কিশোর-কিশোরীরা কেন যৌনতাকেন্দ্রিক অপরাধে জড়িত হচ্ছে 

দেশে ইদানীং যেসব অপরাধ ঘটছে, আর যারা ঘটাচ্ছে, এদের বড় একটা অংশ শিশু-কিশোর এবং কমবয়সী তরুণ। আশঙ্কার বিষয় হলো—এই অপরাধগুলোর মধ্যে যৌনতাকেন্দ্রিক অপরাধও রয়েছে। কমবয়সী ছেলেমেয়েরা যৌনতাকে আনন্দলাভের বড় একটি উপায় বলে মনে করছে। শুধু তাই নয়, এই যৌনতাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে। কয়েক বছর আগে কলাবাগানে ও লেভেলের এক ছাত্রীর মৃত্যু হয়—তার সহপাঠী ছেলেবন্ধুর সঙ্গে দৈহিক মিলনের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। এই ঘটনা আমাদের মধ্যে প্রথম উদ্বেগ তৈরি করে।

এরপর যৌন হয়রানি, জবরদস্তি, ব্ল্যাকমেইল, ধর্ষণ, শিশু যৌন নির্যাতন ও অনলাইনে যৌন শোষণের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে, যা সমাজে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। দেখা গেছে, এসব ঘটনায় জড়িতদের অনেকের বয়স ২০-এর নিচে।

মনোবিজ্ঞান কিশোর-কিশোরীদের এই আচরণকে ‘সমস্যাজনক বা ক্ষতিকর যৌন আচরণ এবং উদ্বেগজনক যৌন আচরণ’ হিসেবে দেখছে। এগুলো এমন যৌন আচরণ, যা বয়স ও বিকাশের জন্য স্বাভাবিক নয়। এই আচরণ এমন হতে পারে—যা অন্যের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি করে বা ক্ষতির ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এটি শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে দেখা গেছে, কখনও কখনও এসব যৌন আচরণই অপরাধমূলক আচরণ হয়ে ওঠে। গত কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি, গণমাধ্যমে নিয়মিতভাবে যেসব অপরাধের ঘটনা আসছে, এর অনেকগুলোর সাথে কিশোর-কিশোরী, তরুণ, যৌনতা ও মাদক জড়িত। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, অশ্লীলতা, নারীর প্রতি সহিংসতা, বিভিন্ন কায়দায় বা ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে সেক্স করার পেছনে একটা বড় কারণ কিশোর-কিশোরীদের উদ্বেগজনক যৌন আচরণ এবং প্রজনন ও যৌন-স্বাস্থ্য বিষয়ে অজ্ঞতা।

তবে মনোবিজ্ঞান শিশু-কিশোরদের এ ধরনের উদ্বেগজনক যৌন আচরণের জন্য কোনও একক কারণকে দায়ী করে না, বরং বহু কারণের সম্মিলিত প্রভাবকে গুরুত্ব দেয়। অপরাধবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণাও বলছে, কিশোর-অভিযুক্ত যৌন অপরাধকে কোনও একটি তত্ত্ব, যেমন- শুধু পর্নোগ্রাফি, পারিবারিক সমস্যা, বা সহপাঠীর চাপ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

বরং ব্যক্তিগত বিকাশ, প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক জ্ঞান, পারিবারিক পরিবেশ, সহপাঠীর প্রভাব, সামাজিক- সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ডিজিটাল পরিবেশ এবং অপরাধ সংঘটনের পরিস্থিতি—এসব উপাদান একত্রে বিবেচনা করলে ঘটনাগুলোকে ভালোভাবে বোঝা যাবে।

আমাদের অনেকের ধারণা যৌনতা একটি পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির বিষয় এবং কিশোর কিশোরীরা এই চর্চা করে না। কিন্তু বাস্তবতা তেমনটা নয়। গত একশত বছরে বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়ার গড় বয়স কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রথম মাসিকের গড় বয়স প্রায় ১৬/১৭ বছর থেকে কমে ১২/১৩ বছরে নেমে এসেছে। তাই বয়ঃসন্ধির শারীরিক লক্ষণ এখন অনেকের ক্ষেত্রে ৯ থেকে ১১ বছর বয়সেই শুরু হতে পারে। পাশাপাশি ছেলেদের বয়ঃসন্ধিও কিছুটা আগে শুরু হচ্ছে, তবে পরিবর্তনটি মেয়েদের তুলনায় কম স্পষ্ট। অনেক ছেলের বয়ঃসন্ধি শুরু হয় ১০/১২ বছর বয়সে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউএনএফপিএ’র সূত্রমতে, বাংলাদেশে বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরী বলতে সাধারণত ১০-১৯ বছর বয়সীদের বোঝানো হয়। বাংলাদেশে এদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটির কাছাকাছি। অর্থাৎ, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৮/১৯ শতাংশ বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে অবস্থান করছে।

