বিশ্বকাপের আবেগ কেন রক্তাক্ত হচ্ছে? 

প্রতিটি বিশ্বকাপের মৌসুমে একই দৃশ্য ফিরে আসে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে রঙিন পতাকা, চায়ের দোকানে উত্তপ্ত তর্ক, আর তারপর সংবাদের পাতায় একের পর এক মৃত্যুর খবর। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত দেড় মাসে দেশজুড়ে অন্তত ১২ থেকে ১৩ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে, আহত হয়েছেন শতাধিক। আমি যতটা গভীরভাবে এই ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করেছি, ততই মনে হয়েছে, এখানে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ট্র্যাজেডি মিশে গেছে একটি সাধারণ পরিসংখ্যানে।

একদিকে আছে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু, অন্যদিকে আছে ইচ্ছাকৃত সহিংসতা। এই দুটিকে আলাদা করে না দেখলে আমরা প্রকৃত সমস্যাটাই ধরতে পারবো না।

প্রথম ধরনের মৃত্যু ঘটছে অসাবধানতা থেকে। পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছেন মানুষ, প্রধানত কিশোর ও তরুণ। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে আমগাছে উঠে ব্রাজিলের পতাকা লাগাতে গিয়ে প্রাণ হারায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মাহিন শেখ, যার পতাকার বাঁশ হেলে পড়ে ছুঁয়ে যায় পল্লী বিদ্যুতের তার। মানিকগঞ্জে একই কারণে মারা যান তরুণ ফয়সাল হোসেন, চট্টগ্রামে রামহরি বৈষ্ণব, টাঙ্গাইলে ছাদ থেকে পড়ে রায়হান মিয়া। এই তালিকায় এখন যুক্ত হয়েছে আরেকটি নাম, নেত্রকোনার দীপ্ত চৌধুরী। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ের পর শহরের শহীদ মিনার মোড় এলাকায় বিজয় মিছিলের ভিডিও ধারণ করতে একটি ভবনের ছাদে উঠেছিলেন তিনি, সেখানেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছাদ থেকে নিচে পড়ে মারা যান। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, আর যারাই দেখেছেন, প্রায় সবাই একবাক্যে বলেছেন, এমন মৃত্যু সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত, প্রতিরোধযোগ্য ছিল। প্রতিটি বাড়ির কাছ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তার আর তার নিচে থাকা উঁচু গাছ কিংবা পাশের ছাদ, এই বিপজ্জনক নৈকট্য বছরের পর বছর ধরে থেকে গেছে, অথচ কোনও নিয়মিত সতর্কীকরণ প্রচারণা চোখে পড়ে না বিশ্বকাপ মৌসুম এলে।

দ্বিতীয় এবং আমার কাছে অনেক বেশি উদ্বেগজনক ধরনটি হলো সরাসরি সহিংসতা—যা এবার দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। খেলা দেখার সময় বাঁশি বাজানো বা চিৎকার করা কিংবা ম্যাচ নিয়ে সামান্য কথা কাটাকাটির জের ধরে কোথাও রাজনৈতিক নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, কোথাও আবার আপন চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন যুবক। এমনকি কিশোরদের ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধে বৃদ্ধকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা কিংবা এক কিশোরকে মেরে বালুচাপা দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। পতাকা টানানো বা খেলা দেখা নিয়ে তুচ্ছ তর্কে মাথা ফাটানো থেকে শুরু করে এবার আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের দেশীয় সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের খবরও সামনে এসেছে, যেখানে প্রতিপক্ষ দলের সমর্থক চিহ্নিত করেই তার ঘরে চড়াও হওয়া হয়েছে।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার নজরে আসে সমাজবিজ্ঞানের একটি প্রাসঙ্গিক তত্ত্ব। মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেল ও জন টার্নারের সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব বলে, মানুষ নিজের পরিচয় কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয় বরং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবেও গড়ে তোলে, আর সেই গোষ্ঠী হতে পারে একটি দেশ, একটি দল, এমনকি একটি বিদেশি ফুটবল দলও। এই তত্ত্বের আলোকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি অস্বস্তিকর সত্য বেরিয়ে আসে। আমরা যে দলগুলোর সমর্থক, সেই ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার সঙ্গে আমাদের কোনও ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই। তবু আমরা সেই দলের জয়-পরাজয়কে নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্ন বানিয়ে ফেলছি, আর প্রতিপক্ষ দলের সমর্থককে দেখছি প্রায় শত্রু হিসেবে, এমনকি সেই শত্রুতা যখন প্রতিবেশীর ঘরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখনও থামছি না। এটি একটি ধার করা আবেগ, যার মূল্য দিতে হচ্ছে নিজেদেরই মানুষের জীবন আর সহায়-সম্পত্তি দিয়ে।

আমি মনে করি, এই সংকটের পেছনে আরও কিছু কাঠামোগত কারণ কাজ করছে, যেগুলো নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয় না। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাল্টাপাল্টি কটূক্তি বাস্তব জীবনের বিরোধকে আরও উসকে দিচ্ছে। ফেসবুক-টিকটকে যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়, তার রেশ গিয়ে পড়ছে পাড়ার চায়ের দোকানে, এমনকি প্রতিবেশীর উঠানে। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় বেকারত্ব এবং একঘেয়ে জীবনযাত্রার মধ্যে বিশ্বকাপ পরিণত হয়েছে এক ধরনের মানসিক নিষ্কাশনের মাধ্যমে, যেখানে সামান্য উত্তেজনাও সহিংসতায় রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বহন করে। তৃতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে আরও আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নিতে পারে, যাতে পরিস্থিতি মৃত্যু বা বড় সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়ানোর আগেই সামাল দেওয়া যায়। চতুর্থত এবং আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের সামাজিক সহনশীলতার সংকট কেবল ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতি থেকে ধর্ম, পারিবারিক বিরোধ থেকে প্রতিবেশী সম্পর্ক, সর্বত্রই আমরা মতভিন্নতাকে সহ্য করার ক্ষমতা হারাচ্ছি। ফুটবল কেবল সেই গভীরতর সংকটের একটি প্রকাশ মাত্র।

ইতিহাস বলছে, এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও একই ধরনের সহিংসতায় দেশে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও পতাকা টানাতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল, আর আবদুল মতিনের ঘটনা তো আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত হয়েছিল, যিনি উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক তারে স্পর্শ পেয়ে হারিয়েছিলেন দুই হাত ও দুই পা। প্রতিটি বিশ্বকাপের পর আমরা একই ধরনের হা-হুতাশ করি, প্রতিবেদন লিখি, তারপর ভুলে যাই, যতক্ষণ না পরবর্তী বিশ্বকাপ আবার একই ট্র্যাজেডি নিয়ে হাজির হয়। এই পুনরাবৃত্তি নিজেই প্রমাণ করে, আমরা সমস্যাটির মূলে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি।

সম্প্রতি হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে, যেখানে বিশ্বকাপকেন্দ্রিক সহিংসতা, জনদুর্ভোগ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে, রাত ১১টার পর আতশবাজি ও উচ্চ শব্দের লাউড স্পিকার বন্ধেরও দাবি জানানো হয়েছে। এটি স্বাগত জানানোর মতো একটি পদক্ষেপ, তবে আমার মনে হয় এটি সমস্যার কেবল উপরিভাগ স্পর্শ করে। প্রকৃত সমাধান তিনটি স্তরে হতে হবে।

প্রথমত, প্রতিরোধমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে বৈদ্যুতিক তারের কাছে পতাকা না টানানোর এবং ছাদে উঠে উল্লাস না করার সুনির্দিষ্ট সতর্কীকরণ প্রচারণা চালানো উচিত, ঠিক যেভাবে বজ্রপাত মৌসুমে সতর্কতা প্রচার করা হয়। দ্বিতীয়ত, থানা পর্যায়ে বিশেষ নজরদারি দল গঠন করা দরকার, যারা খেলা চলাকালীন জনবহুল স্থানে টহল দেবে এবং প্রাথমিক পর্যায়েই সমর্থকদের মধ্যকার বিরোধ থামাবে, কারণ প্রতিটি হত্যাকাণ্ড কিংবা বাড়িঘরে হামলার ঘটনাই শুরু হয়েছিল একটি ছোট মৌখিক বিরোধ থেকে, যা সময়মতো থামানো গেলে হয়তো এড়ানো যেত। তৃতীয়ত, এবং দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে খেলাধুলার প্রতি স্বাস্থ্যকর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে, যেখানে শেখানো হবে প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা কখনোই অন্যের জীবনের কিংবা অন্যের ঘরের চেয়ে বড় হতে পারে না। আসলে এই ঘটনাগুলো আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কেই তুলে ধরে।

হাজার মাইল দূরের একটি টুর্নামেন্টের জন্য যখন আমরা প্রতিবেশীর ওপর চড়াও হই, তখন সংকটটা আর ফুটবলের থাকে না, তা হয়ে ওঠে আমাদের ভেতরের অসহিষ্ণুতার প্রকাশ। বিশ্বকাপ প্রতি চার বছর পরপর আসবে-যাবে, কিন্তু যে জীবনগুলো ঝরে গেল তা আর কখনও ফিরবে না। তাই খেলা শেষের আগে এই আত্মজিজ্ঞাসা প্রয়োজন—আমরা কি আসলেই খেলাকে ভালোবাসতে পেরেছি?

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক