল, সেখানে আজ ধোঁয়া ঝুলে থাকে। যে বাতাসে একসময় নদীর বাসনা বয়ে নিয়ে আসতো, সেখানে এখন ধুলা, বিষ আর ক্লান্তি ভেসে থাকে। গাছ কেটে সাবাড় করেছি, পার্ক-পুকুর ভরাট করেছি, খাল দখল করে সব জলাশয়ের চিহ্ন মুছে দিয়েছি। তারপর এখন আমরা আহা-উহু করছি কেন তোমার তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, কেন আমরা হাঁপিয়ে উঠছি। আমাদের ক্ষমা করো।

প্রিয় ঢাকা, আমরা তোমার সংস্কৃতিকেও খুন করেছি। একটা শহর শুধু রাস্তা, ভবন, পানি, বিদ্যুৎ– এসব নিয়েই বেঁচে থাকে না। প্রয়োজন হয় থিয়েটার, সিনেমা হল, জাদুঘর, খেলার মাঠ এবং খেলাধুলা, বইয়ের দোকান এবং পড়ার সংস্কৃতি, পার্ক আর আমাদের অবাধ কথোপকথনের জায়গা। কিন্তু আমরা ধীরে ধীরে তোমাকে এমন এক শহরে পরিণত করেছি, যেখানে সেই সংস্কৃতিচর্চা করার কারও সময় নেই, কারও অবসর নেই। এখানে যারা সেই সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে নিজেদের জাহির করতে চান, তারা সারা দিন একে-অপরের সঙ্গে ঝগড়া করেন, কারণ তারা একদল ‘এই’ সংস্কৃতি চান, আরেক দল ‘ওই’ সংস্কৃতি চান। তাই আমাদের আসল সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে। এর ফল ভোগ করতে হয় তোমাকে, প্রিয় ঢাকা। তাই এই সংস্কৃতি-হীনতায় আজ আমরা লজ্জিত।

তুমিই তো সাক্ষী এবং দেখেছো যে আমরা শিক্ষাকে কেমন করে কিছু ভবনের মধ্যে আটকে ফেলেছি। শিক্ষার প্রয়োজন এবং প্রয়োগকে কীভাবে বাজারের পণ্যে পরিণত করে, শিক্ষার মান উন্নত করার বদলে বৈষম্যকে আরও বিস্তৃত করেছি। আমরা আসলে, শিক্ষিত নই; আমরা শিক্ষিত হলে, তোমার আজ এই অবস্থা হতো না; তুমি বসবাসের অযোগ্য হতে না।

তোমার অবকাঠামো তো আমরাই তৈরি করেছি এবং এতোটাই কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো কাজ করেছি যে একারণেই তোমার কাছে চিৎকার করে আমাদের ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত।

ওই বিদেশি পত্রিকার ইনডেক্সে, অবকাঠামোতে তুমি সবচেয়ে কম নম্বর পেয়েছো, একশর মধ্যে মাত্র ২৭। এই ‘২৭’ অনেককিছু বলে দেয়। বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার কথা, ভাঙা রাস্তার কথা; বলে পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের কথা; বলে নিরাপদ আবাসনের না থাকার কথা; বলে বিশুদ্ধ পানির অনিশ্চয়তার কথা; বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গণপরিবহন, যোগাযোগ– সবকিছুর অসম্পূর্ণতার কথা। তোমার কাছে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।

তুমি আমাদের তোমার বুকে রেখে সময় দিয়েছো; তোমাকেও আমাদের কিছু সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল; আমরা তোমার সময় ছিনিয়ে নিয়েছি, তোমাকে বিশ্রাম দেইনি।

আমরা প্রতিদিন যেই সময় আমাদের পরিবারকে দিতে পারতাম, বই পড়তে পারতাম, গান শুনতে পারতাম, সন্তানদের নিয়ে পার্কে হাঁটতে যেতে পারতাম, সেই সময় আমরা যানজটের কাছে বন্ধক রেখেছি। একটা শহরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মানুষের সময়। আমরা সেই সময় নষ্ট করেছি নির্মমভাবে। আমরা নিজেরাও বিশ্রাম নেইনি, তোমাকেও বিশ্রাম দেইনি।

আমরা তোমাকে এতো বেশি ‘আমাদের’ দিয়েই ভাসিয়ে দিয়েছি যে তুমি নিজের শরীর আজ চিনতে পারো না। তোমার প্রতি ইঞ্চি মাটি যেন আরও অনেক নতুন ভবনে তৈরি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। তোমার বাকি খোলা জায়গাগুলো হারিয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি।

আমরা দুঃখিত এবং লজ্জিত যে তুমি আজ অসুস্থ। আমরা কখনও তোমার চিকিৎসা করিনি এবং তোমার যেন চিকিৎসার প্রয়োজন না হয় সে কথাও ভাবিনি। তোমার বিভিন্ন রঙ দিয়ে ভণিতা করেছি, উদ্বোধন করেছি, ছবি তুলেছি, কিন্তু তোমার অসুখের শিকড়ে হাত দিইনি। তাই আমরা দুঃখিত।

আমরা তোমার ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছি। দেশের সব সুযোগ, সব চাকরি, সব শিক্ষা, সব চিকিৎসা, সব প্রশাসন, সব স্বপ্ন– সবকিছু তোমার কাঁধে তুলে দিয়ে, আমরা এবং আমাদের নেতারা ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে কে কখন ক্ষমতায় আসবে, তা ভাবতে ভাবতে, সকালে ঘুম থেকে উঠে, আপিসে গিয়েছি, আপিস থেকে ফিরে টেলিভিশনে কিচ্ছুক্ষণ অবান্তর এবং অবাস্তব কথাবার্তা শুনে ক্লান্ত হয়ে আবার ঘুমিয়ে গিয়েছি। তারপর সকালে উঠে বৃষ্টির পানিতে তুমি ডুবে গেলে, অভিযোগ করে বলেছি, তুমি একটা ব্যর্থ শহর। আমরা ভাবিনি তুমিও ক্লান্ত হতে পারো, তোমারও দম বন্ধ হয়, তোমার জলাশয় হত্যা করলে তোমার হৃৎস্পন্দন থাকে না।

নগর পরিকল্পনাবিদদের বলতে শুনি যে তোমাকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে; তোমার ওপর থেকে চাপ কমাতে হবে; আশেপাশের শহরগুলোর সঙ্গে তোমার যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে; জণমুখী যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে; হারিয়ে যাওয়া গাছ, পার্ক, খাল, জলাশয়কে ফিরিয়ে আনতে হবে।

এগুলো বলার জন্যে কী নগর পরিকল্পনাবিদ প্রয়োজন হয়? এগুলো তো আমাদের মতো কেরানিরাও জানে। তাই তোমার কাছে এই চিঠি লিখছি পরিকল্পনাবিদ এবং দেশনেতাদের পক্ষ থেকে নয়, আমাদের মতো কেরানিদের পক্ষ থেকে। এই কেরানিদের জন্যে ভাত-কাপড়ের জন্যে তোমার কাছে আসা ছাড়া আর উপায় ছিল না। আমরা এসেছি এবং যেহেতু আমাদের শিক্ষাদীক্ষা কম, তাই তোমাকে না জেনে ক্ষতবিক্ষত করেছি। তাই আজ শুধু বলতে চাই, তুমি আমাদের ক্ষমা করে দিও।

তবে আমরা কেরানিরা তোমার মৃত্যু চাই না; তুমি মরে গেলে আমাদেরও মৃত্যু হবে। আমরা এখনও স্বপ্ন দেখি, এখনও ভোরে আপিসে-বাসাবাড়িতে-রাস্তাঘাটে-দোকানে কাজে বের হই। তার অর্থ হচ্ছে তুমি এখনও বেঁচে আছো।

আমাদের আশা খুব বেশি নয়। তোমার এই বাকি জীবনটুকুর প্রতি সম্মান জানিয়ে আমাদের ‘বিদ’রা এবং নেতারা যেন তোমার এবং আমাদের মধ্যে একটা ভারসাম্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তুমি আমাদের শরীর এবং আমরা সেই শরীরের মস্তিষ্ক। দুটোই একসঙ্গে চলতে হবে। আমরা আশা করি তা চলবে। ‘বিদ’ এবং নেতারা আমাদের মস্তিষ্ক হবেন।

ততদিন পর্যন্ত, আমরা আছি। প্রিয় ঢাকা, আমাদের অপরাধগুলো ক্ষমা করে দিও।

ইতি

তোমারই– আমরা

/আরকে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ভূমিকম্প মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলার পাশে আইএমএফ
ভূমিকম্প মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলার পাশে আইএমএফ
গ্যাস আসবে যখন, রান্না হবে তখন
গ্যাস আসবে যখন, রান্না হবে তখন
ইরানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: বিদ্যুৎ ও পানি শোধন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত
ইরানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: বিদ্যুৎ ও পানি শোধন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত
মায়ের লাশের পাশে কাঁদছিল তিন মাসের শিশু
মায়ের লাশের পাশে কাঁদছিল তিন মাসের শিশু
সর্বশেষসর্বাধিক