মানুষের যৌনতা বিষয়ক শারীরিক প্রক্রিয়া শুরু হয় বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই। অন্যদিকে এই বয়সী কিশোর-কিশোরীদের যৌনজীবনে প্রবেশ করা উচিত নয়। আশঙ্কার কথা এই বড় অংশের ছেলেমেয়েদের প্রজনন ও সুস্থ যৌন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সেবা বিষয়ে কোনও সুস্পষ্ট ধারণাই নেই।

কারণ এই প্রসঙ্গে তাদের কোনও তথ্য জানানো হয় না। কৈশোরকালে মন ও দেহের বৃদ্ধি ঘটার পাশাপাশি তাদের মধ্যে মনো-দৈহিক, আবেগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনও ঘটে। বয়ঃসন্ধিকালে নিজের দেহ ও মন নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকে। আর এই প্রশ্নের সঠিক জবাব না পেলে বিভ্রান্তি থেকে নানারকম ক্ষতি হতে পারে। সঠিক তথ্য না পাওয়ার ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘অস্বাভাবিক যৌনচিন্তা’ কাজ করতে শুরু করে। তাই বলা হচ্ছে, একজন শিশু যখন বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছে, তখন সেই শিশুর বিশেষ কিছু শারীরিক ও মানসিক চাহিদার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

যদিও অধিকাংশ পরিবার ও এই সমাজ ‘নিরাপদ প্রজনন স্বাস্থ্য’ নিয়ে কোনও আলোচনাকে গ্রহণ করে না। বরং এই বিষয়ক আলোচনাকে ঘরে-বাইরে ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়। এসব নিয়ে কথা বলাটা এখনও একধরনের স্টিগমার মধ্যে রয়ে গেছে। ফলে কিশোর-কিশোরীদের জন্য যা জানা জরুরি, তারা তা জানতে পারছে না। স্টিগমা ও বিভিন্ন ধরনের বিতর্কিত আলোচনার কারণে বয়ঃসন্ধিকালের স্বাস্থ্য ইস্যুগুলো নিয়ে কথাই বলা যায় না। অথচ সমাজে যৌনতাকেন্দ্রিক ঘটনা ঘটেই চলেছে, এর সাথে যোগ হয়েছে মাদক ও পর্নোগ্রাফি।

এই উদ্বেগজনক যৌন আচরণের সাথে সম্পর্কিত হয়েছে ‘টিন ডেটিং ভায়োলেন্স’। টিন ডেটিং ভায়োলেন্স হলো ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে ডেটিং বা প্রেম সম্পর্কিত সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও এক সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক, মানসিক, যৌন অথবা প্রযুক্তিগত নির্যাতন বা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। এটি কেবল সরাসরি মারধর নয়, বরং বিভিন্ন উপায়ে এই সহিংসতা প্রকাশ পেতে পারে।

কিশোর বয়সের এই ধরনের সহিংসতা পরবর্তী জীবনে গভীর মানসিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। এখন শহর ও গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন সব এনিমেশন বা গেইম দেখছে, যা মনকে ধর্ষকামী করে তোলে। তারা যখন এসব নেতিবাচক কাল্পনিক চরিত্রকে আদর্শ মনে করে নিজেদের তাদের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করে, তখন তারা না জেনেই জড়িয়ে পড়ে ক্ষতিকর ও অস্বাভাবিক যৌন আচরণে।

বিশ্বজুড়েই জনস্বাস্থ্য বিষয়ে বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীদের যৌন জ্ঞান ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গটি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ সময়টাতেই কিশোর-কিশোরীদের মনে রোমান্টিকতা ও যৌন আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তাই এই বয়সেই তাদের কাছে নিরাপদ ও সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। অভিভাবককে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে, নতুবা সন্তান ভুল তথ্য নিয়ে ভুল পথে যেতে পারে।

এদের সঠিক পথে চালানোর জন্য শুধু নীতি পুলিশিং না করে, বয়ঃসন্ধিকালে নিরাপদ ‘প্রজনন স্বাস্থ্য’ নিয়ে শিক্ষা দিতে হবে। স্কুলগুলো হতে পারে এই জ্ঞান দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল স্থান। তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞানভিত্তিক, বাস্তবসম্মত প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য পৌঁছানো সহজ হবে।

আমরা অনেকেই মনে করি, আমাদের সন্তানরা যৌন সম্পর্কে জড়াচ্ছে না, তারা নিরাপদ। কিন্তু আসলে কি তাই ঘটছে? গাইনির একজন চিকিৎসক জানালেন, গর্ভপাত বৈধ নয় বলে কম বয়সী মেয়েরা গোপনে এমন জায়গায় গর্ভপাত করে, যা পরবর্তীকালে তাদের স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। অবিবাহিত কিশোরীরাও অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের কারণে স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।

কিছু মানুষ ‘হাইপার সেক্সুয়ালিটি বা কম্পালসিভ সেক্সুয়াল ডিসঅর্ডার’ সমস্যায় ভোগে। এই সমস্যার লক্ষণ ১০ বছর বয়স থেকেই দেখা যেতে পারে। এটি একটি মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যার ফলে ব্যক্তির তীব্র ও অনিয়ন্ত্রিত যৌন আকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়। এটি কোনও সাধারণ যৌন আগ্রহ নয়, বরং এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতা এবং ক্ষতিকর পরিণতি জেনেও যৌন আচরণ চালিয়ে যাওয়ার একটি ব্যাধি।

এর মধ্যে আছে সারাক্ষণ যৌনচিন্তা, ফ্যান্টাসি নিয়ে ব্যস্ত থাকা, পর্নোগ্রাফি দেখা এবং যৌন কার্যকলাপে অনেকটা সময় ব্যয় করা। কিশোর-কিশোরীদের উদ্বেগজনক যৌন আচরণ নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন, তারা দেখেছেন এখন এদের মধ্যে বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর যৌন আচরণে যুক্ত হবার হার বেড়ে গেছে। এদের প্রকৃত নির্দেশনা, শিক্ষা ও সহযোগিতা দেওয়া দরকার। তা না করে বয়ঃসন্ধিকালের শিশুদের দায়ী করা মানে হবে চরম নির্বুদ্ধিতা। কারণ এই অগ্রিম যৌন আগ্রহ রিলিফের জন্য তারা বিপজ্জনক অনেক কিছুই করতে পারে।

তাহলে কী করলে কিশোর-কিশোরীদের এ সংক্রান্ত ঝুঁকি কমানো সম্ভব? আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী এবং অপরাধবিজ্ঞানী ট্র্যাভিস হিরশি’র সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব ও সামাজিক বন্ধন তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজের সাথে মানুষের শক্তিশালী ও অর্থবহ সম্পর্কের কারণেই তারা অপরাধমূলক বা বিচ্যুত আচরণ থেকে বিরত থাকে। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সঙ্গে ইতিবাচক বন্ধন দুর্বল হলে অপরাধের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

মনোবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যভিত্তিক গবেষণা বলছে, বয়স উপযোগী প্রজনন ও বৈজ্ঞানিক যৌন শিক্ষা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ব্যক্তিগত সীমানা সম্পর্কে শিক্ষা, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। পরিবারে ও স্কুলে খোলামেলা যোগাযোগ ও ইতিবাচক অভিভাবকত্ব দরকার। পাশাপাশি দৃষ্টি দিতে হবে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোর-কিশোরীদের প্রতি।

কিশোর-কিশোরীদের এই উদ্বেগজনক অবস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য বয়ঃসন্ধিকালের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া উচিত। বাবা-মা, অভিভাবক, স্কুল-কলেজ, ধর্মীয় নেতা, সমাজকর্মী, স্থানীয় মতমোড়ল ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সবাইকে এই প্রকল্পে যুক্ত করতে হবে।

বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা দিলে তারা নষ্ট হয়ে যাবে, যৌন বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং এই শিক্ষার মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা নিজেদের স্বাস্থ্য ও বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া বিষয়ে এমন অনেক জরুরি বিষয় জানতে পারবে, যা নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য জানাটা জরুরি। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমগুলো বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যাগুলো নিয়ে এমন বার্তা প্রচার করুক, যা তারা জানে না বা তারা ভুল জানে।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট