আইন তুমি কার? 

বাংলাদেশে দুটি পেশার মানুষের হাতের লেখা নিয়ে কিংবদন্তি আছে—চিকিৎসক আর আইনজীবী। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ফার্মেসির লোক সহজ বাংলায় বুঝিয়ে দেন। কিন্তু আইনজীবী যা বলেন বা লিখে দেন, সেটি সহজ বাংলায় বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক সময় আরেকজন আইনজীবীর প্রয়োজন হয়!

কথাটি নিছক রসিকতা। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রের একটি বড় ব্যর্থতা।

এক ভদ্রলোকের কেনা বৈদ্যুতিক পণ্য কয়েক দিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেলো। তিনি জানেন না, ভোক্তা হিসেবে তাঁর কী অধিকার আছে। এক নারী বছরের পর বছর পারিবারিক নির্যাতন সহ্য করছেন, কিন্তু তিনি জানেনই না যে আইন তাঁকে তাৎক্ষণিক সুরক্ষার সুযোগ দিয়েছে। একজন চাকরিজীবী চাকরি হারিয়ে বুঝতেই পারলেন না, শ্রম আইন অনুযায়ী তাঁর পাওনা কী। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও জানেন না, তাঁর জন্য রাষ্ট্র কী ধরনের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।

এরা কেউই নিরক্ষর নন। তাঁরা শুধু আইনটা বোঝেন না। কিংবা হয়তো জানেনই না, আইনটা কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে আইনজীবীর দ্বারস্থ হতে হয়।

আমরা প্রায়ই বলি, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।” কিন্তু আইনের শাসন কি শুধু আদালতের বিষয়? বিচারকের বিষয়? আইনজীবীর বিষয়? নাকি একজন সাধারণ নাগরিকেরও?

কারণ যে মানুষ জানেনই না তাঁর অধিকার কী, তিনি সেই অধিকার দাবি করবেন কীভাবে?

বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই। বরং অনেক সময় মনে হয়, নতুন সমস্যার সবচেয়ে সহজ সমাধান যেন নতুন একটি আইন। কিন্তু নতুন আইন করার সময় আমরা খুব কমই ভাবি—পুরোনো আইনগুলো মানুষ আদৌ জানে কি?

সমস্যা আইনে নয়; সমস্যাটি আইনের ভাষায়, আর আইনের নাগাল না পাওয়ায়। আজকাল একটি ব্লেন্ডার কিনলেও তার সঙ্গে সহজ ভাষায় ব্যবহারবিধি থাকে। একটি মোবাইল ফোন কিনলে ভিডিও টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। এমনকি একটি প্রেসার কুকারের গায়েও সতর্কবার্তা লেখা থাকে। অথচ সংসদে যখন একটি আইন পাস হয়—যা কোটি কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করবে, তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য এক পাতারও সহজ ব্যাখ্যা থাকে না। যেন আইনটি নাগরিকের জন্য নয়, কেবল আদালতের জন্য।

আইনের ভাষা অবশ্যই নির্ভুল হতে হবে। আদালতে অস্পষ্টতার সুযোগ রাখা যায় না। কিন্তু আদালতের ভাষা আর নাগরিকের ভাষা এক হওয়া জরুরি নয়। বরং উন্নত দেশগুলো বহু আগেই বুঝেছে, আইনের ভাষা আর আইনের ব্যাখ্যা—দুটি আলাদা বিষয়।

যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর সঙ্গে ‘প্লেন ল্যাঙ্গুয়েজ গাইড’ প্রকাশ করা হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আবার ‘ইজি রিড’ সংস্করণও তৈরি হয়, যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক কিংবা স্বল্পশিক্ষিত মানুষও সহজে বুঝতে পারেন। সেখানে আইনের ধারা নয়, মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়—“এই আইন আমার জন্য কি?”, “আমি কোথায় অভিযোগ করবো?”, “আমার অধিকার কী?”

আমরা আইনকে এমনভাবে লিখি, যেন মানুষ সেটি ভাঙার জন্যই পড়বে। অথচ আইনের আরেকটি উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—মানুষ যেন সেটি ভালোমতো বুঝে, মেনে চলতে পারে। আইন যদি শুধু আদালতে ব্যবহারের জন্য লেখা হয়, তবে সেটি বিচারকে সাহায্য করে; কিন্তু যদি মানুষের ভাষায়ও ব্যাখ্যা করা হয়, তবে সেটি অন্যায় ঘটার আগেই মানুষকে সঠিক পথে রাখে।

বাংলাদেশেও কি এমনটি অসম্ভব?

বরং এখনই সবচেয়ে প্রয়োজন। কারণ আইনি অজ্ঞতার মূল্য শুধু নাগরিক দেন না, রাষ্ট্রও দেয়।

আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে ৪৬ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। এর বড় অংশই নিম্ন আদালতে। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে সময়, অর্থ, কর্মঘণ্টা এবং মানসিক চাপের বিশাল ব্যয়। সব মামলা যে আইন না জানার কারণে হয়েছে, তা নয়। কিন্তু অনেক বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই মিটে যেতে পারতো—যদি মানুষ নিজের অধিকার, দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতেন।

অপরদিকে, জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা ২০০৯ সাল থেকে ১৪ লাখেরও বেশি মানুষকে সরকারি খরচে আইনি সহায়তা দিয়েছে। একই সময়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে দুই লাখের বেশি বিরোধ আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হয়েছে। এই দুটি সংখ্যা প্রমাণ করে— সঠিক তথ্য ও সহজ আইনি দিকনির্দেশনা মানুষকে আদালতের বাইরে সমাধান খুঁজে পেতেও সাহায্য করে।

এটি শুধু বিচারব্যবস্থার বিষয় নয়; অর্থনীতিরও বিষয়।

বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, জটিল বিধিব্যবস্থা ও আইনি তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা ব্যবসার ব্যয় বাড়ায়, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন উদ্যোক্তা যদি লাইসেন্স, কর কিংবা শ্রম আইনই সহজে না বোঝেন, তাহলে ভুল হবে। ভুল থেকে বিরোধ হবে, বিরোধ থেকে মামলা।

মজার বিষয় হলো, আমরা এখন মোবাইলে কয়েক সেকেন্ডে টাকা পাঠাতে পারি, খাবার অর্ডার করতে পারি, উবার বা পাঠাও ডাকতে পারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জীবনবৃত্তান্ত লিখতে পারি। কিন্তু নিজের আইনি অধিকার জানতে গেলে এখনও ধারা, উপধারা, ব্যাখ্যা আর সংশোধনীর মহাকাব্যে হারিয়ে যাই।

তাহলে উপায় কী?

নতুন আইন নয়, আইনকে নতুনভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সরকার যদি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মূলমন্ত্রে একটি নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র গড়তে চায়, তাহলে প্রতিটি নতুন আইনের সঙ্গে কয়েকটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

প্রথমত, এক পাতার “নাগরিক সংস্করণ”। সেখানে সহজ ভাষায় লেখা থাকবে—এই আইন কেন করা হলো, কার জন্য, আপনার কী অধিকার, কোথায় যাবেন এবং না মানলে কী হবে।

দ্বিতীয়ত, দুই মিনিটের একটি বাংলা ভিডিও। যেমন- নির্বাচন কমিশন ভোটের নিয়ম বোঝায়, তেমনই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আইনও ভিডিও’র মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।

তৃতীয়ত, একটি সরকারি বাংলা এআই-ভিত্তিক আইনি সহকারী। কেউ যদি লেখেন, “বাড়িওয়ালা জামানতের টাকা দিচ্ছেন না” বা “কর্মস্থলে বেতন পাচ্ছি না”, তাহলে সেটি আইনজীবীর বিকল্প না হয়ে নাগরিককে প্রথম ধাপের দিকনির্দেশনা দেবে—কোন আইন প্রযোজ্য, কোথায় যেতে হবে এবং কী কী কাগজ লাগবে।

চতুর্থত, একটি একক জাতীয় আইনি পোর্টাল তৈরি করা যেতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও সরকারি ওয়েবসাইটে আইন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে কোনটি সর্বশেষ সংশোধিত আইন, সেটি বোঝাও কঠিন। একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি পোর্টাল এই বিভ্রান্তি দূর করতে পারে।

এর সঙ্গে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই ব্যবহারিক নাগরিক শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। আমাদের শিক্ষার্থীরা ত্রিকোণমিতি শেখে, কিন্তু একটি জিডি কীভাবে করতে হয়, তথ্য অধিকার আইনে আবেদন কীভাবে করতে হয় কিংবা ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ কোথায় করতে হয়—এসব শেখে না। অথচ বাস্তব জীবনে এগুলোর প্রয়োজন অনেক বেশি।

আমরা প্রায়ই বলি, “আইন না জানা অজুহাত হতে পারে না।” কথাটি আইনগতভাবে ঠিক। কিন্তু রাষ্ট্রেরও তো একটি দায়িত্ব আছে। নাগরিককে আইন জানার বাস্তব সুযোগ না দিয়ে তাঁর অজ্ঞতাকে দায় হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত?

আইনকে সহজ করলে আইনের মর্যাদা কমে না, বরং মানুষের মর্যাদা বাড়ে। কারণ তখন নাগরিক করুণা নয়, নিজের অধিকার দাবি করতে শেখেন। আর যে সমাজে মানুষ নিজের অধিকার জানে, সে সমাজেই আইনের শাসন সবচেয়ে শক্তিশালী হয়।

স্মার্ট বাংলাদেশের কথা আমরা অনেক বলি। কিন্তু একটি সত্যিকারের স্মার্ট রাষ্ট্র শুধু অনলাইন সেবা, মোবাইল অ্যাপ কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হয় না। একটি স্মার্ট রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র, যেখানে সংসদে একটি আইন পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সহজবোধ্য সংস্করণও মানুষের হাতে পৌঁছে যায়।

রাষ্ট্র যখন বলে, “আইন না জানা অজুহাত নয়,” তখন নাগরিকও বলতে পারেন, “আইনকে মানুষের ভাষায় পৌঁছে দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”

যেদিন আইন শুধু রাষ্ট্রের দলিল থাকবে না; নাগরিকেরও সম্পদ হয়ে উঠবে, আর সেদিনই আইনের শাসন আদালতের দেয়াল পেরিয়ে সত্যিকার অর্থে মানুষের ঘরে পৌঁছাবে।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত