‘আপনার শিশুকে টিকা দিন’ কথাটা কি আমরা ভুলে গেছি?

শফিক আর. ভূঁইয়া
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

ছোটবেলায় একটি বিজ্ঞাপন প্রায় সব জায়গায় দেখা যেতো, যার ট্যাগলাইন ছিল, ‘আপনার শিশুকে টিকা দিন।’ তখন টেলিভিশন চ্যানেল বলতে মূলত বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি। পাড়ার দেয়ালে দেয়ালে, স্কুলে, সরকারি দফতরে, খবরের কাগজে একই বার্তা বারবার চোখে পড়তো। কার্টুন, পুতুলনাট্য কিংবা শিশুদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও জনস্বাস্থ্যের এমন বার্তা দেওয়া হতো। কোন বয়সে শিশুকে কোন টিকা দিতে হবে, কেন দিতে হবে; এসব যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ ছিল।

এখন টেলিভিশনে অগণিত চ্যানেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য ভিডিও ও রিলস। কোনটি তথ্য, কোনটি বিজ্ঞাপন আর কোনটি নিছক বিনোদন; বেছে নেওয়ার দায়িত্ব অনেকটাই আমাদের। ফলে জনস্বাস্থ্যের একটি সহজ বার্তা লাখ লাখ পরিবারের কাছে একইভাবে, বারবার এবং সঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজটিও আগের চেয়ে কঠিন হয়ে গেছে।

২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের তাই শুধু টিকাদান নিয়ে নয়, জনস্বাস্থ্য যোগাযোগ নিয়েও ভাবতে বাধ্য করছে। বছরের শুরুতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশে ১৮ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী এবং ১৬৪টি সন্দেহভাজন মৃত্যু শনাক্ত হয়েছিল। আক্রান্তদের বড় অংশ ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর একটি ছিল, আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ছিল নয় মাসের কম। বাংলাদেশের নিয়মিত সূচিতে প্রথম হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয় নয় মাসে। অর্থাৎ আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ এমন বয়সেই ছিল, যখন নিয়মিত টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার সুযোগ এখনও আসেনি।

এ কারণেই হামের গল্পকে শুধু ‘টিকা নেয়নি’ বললে পুরো ছবিটি পাওয়া যায় না। অবশ্যই নিয়মিত ও সময়মতো টিকাদানই হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, জরুরি টিকাদান কর্মসূচি বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের দ্রুত সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

কিন্তু একটি শিশুর রোগ প্রতিরোধের গল্প টিকাকেন্দ্রে গিয়ে শুরু হয় না। শুরু হয় গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টি, জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব বুকের দুধ দেওয়া, প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ, এরপর বয়স উপযোগী ও বৈচিত্র্যময় খাবার এবং শিশুর বৃদ্ধি ও পুষ্টির নিয়মিত নজরদারি দিয়ে। অপুষ্টি শিশুর সংক্রমণ মোকাবিলার সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। তাই শিশুকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাটিও একাধিক স্তরের হওয়া দরকার।

দুঃখের বিষয়, এই মৌলিক বার্তাগুলোর কিছু জায়গায় আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের জাতীয় গৃহস্থালি জরিপে দেখা গেছে, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর মাত্র ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ শুধু বুকের দুধ পাচ্ছে; ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ শুরু করার হারও ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। একই জরিপে দেখা গেছে, ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ৩০ শতাংশ ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য পাচ্ছে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব কথা আমরা শেষ কবে নিয়মিতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছি? একজন মা কি সন্তানের জন্মের আগেই বারবার শুনছেন, কেন জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ? পরিবারের মানুষগুলো কি জানে, প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও সুরক্ষা দিতে পারে? বাবা-মা কি জানেন, কোন সময়ে কোন টিকা দিতে হবে এবং কোনো টিকা বাদ পড়লে কোথায় যেতে হবে? শিশুর বয়স অনুযায়ী ওজন ও উচ্চতা না বাড়লে যে অপেক্ষা না করে পরামর্শ নেওয়া দরকার, সেই কথাটিই বা কত পরিবার নিয়মিত শুনছে?

এখানে জনস্বাস্থ্যকে শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসক কিংবা টিকাকেন্দ্রের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়। একজন মা সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য না পেলে, একটি পরিবার অপুষ্টির লক্ষণ বুঝতে না পারলে কিংবা টিকার সময়সূচি ভুলে গেলে, পরে হাসপাতালকে সেই ঘাটতির পরিণতি সামলাতে হয়।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও আমরা একই ভুল করি, মশা বেড়ে যাওয়ার পর জোরেশোরে প্রচারণা শুরু করি। অথচ মশার প্রজননস্থল তৈরি হওয়ার আগেই নাগরিক আচরণ বদলের বার্তা নিয়মিত পৌঁছানো দরকার।

একসময় একটি ছোট টেলিভিশন বিজ্ঞাপন লাখ লাখ পরিবারকে মনে করিয়ে দিতে পারত, ‘আপনার শিশুকে টিকা দিন।’ আজ আমাদের হাতে তার চেয়ে অনেক বেশি মাধ্যম; টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মুঠোফোন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও স্থানীয় সমাজ। মাধ্যমের অভাব তাই আমাদের সমস্যা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কি জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে জরুরি কথাগুলোকে যথেষ্ট সহজ করে, যথেষ্ট নিয়মিতভাবে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে বলতে পারছি?

হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের সেই পুরোনো কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দিতে পারে। তবে এবার বার্তাটি শুধু টিকা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হলে চলবে না। শিশুর সুরক্ষা শুরু হয় জন্মের আগেই এবং চলতে থাকে তার বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে; মায়ের পুষ্টি, জন্মের পর বুকের দুধ, যথাযথ শিশুপুষ্টি, সময়মতো টিকা এবং প্রয়োজনের সময়ে চিকিৎসা।

জনস্বাস্থ্যের সাফল্য শুধু কতজন রোগীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলো, তার হিসাব নয়; কতজন শিশুকে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অসুস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করা গেলো, সেটিও তার বড় মাপকাঠি। আমরা হয়তো সেই পুরোনো কথাটিই আবার বলতে পারি, ‘আপনার শিশুকে সুরক্ষিত রাখুন।’ কিন্তু এবার কথাটি যেন শুধু কোনো বিশেষ দিবস, মহামারি কিংবা টিকাদান কর্মসূচির সময় না শোনা যায়; এটি যেন প্রতিটি মা-বাবার কাছে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান হয়ে ওঠে।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত

/ইউএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরে ‘সরকার দুঃখিত ও বিব্রত’
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরে ‘সরকার দুঃখিত ও বিব্রত’
বিশ্বের ভ্রমণ মানচিত্রে রাজত্ব করছে যে ১০ দেশ
বিশ্বের ভ্রমণ মানচিত্রে রাজত্ব করছে যে ১০ দেশ
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে যা বললেন ভারতের হাইকমিশনার
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে যা বললেন ভারতের হাইকমিশনার
‘আপনার শিশুকে টিকা দিন’ কথাটা কি আমরা ভুলে গেছি?
‘আপনার শিশুকে টিকা দিন’ কথাটা কি আমরা ভুলে গেছি?
সর্বশেষ সর্বাধিক