২০২৪ সালের আগস্টে বিজয় সরণিতে একটি সোনালি মূর্তি নামিয়ে ফেলা হলো। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ১৫ বছরের একটি সরকারের পতন দেখেছিল যে জনতা, তারা তাদের ক্ষোভ ধারণ করার মতো একটি প্রতীক খুঁজে পেলো ওই মূর্তিতে। শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা; একইসঙ্গে আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পিতা। সেই মুহূর্তে পরিচয় দুটি যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল।
বিশ্বের গণমাধ্যম ঘটনাটিকে দেখলো ব্যক্তিপূজার পতন হিসেবে। সেটি অবশ্যই ছিল। কিন্তু এর ভেতরে আরও সীমিত, অথচ বেশি তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়ও ছিল। একটি দেশ বুঝতে পারছিল, যে প্রতীকটির ওপর ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে, সেটি ধ্বংস করা যতটা সহজ; সেই প্রতীক যে প্রশ্নের প্রতিনিধিত্ব করছিল, তার উত্তর দেওয়া ততটা সহজ নয়।
৬ মাস পর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, একটি জনতা আবার ফিরে এলো কাজটি শেষ করতে। এবার ধানমন্ডি ৩২-এ। এবার কোনো মূর্তি নয়, সেই বাড়ি। যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান বসবাস করতেন এবং যেখানে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। কয়েক দশক আগে যে বাড়িটিকে স্মৃতি জাদুঘরে রূপ দেওয়া হয়েছিল, এবার সেটিই হলো লক্ষ্য। তারা বুলডোজার, হাতুড়ি নিয়ে এলো। প্রথম বুলডোজারটির নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলে পালা করে আরেকটি আনা হলো। বাড়িটিতে আগুন দেওয়া হলো। আগুন নিভে ঠান্ডা হওয়ার পর আবার ফিরে এসে সেটি জ্বালানো হলো।
ঘটনার সময়টি হয়তো ছিল আকস্মিক। নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অনলাইন ভাষণ ঠেকানোর আহ্বানকে কেন্দ্র করেই এর সূত্রপাত। কিন্তু লক্ষ্যটি মোটেও আকস্মিক ছিল না।
মূর্তি একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি। বাড়ি হলো সেই জায়গা, যেখানে একটি পরিবার সত্যিই বসবাস করেছে, যেখানে একজন মানুষের সত্যিকারের দেহ পড়ে ছিল। প্রথমটি ভেঙে ফেলা হলো মূর্তিভাঙার মতো করে। দ্বিতীয়টি ভাঙা হলো একটি বাস্তব ঘটনাকে মুছে ফেলার চেষ্টার মতো করে। আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশ একটি মিথকে প্রত্যাখ্যান করা থেকে একটি স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টায় চলে গেলো। এই পরিবর্তন এত দ্রুত ঘটলো কেন, সেটি নিয়ে একটু ভাবা দরকার। কারণ এতে বোঝা যায়, শুধু মূর্তি ভেঙে ফেলা কখনোই যথেষ্ট হওয়ার কথা ছিল না।
শেখ মুজিবকে ঘিরে বিতর্কের মীমাংসা এত কঠিন হওয়ার কারণ হলো, তার সবচেয়ে বড় তিন দাবিদারের কেউই তাকে নিয়ে একই জিনিস চায় না। আর এই তিন অবস্থানের কোনোটিই আসলে ইতিহাস নিয়ে নয়।
জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকগোষ্ঠী কখনোই বাংলাদেশের জন্মের মৌলিক ভিত্তিকে পুরোপুরি মেনে নেয়নি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা একটি দলের নেতৃত্বের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রীয় নায়ককে সহজে স্বীকার করা কঠিন। কারণ তা করতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতাও মেনে নিতে হয়। ফলে ওই ধারার কাছে মুজিবকে ছোট করা কোনো ইতিহাস পুনর্বিবেচনা নয়, বরং মতাদর্শেরই অংশ।
আওয়ামী লীগের অবস্থান এর ঠিক বিপরীত। তাদের কাছে মুজিব এমন কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নন, যাকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তিনি দলটির অস্তিত্বের পুরো দাবিটিই। সেই দাবি আক্ষরিক অর্থেই রক্তের উত্তরাধিকার ধরে তার কন্যার প্রধানমন্ত্রিত্ব পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে ১৫ বছর ধরে মুজিবের যেকোনো সমালোচনাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
আর আছে বিএনপির আরও আকর্ষণীয়, আরও হিসাবি মধ্যবর্তী অবস্থান। মুজিবকে মুক্তিযুদ্ধের একজন সত্যিকারের নেতা হিসেবে স্বীকার করা, জামায়াতের যুক্তিকে কোনো সুযোগ না দেওয়া; একই সঙ্গে কয়েক দশক ধরে যারা তাকে হত্যা করেছিল, তাদের পুনর্বাসন করা।
জিয়াউর রহমানের সরকার হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনা থেকে দায়মুক্তি দিয়েছিল। পরে তাদের কয়েকজনকে বিদেশে কূটনৈতিক পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এটি কোনো দ্বিধা নয়। এটি এমন একটি দল, যারা ইচ্ছা করেই প্যারাডক্সের দুই প্রান্ত ধরে রেখেছে। প্রতিষ্ঠাতাকে সম্মান করা এবং তার হত্যাকারীদের সুরক্ষা দেওয়া।
তিন দল, একই মৃত মানুষকে নিয়ে তিন ধরনের ব্যবহার। অথচ তাদের কেউই মূলত কী ঘটেছিল, সেটি নিয়ে আগ্রহী নয়। এই বিতর্কে চতুর্থ একটি পক্ষও আছে। তারা কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তাদেরও অন্তত এই তিন দলের সমান গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা উচিত। সেটি হলো অন্তর্বর্তী সরকার, যারা হাসিনার পতন থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার ফিরে আসা পর্যন্ত ১৮ মাস বাংলাদেশ শাসন করেছে।
মুহাম্মদ ইউনূস এমন একটি পরিচয় নিয়ে এসেছিলেন, যা কোনো দেশীয় রাজনীতিকের ছিল না। নোবেলজয়ী, বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্য এবং ঠিক সেই শূন্যতা পূরণের জন্য উপযুক্ত, যে শূন্যতা পূরণ করতে ছাত্র আন্দোলন কাউকে সামনে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি যা দিলেন, তার তুলনায় সেই পরিচয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল অনেক বড়।
বিদেশি বিনিয়োগকে বারবার সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে তা অনেকটাই স্থবির ছিল। এমনকি সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল অর্থনীতিবিদদের স্বীকারোক্তিতেও বিষয়টি উঠে এসেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নিজস্ব সূচকগুলোতেও দেখা গেছে, সুশাসনকে প্রতিষ্ঠার মূল প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসা একটি সরকারের অধীনে দুর্নীতির পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং অবনতি হয়েছে।
আর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কয়েক দিন আগে নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামীকে ইউনূস ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞামুক্ত করলেন। এরপর ১৮ মাসে দলটি বিরোধী অবস্থান থেকে এমন এক জায়গায় চলে গেল, যা অনেকটা সরকারঘনিষ্ঠ অংশীদারের মতো। ছাত্র নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে তাদের জোট হলো। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এসে জামায়াত নিজেই কয়েকজন উপদেষ্টার নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করল যে তারা প্রশাসনের নিয়োগকে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। একই সময়ে আলাদা স্বাধীন অনুসন্ধানেও দেখা গেলো, সরকার যে সময়ে নিরপেক্ষ ও কারিগরি প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ঠিক সেই সময়েই আমলাতন্ত্রের ভেতরে জামায়াত ও এনসিপির প্রভাব বেড়েছে।
এর কোনোটির জন্য অভ্যুত্থান কিংবা কোনো ডিক্রি প্রয়োজন হয়নি। প্রয়োজন হয়েছে কেবল সেই সাধারণ, নিরস হাতিয়ারটির, যা এই লেখায় এরই মধ্যে প্রতিটি পক্ষকে ব্যবহার করতে দেখা গেছে: যুক্তি নয়, নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ এমন একটি বিষয়কেও স্বাভাবিক করে তুলেছিল, যা হাসিনার আরও কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময়ও দেশ পুরোপুরি মেনে নেয়নি, জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া।
ধানমন্ডি ৩২ ভেঙে ফেলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, যা পরে সরকার এসে পরিষ্কার করে দিয়েছে। ঘটনাটি দুই রাত ধরে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে উপস্থিত থেকেও নিষ্ক্রিয় ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য আহ্বানের পরই ঘটনাটি ঘটেছে। আর এটি ছিল ২০২৫ সালে সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের বর্ণনা করা বৃহত্তর একটি প্রবণতার সবচেয়ে বেশি আলোকচিত্রিত উদাহরণ মাত্র।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক ব্যক্তিরা স্বাধীনভাবে কথা বলার জায়গা সংকুচিত হওয়ার কথা বলেছেন। সম্পত্তি এবং ইতিহাস, দুটিই এমন এক পরিস্থিতিতে ফেলে রাখা হয়েছে, যেখানে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি নিয়ে যে জনতা আগে পৌঁছাবে, শেষ পর্যন্ত তারাই যেন সিদ্ধান্ত নেবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসা একটি সরকার শেষ পর্যন্ত প্রায়ই এমনভাবে শাসন করেছে, যেন যে পক্ষ বুলডোজার নিয়ে আগে হাজির হবে, তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। আর সেনাবাহিনী না থাকলে আদৌ নির্বাচন হতো কি না, সেই প্রশ্নের সৎ উত্তর হলো, কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী হওয়ার সম্ভাবনা সম্ভবত ছিল না।
ইউনূসের নিজের দেওয়া সময়সীমা প্রায় এক বছর ধরে পিছিয়েছে। ‘ডিসেম্বর ২০২৫’ থেকে অস্পষ্টভাবে ‘২০২৬ সালের প্রথমার্ধে’ গড়িয়েছে। এর আগে করার কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি তিনি নেননি।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেছেন, দেশ ‘একটি বিশৃঙ্খল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’ এবং এই টানাপোড়েন চলতে থাকলে দেশের সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তারা মনে করেন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে আসা কোনো উদ্যোগের চেয়ে এই চাপই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে বেশি ভূমিকা রেখেছে।
একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার নিজস্ব মেয়াদের কোনো নির্দিষ্ট সীমা ছিল না, ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও তার আগে আসা নির্বাচিত সরকারগুলোর চেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল না।
সেনাবাহিনী ২০২৬ সালে ক্ষমতা দখল করেনি। তারা এর চেয়ে নীরব, এবং এক অর্থে সমান তাৎপর্যপূর্ণ একটি কাজ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার যদি নির্বাচন পিছিয়ে যেতেই থাকে, তাহলে একসময় কেউ তাকে থামাবে, এটি তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এখানেই আমরা আরও কঠিন প্রশ্নটির সামনে এসে দাঁড়াই। যে প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার কথা ছিল সেই মূর্তিটির, কিন্তু সেটি পারেনি: ২০২৪ সালে যদি ব্যক্তিপূজার পতন ঘটে থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তিপূজার ওপর এবং তার পরবর্তী তত্ত্বাবধানের ওপর যে অলিগার্কি বসে ছিল, তার কী হলো?
একটি সূত্র অনুসরণ করা যাক।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের কয়েক সপ্তাহ আগে, ২০২৪ সালের জুনে, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এবং আওয়ামী লীগ আমলের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর একটি বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের তেল ও গ্যাস শাখার মাধ্যমে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও নিজেদের বিতরণ নেটওয়ার্কে বিক্রির অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে একটি চিঠি পায়। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন কয়েক দশক ধরে যে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল, তা ভেঙে দেওয়ার পথ তৈরি হয়েছিল।
বিষয়টি দেখলে মনে হতে পারে, পুরোনো ব্যবস্থার সমালোচকেরা যে ধরনের শেষ মুহূর্তের, একক সুবিধাভিত্তিক সিদ্ধান্তকে পুরোনো বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্য বলতেন, এটি ঠিক তেমনই একটি সিদ্ধান্ত। সরকার পতনের আগে অবশ্য নীতিটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৫ সালে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি আবেদনের পর ঢাকার একটি আদালত বসুন্ধরার শেয়ার ও পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন হিসাব, যার পরিমাণ ছিল কয়েক বিলিয়ন টাকা, স্থগিত করার নির্দেশ দেয়। এটি ছিল, অন্তত সাময়িকভাবে, একটি সংকেত যে নতুন ব্যবস্থা পুরোনো ব্যবস্থা কী দিয়ে গিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে চায়।
কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টে, তৃতীয় একটি সরকারের সময়, ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে, বসুন্ধরা জ্বালানি খাতে পিছু হটেনি। বরং সেখানে তাদের অবস্থান আরও বিস্তৃত হয়েছে।
গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এলপিজি ও এলএনজি আমদানির জন্য নতুন করে আবেদন করেছে। সরকার পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে একটি নতুন বেসরকারি খাতের জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছে। এর পেছনে সরাসরি ছিল বসুন্ধরার বছরে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টন জ্বালানি আমদানির প্রস্তাব। নীতির এই পরিবর্তন এতটাই আকস্মিক ছিল যে, পরিকল্পনার প্রতি আপত্তির কারণে পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে কয়েক দিন আগেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো একটি কৌশলগত খাত বেসরকারি একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
তিন বছরে তিন সরকার। একটি আওয়ামী লীগ সরকার, যারা সুবিধাটি দিয়েছিল। একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যারা পরিবারের হিসাব স্থগিত করেছিল। আর এখন একটি নির্বাচিত বিএনপি সরকার, যারা ওই পরিবারই যে উদারীকরণ চেয়েছিল, সেই নীতিমালাই প্রণয়ন করছে।
অথচ অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। শুধু মাঝে মাঝে থেমেছে, কখনো সত্যিকার অর্থে পিছিয়ে যায়নি। কাঠামোটি ক্রোনিজম বা ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট সুবিধা থেকে প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। কিন্তু সুবিধাভোগী বদলায়নি।
পতিত একটি মূর্তি যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, এটি সেই প্রশ্ন।
বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাগুলো গত ৫০ বছরে বারবার এমন এক কৌশলে অভ্যস্ত হয়েছে: মঞ্চে কে দাঁড়াবে, তা বদলানো; কিন্তু মঞ্চের পেছনের কাঠামোটি অক্ষত রাখা। জমির সিন্ডিকেট, ব্যাংক খাতের অমীমাংসিত খেলাপি ঋণ, জ্বালানি খাতের সেইসব বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যারা যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তার ঘোষিত মতাদর্শকে নিজেদের সুবিধায় রূপান্তর করতে সক্ষম। এই কাঠামোই টিকে থেকেছে।
ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি তৈরি করতে বিপুল খরচ হয়। কিন্তু তা ভাঙা আশ্চর্যজনকভাবে সহজ: একটি জনতা আর কয়েক ঘণ্টা বুলডোজার চালালেই যথেষ্ট।
অলিগার্কি ঠিক এর বিপরীত। জনতার চোখে অদৃশ্য, চুক্তি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার চিঠি এবং নীরব বোর্ডরুমের ধারাবাহিকতা দিয়ে তৈরি। সরকার পরিবর্তনের পরও এটি টিকে থাকে ঠিক এই কারণে যে, কোনো বুলডোজার জানে না তাকে কোথায় চালাতে হবে।
ঠিক কী ঘটেছিল এবং কী ঘটেনি, সেটি আবারও স্পষ্ট করা দরকার। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ নতুন করে জন্ম নেয়নি। একটি দেশের জন্ম একবারই হয়। ২০২৪ সালে যা ঘটেছিল, তা দ্বিতীয় জন্ম নয়; বরং একটি হিসাব-নিকাশের মুহূর্ত। অর্ধশতাব্দীতে এমন এক মুহূর্ত, যখন বাংলাদেশকে তার নিজস্ব জন্মের মিথকে ঘিরে তৈরি হয়ে যাওয়া, দীর্ঘদিন ধরে শক্ত হয়ে থাকা বন্দোবস্তটির দিকে প্রায় সরাসরি তাকাতে বাধ্য করা হয়েছিল।
হিসাব-নিকাশের এই মুহূর্ত কোনো ছোট বিষয় নয়। এটি ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের পতন ঘটিয়েছে। তার আগে ১৯৯০-এর দশকেও শেখ হাসিনা একটি মেয়াদে ক্ষমতায় ছিলেন। যে কোনো হিসাবেই তিনি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারপ্রধান থাকা ব্যক্তি।
এটি বিভিন্ন নথি ও ফাইল উন্মুক্ত করেছে, হিসাব স্থগিত করেছে, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে এবং অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে।
এসব কিছুই তুচ্ছ নয়। কিন্তু কোনো হিসাব-নিকাশ যদি কেবল প্রতীকের স্তরে থেমে যায়, একটি মূর্তি পড়ে যায়, একটি বাড়ি পুড়ে যায়, একটি সড়কের নাম বদলে যায়, তাহলে সেটি কাঠামোর স্তরে পৌঁছানো হিসাব-নিকাশের সমান নয়।
আর বসুন্ধরার সময়রেখা এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যে, এখন পর্যন্ত এই হিসাব-নিকাশ মূলত প্রথম স্তরেই থেমে আছে।
তাই ১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া শিশুটি এখন আর নবজাতক নয়। তার বয়স ৫৫ বছর। সে একটি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে, বাবার হত্যাকাণ্ড দেখেছে, ১৫ বছরের সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে গেছে, তিন দশক ধরে পালাবদল করে আসা বেসামরিক সরকার দেখেছে, যারা একে অপরের বিরুদ্ধে একই ধরনের অপরাধের অভিযোগ তুলেছে। সে একটি গণঅভ্যুত্থান দেখেছে, ১৮ মাসের একটি তত্ত্বাবধানের সময় দেখেছে, যে সরকার নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়েও নতুন একটি পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। আর এখন সে এমন একটি নির্বাচিত সরকার দেখছে, যারা প্রায় কোনো বিরতি ছাড়াই আগের দুই সরকারের পথেই হাঁটছে।
এটি কোনো শিশুর পরিচয় নয়। বরং এমন একজন মানুষের পরিচয়, যে প্রতিটি পারিবারিক সমাবেশে নিজের সঙ্গেই একই বিতর্ক করে এবং প্রতিবার সেটিকে নতুন শুরু বলে মনে করে।
বাংলাদেশের কি বড় হয়ে ওঠা উচিত? প্রশ্নটি প্রায় অপ্রয়োজনীয়। এর উত্তর দিতে গেলে আসলে বলতে হয়, বড় হয়ে ওঠার অর্থ কী। এমন একটি রাষ্ট্র, যার প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ভর করবে না কোন পরিবার বর্তমানে ক্ষমতায় আছে তার ওপর। এমন একটি অর্থনীতি, যার কৌশলগত খাতগুলো এই দশকে যে ক্ষমতায় আছে তার সঙ্গে কার কতটা ঘনিষ্ঠতা, তার ভিত্তিতে নয়, বরং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বণ্টিত হবে। এমন একটি রাজনীতি, যেখানে সরকার পরিবর্তন মানে নীতির পরিবর্তন, কেবল ভুক্তভোগী ও সুবিধাভোগী বদলে যাওয়া নয়।
গুরুতর কেউ এই বর্ণনার সঙ্গে দ্বিমত করবেন না। মতবিরোধ যখন আসে, তা কখনোই মূলত গন্তব্য নিয়ে নয়।
বাংলাদেশ কি বড় হয়ে উঠতে পারবে? এটাই একমাত্র প্রশ্ন যার উত্তর এখনো খোলা। আর এটি প্রথম প্রশ্নটির তুলনায় অনেক বেশি ঠান্ডা, কঠিন একটি প্রশ্ন।
এটি অভিপ্রায়ের প্রশ্ন নয়। কারণ অভিপ্রায় সস্তা এবং প্রতিটি সরকারই তার ঝুলি ভর্তি অভিপ্রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসে। প্রশ্ন হলো, যে ব্যবস্থা বারবার একই ফলাফল তৈরি করে চলেছে, সেই ব্যবস্থারই সুবিধাভোগী দলগুলো, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো, আমলাতন্ত্র ও আদালত কি সেই ব্যবস্থাকে ভাঙতে পারবে, যা তাদের অক্ষত থাকাতেই লাভবান করে? কেউই কখনো এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করেনি, যা পৃষ্ঠপোষকতার ওপর চলে না। কারণ তারা কেউই এমন বাংলাদেশ দেখেনি।
একজন মানুষের বড় হয়ে ওঠার অর্থ হলো, দীর্ঘমেয়াদি এমন একটি কল্যাণের কথা ভেবে নিজের তাৎক্ষণিক প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করা, যার একটি স্পষ্ট ছবি সে কল্পনা করতে পারে।
বাংলাদেশের সমস্যাটি হয়তো অপরিণত থাকার চেয়ে আরও নির্দিষ্ট। এখানকার কোনো প্রজন্মই এখনো এত দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বিকল্প ব্যবস্থার ভেতরে বসবাস করেনি যে তারা সেটির একটি ছবি কল্পনা করতে পারে। আপনি এমন কোনো আকৃতিতে বড় হয়ে উঠতে পারবেন না, যার অস্তিত্ব আপনি কখনো দেখেননি।
এই কারণেই উত্তরটি কোনো একটি ঘটনা হিসেবে আসবে না। এটি কোনো মূর্তি ভেঙে পড়ার মাধ্যমে আসবে না, কোনো আদালতের রায়ের মাধ্যমে আসবে না, এমনকি কোনো নির্বাচনের মাধ্যমেও নয়, যতই এসব ঘটনা নিজেদের জায়গায় তাৎপর্যপূর্ণ হোক।
উত্তরটি যদি কখনো আসে, তবে তা আসবে উত্তেজনাহীন, অনাকর্ষণীয় কিছু প্রত্যাখ্যানের ধারাবাহিকতায়। এমন একজন নিয়ন্ত্রক, যিনি চিঠিতে সই করতে অস্বীকার করবেন। এমন একটি আদালত, যিনি সংবাদচক্র শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কোনো স্থগিতাদেশকে নীরবে অকার্যকর হতে দেবেন না। এমন একটি জনপ্রিয় নতুন আন্দোলন, যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই নিজেদের সনদে অভ্যন্তরীণ মেয়াদসীমা লিখে রাখবে। এমন একটি জ্বালানি নীতি, যা কোনো একটি শিল্পগোষ্ঠীর প্রস্তাবের ১০ দিনের মধ্যে তৈরি না হয়ে সংসদে বিতর্কের মধ্য দিয়ে তৈরি হবে।
এর প্রতিটি একা সন্ধ্যার খবরের পর্দায় জ্বলতে থাকা একটি বাড়ির তুলনায় অদৃশ্য। কিন্তু এগুলো সব একসঙ্গে, যতক্ষণ পর্যন্ত উত্তেজনা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও টিকে থাকবে, তখনই সেটি হবে প্রকৃত ঘটনা। এমন একটি ঘটনা, যার কোনো বুলডোজার নেই, জনতা নেই, মূর্তি নেই। আর ঠিক সে কারণেই সেটিকে এড়িয়ে যাওয়া এত সহজ।
২০২৪ সালে দেশ একটি পুরোনো উত্তর ভেঙে ফেলেছে। ২০২৫ সালেও আবার সেটিই করেছে। কিন্তু এই দুই ধ্বংসযজ্ঞের নিচে যে নতুন, নীরব প্রশ্নটি পড়ে আছে, তার সামনে বাংলাদেশ এখনো বসেনি। প্রশ্নটি কে মূর্তির যোগ্য, তা নয়। বরং চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকে?
এই প্রশ্নের উত্তর টেনে নামানোর মতো কোনো দড়ি নেই। আর ধানমন্ডি ৩২-এর ঘটনার ৫১ বছর পরও এমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই যে, কেউ সেই দড়িটি খুঁজতে যাচ্ছে।
(সাপ্তাহিক পত্রিকা কাউন্টারপয়েন্ট থেকে অনূদিত)
লেখক: নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক।