এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল আমাদের বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে পাসের হার নেমে এসেছে ৬২.২৫ শতাংশে। গত বছরের তুলনায় যা ৬.২ শতাংশ কম, আর গত ১৯ বছরে সর্বনিম্ন। আরও উদ্বেগের বিষয়, দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ৫৭টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের, ২২৬টি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের এবং ২৯টি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিষ্ঠান!
ফলাফল প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— শিক্ষার্থীরা এত খারাপ করলো কেন? প্রশ্ন হয়তো এটাই হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য আমরা কি শুধু শিক্ষার্থীদেরই দায়ী করতে পারি?
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফেল করেছে। কিন্তু তার আগে সে যে স্কুলে পড়েছে, যে শিক্ষকের কাছে পড়েছে, যে পাঠ্যক্রম অনুসরণ করেছে, যে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে—সেগুলো কি পরীক্ষার বাইরে? একটি শিশুর ফলাফল তার নিজের পরিশ্রমের প্রতিফলন নিঃসন্দেহে। কিন্তু সেটি একইসঙ্গে তার পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাব্যবস্থারও প্রতিফলন। তাই এবার এসএসসির ফলাফল নিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের খাতা যেমন দেখতে হবে, তেমনই শিক্ষাব্যবস্থার আয়নাতেও নিজেদের একবার হলেও দেখা উচিত।
কঠোর পরীক্ষা কি খারাপ?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। যদি এবারের পরীক্ষায় প্রকৃত যোগ্যতার ভিত্তিতে নম্বর দেওয়া হয়ে থাকে এবং আগের মতো কোনও ধরনের অযাচিত নম্বর দেওয়ার প্রবণতা না থাকে, তাহলে পাসের হার কমেছে বলে পরীক্ষার মান নিয়ে অভিযোগ করার কোনও কারণ নেই। বরং বাস্তব মূল্যায়ন দীর্ঘমেয়াদে ভালো এবং প্রশংসনীয়।
একটি শিক্ষাব্যবস্থায় সবাইকে পাস করিয়ে দেওয়া সাফল্য নয়। শিক্ষার্থী কী জানে, কী বোঝে এবং কী প্রয়োগ করতে পারে—সেটি সঠিকভাবে পরিমাপ করা জরুরি। কিন্তু কঠিন পরীক্ষা নেওয়ার পর আরেকটি কাজও করতে হয়। যারা পারলো না, তারা কেন পারলো না—সেটি খুঁজে বের করতে হয়। কারণ ৩১২টি প্রতিষ্ঠান থেকে যদি একজন শিক্ষার্থীও পাস না করে, তাহলে এই বিপুল সংখ্যক স্কুল বা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সবাইকে একইভাবে অযোগ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সেখানে নিশ্চয়ই আরও কিছু প্রশ্ন আছে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি শিক্ষক সংকট ছিল? বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব ছিল? ক্লাস কি নিয়মিত হয়েছিল? শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন ছিল? স্কুল ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল? শিক্ষার্থীরা কি আর্থিক বা পারিবারিক কোনও সংকটে ছিল? গত কয়েক বছরেও কি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল খারাপ ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করাটা সহজ কাজ। কিন্তু সহজ পথ সবসময় সঠিক পথ হয় না।
শিক্ষকও কি দায়ী?
অবশ্যই। শিক্ষকদের দায় নেই—এমন কথা বলার কোনও সুযোগ নেই। একজন শিক্ষক যদি নিয়মিত ক্লাস না নেন, শিক্ষার্থীদের না বোঝেন, দুর্বল শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত সহায়তা না দেন, কিংবা নিজের জ্ঞান ও শিক্ষাদানের পদ্ধতি হালনাগাদ করার চেষ্টা না করেন, তাহলে তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন আসে—আমরা কি শিক্ষকদের, বিশেষ করে স্কুলের শিক্ষকদের সেভাবে দক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ দিই?
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষককে প্রশিক্ষিত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিক্ষককে সেই সংজ্ঞায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক হিসেবে পাওয়া যায়নি। এটি কোনও শিক্ষকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং একটি প্রশাসনিক প্রশ্ন। একজন স্কুলশিক্ষক চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ১০, ১৫ বা ২০ বছর একই পদ্ধতিতে পড়াবেন, অথচ তাঁর জ্ঞান, শিক্ষাদান পদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, শিশু মনোবিজ্ঞান, মূল্যায়ন পদ্ধতি—কিছুই নিয়মিত হালনাগাদ হবে না, তারপর তার শিক্ষার্থীরা খারাপ করলে আমরা শুধু শিক্ষককে দায়ী করবো— এটিও ঠিক যুক্তিযুক্ত নয়।
মানুষ গড়ার কারিগর, কিন্তু বিনিয়োগ কোথায়?
আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানুষ গড়ার কারিগর বলি। অথচ স্কুলের শিক্ষকরাও মানুষ গড়ার কারিগর। বরং তাঁদের কাজ আরও মৌলিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক একজন তরুণকে যে জ্ঞান দেন, তার অনেকটাই নির্ভর করে সেই শিক্ষার্থী স্কুল ও কলেজে কী এবং কীভাবে শিখে এসেছে তার ওপর। গণিতের মৌলিক ধারণা, ভাষার দক্ষতা, পড়ার অভ্যাস, প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা, বিজ্ঞানকে বোঝার ভিত্তি—এসবের বীজ তৈরি হয় স্কুল থেকেই।
ভিত্তি তৈরি করেন স্কুলের শিক্ষক, তার ওপর ভবন তোলেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাহলে আমরা কেন শিক্ষকদের এই দুই স্তরকে এত ভিন্নভাবে দেখি? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণা করেন, সম্মেলনে যান, ফেলোশিপ পান, বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। তাঁদের গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকে, পেশাগত উন্নয়নের পথ থাকে। স্কুলের শিক্ষকরা কি একই ধরনের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের কোনও সুযোগ পান?
একজন স্কুলশিক্ষক কি কয়েক বছর পর পর বিদেশে গিয়ে আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি দেখে আসতে পারেন? তিনি কি আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারেন? তাঁর কি নিয়মিত গবেষণার সুযোগ আছে? তাঁর কি মেন্টরশিপের কোনও সুযোগ আছে? নিজের ভালো কাজের জন্য কি পেশাগত স্বীকৃতি পান?
শিক্ষকের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নটিও এখানেই আসে। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের বর্তমান মূল (বেসিক) বেতন জাতীয় পে-স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ১৩তম গ্রেডে মাত্র ১১ হাজার টাকা। আর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এন্ট্রি পদের মূল বেতন নবম বা দশম গ্রেডের পরিবর্তে বিভিন্ন স্তরে ১৬ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য খুঁজতে গেলে ভয়াবহ চিত্রই মনে আসে।
অবশ্যই কেবল বেতন দিয়ে ভালো শিক্ষক তৈরি হয় না। কিন্তু বেতন, সামাজিক মর্যাদা, কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ—সব মিলিয়ে একটি পেশার প্রতি রাষ্ট্রের মূল্যায়ন প্রকাশ পায়।
আমরা যদি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো—শিশুদের ভিত্তি তৈরি করা যাঁদের হাতে তুলে দিই, অথচ সেই পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করা, ধরে রাখা এবং নিয়মিত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট বিনিয়োগ না করি, তাহলে এর ফল একদিন না একদিন শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বেই।
শূন্য পাসের স্কুলগুলোর জন্য শাস্তি নয়, আগে অডিট
এবারের ৩১২টি শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠানের জন্য তাই সবার আগে স্কুল-পর্যায়ে অডিট করা জরুরি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সংখ্যা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, ক্লাস নেওয়ার হার, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, অবকাঠামো, আগের পাঁচ বছরের ফলাফল এবং ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বিশ্লেষণ করা দরকার। তারপর কারণ অনুযায়ী ব্যবস্থা।
কোথাও অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন হতে পারে। কোথাও গণিত বা ইংরেজিতে বিশেষ সহায়তা দরকার হতে পারে। কোথাও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হতে পারে। কোথাও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। আবার কোথাও হয়তো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কাঠামোই পরিবর্তন করতে হবে। সব স্কুলকে একই ওষুধ দিলে রোগ সারবে না।
আর একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— যে স্কুল সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে, সেখানে সবচেয়ে ভালো শিক্ষক ও সবচেয়ে বেশি সহায়তা পৌঁছানো উচিত। আমাদের ব্যবস্থায় প্রায়ই উল্টোটা ঘটে। ভালো ফল করা স্কুল আরও ভালো সুযোগ পায়, আর দুর্বল স্কুল দুর্বলই থেকে যায়। এই চিত্র বদলাতে হবে।
এইচএসসির আগে সতর্ক হওয়া দরকার
এসএসসির ফলাফল প্রকাশের পর আমরা যদি শুধু কয়েক দিন আলোচনা করি, তারপর পরবর্তী ব্রেকিং নিউজে চলে যাই, তাহলে এই ফলাফল থেকে কোনও শিক্ষা নেওয়া হবে না। এই ফলাফলকে এখনই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত।
কোন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের শেখার ব্যবধান বেশি? কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি বেশি? কোথায় শিক্ষক সংকট রয়েছে? কোথায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা বেশি? কোথায় অতিরিক্ত অ্যাকাডেমিক সহায়তা প্রয়োজন? এই তথ্য এখনই সংগ্রহ করে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত।
কারণ ফল প্রকাশের পর কান্না থামানো সহজ। কিন্তু ফল প্রকাশের আগেই একজন শিক্ষার্থী বা প্রতিষ্ঠানকে ধরে ফেলা যে, তারা পিছিয়ে পড়ছে, সেটিই ভালো শিক্ষাব্যবস্থার কাজ।
শেষ পর্যন্ত পরীক্ষাটা আমাদেরও
এসএসসি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল। তারা পরীক্ষা দিয়েছে, কেউ পাস করেছে, কেউ পারেনি। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর আরেকটি পরীক্ষা শুরু হয়েছে— আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষা। আমরা কি শুধু বলবো শিক্ষার্থীরা পড়েনি? নাকি জিজ্ঞেস করবো, তারা কেন শেখেনি বা শিখতে পারেনি? আমরা কি শুধু শিক্ষককে দায়ী করবো? নাকি প্রশ্ন করবো, শিক্ষককে ভালোভাবে শেখানোর জন্য আমরা কী প্রশিক্ষণ, কী উপকরণ এবং কী সুযোগ দিয়েছি?
আমরা কি শুধু স্কুলকেই জবাবদিহির মধ্যে আনবো? নাকি সবচেয়ে খারাপ ফল করা স্কুলগুলোকে আগে বুঝতে চেষ্টা করবো যে কোথায় এবং কেন তারা ব্যর্থ হচ্ছে? আর অবশ্যই নীতিনির্ধারকদের একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—আমরা কি শিক্ষাব্যবস্থায় ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করছি, নাকি শুধু প্রতিবছর পরীক্ষার ফলাফল সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছি?
একটি শিশুকে একটি গাছের সঙ্গে তুলনা করা খুব সহজ। কিন্তু কথাটি সত্যও বটে—গাছ বড় হওয়ার পর পানি দেওয়ার চেয়ে অঙ্কুর অবস্থায় তার যত্ন নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলের শিক্ষকরা সেই অঙ্কুরের যত্ন নেন।
আমরা যদি তাঁদের প্রশিক্ষণ, বেতন, সুযোগ-সুবিধা, পেশাগত মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা করি, তাহলে শিক্ষার্থীরা অঙ্কুরেই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে। পরে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যতই চেষ্টা করুন, সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন হবে। তাই এবারের এসএসসি ফলাফলকে শুধু “শিক্ষার্থীরা খারাপ করেছে” বলে শেষ করা যাবে না। বরং আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কি আমাদের শিক্ষার্থীদের ভালো শেখার মতো একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছি?
এই প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে এসএসসির ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়। এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার ফল।
লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত