বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি কোথায় হারালো?

খায়ের মাহমুদ
১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৪

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে রাস্তায় নামা মানুষের পরিচয়, পেশা ও রাজনৈতিক অবস্থান এক ছিল না। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশের প্রত্যাশা ছিল অভিন্ন। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিল— যেখানে ভয় কমবে, বৈষম্য কমবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনও দল বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি হয়ে থাকবে না। সে সময় আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্ররা অন্তত সাধারণ মানুষকে এই বার্তাই দিয়েছিল যে, এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন নয়, বরং রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর লড়াই। কিন্তু ৫ আগস্টের দুই বছর পর এসে প্রশ্ন উঠছে— সেই বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি কোথায় হারালো? মানুষ কি সত্যিই মুক্তির স্বাদ পেয়েছে, নাকি কেবল ক্ষমতার মালিকানা বদলেছে?

গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় নৈতিক শক্তি ছিল এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। কিন্তু পরবর্তী দুই বছরে জনপরিসরে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আন্দোলনের ফলাফল জনগণের হাতে যায়নি, বরং কয়েকজন ছাত্রনেতা, কিছু উপদেষ্টা, নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং পুরোনো ক্ষমতার নতুন বিন্যাসের হাতে আটকে গেছে। দৃশ্যত যে আন্দোলন ছিল জনতার, তার রাজনৈতিক মালিকানা সংকুচিত হয়েছে। আমার মনে হয়, এই জায়গাতেই মানুষের হতাশা সবচেয়ে গভীর।  যারা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা কতটা পরিবর্তন আনতে পেরেছে? ইউনূস সরকারের দুই বছর এবং ছাত্র নেতৃত্বের প্রকাশ্য ভূমিকা কি মানুষকে নতুন আস্থার জায়গা দিয়েছে, নাকি আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে? প্রফেসর ইউনূস নিজে ছাত্রদের পড়ার টেবিলে ফেরার বদলে যেভাবে উসকে দিয়েছেন, তারা কীভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার পথে হাঁটবে?

অনেক মানুষ এখন মনে করে, জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের নৈতিক পুঁজি দ্রুত ক্ষয়ে গেছে। কারণ শুরুতে আন্দোলনের ভাষা ছিল বৈষম্যহীনতার, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে নতুন ক্ষমতা-নিকটতা। ভাষা ছিল অন্তর্ভুক্তির, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে বাদ দেওয়ার রাজনীতির। ভাষা ছিল দায় ও দরদের, কিন্তু নতুন বন্দোবস্ত এখনও ‘দৃশ্যমানভাবে শক্তিশালী’ হয়ে ওঠেনি, বরং নানা ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘লোক দেখানো’ রাজনীতি দেখা গেছে। ‘নতুন বন্দোবস্ত’ ছিল অভ্যুত্থান-পরবর্তী সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনও পরিষ্কারভাবে জানে না, এই নতুন বন্দোবস্ত আসলে কী। এটি কি কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত? এটি কি কৃষকের ন্যায্য মূল্যের বন্দোবস্ত? এটি কি নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার বন্দোবস্ত? এটি কি সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তার বন্দোবস্ত? এটি কি মব-সহিংসতা থেকে মুক্তির বন্দোবস্ত? নাকি এটি কেবল সংবিধান, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বিন্যাস নিয়ে এলিট মহলের বিতর্ক?

গণঅভ্যুত্থানের পর একটি সমাজে অস্থিরতা থাকতেই পারে। কিন্তু অস্থিরতা আর অবাধ্যতা এক জিনিস নয়। পরিবর্তনের নামে যদি মব-সংস্কৃতি তৈরি হয়, যদি কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, যদি রাজনৈতিক বিরোধিতাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়, যদি নাগরিক অধিকার দলীয় পরিচয় দেখে মাপা হয়, তাহলে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি দুর্বল হয়ে পড়ে।  যে আন্দোলন মানুষকে মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার পরবর্তী সময়ে যদি মানুষ নিজের মত, পরিচয়, পোশাক, রাজনৈতিক অবস্থান বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়ের মধ্যে থাকে, তাহলে সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।

ইতিহাসে অনেক গণআন্দোলন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ হয়, কারণ তারা শুধু শাসক পতন ঘটায়নি, বরং জনগণের অংশীদারিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। নেপালের ২০০৬ সালের গণআন্দোলন রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন শক্তিকে একত্র করেছিল; পরবর্তী সময়ে নেপাল রাজতন্ত্র থেকে ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের পথে যায় এবং ২০১৫ সালের সংবিধানে ফেডারেলিজম, ধর্মনিরপেক্ষতা, অন্তর্ভুক্তি ও ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুতি স্থান পায়। নেপাল নিখুঁত হয়নি, কিন্তু আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রকাঠামোয় জায়গা পেয়েছিল।

তিউনিসিয়ার ২০১১ সালের বিপ্লবও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বেন আলীর পতনের পর সেখানে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, শ্রমিক সংগঠন এবং বিভিন্ন মতাদর্শী শক্তির মধ্যে সংলাপের প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছিল; তিউনিসিয়ান ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট বহুত্ববাদী গণতন্ত্র নির্মাণে ভূমিকার জন্য ২০১৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পায়। তিউনিসিয়ার গণতান্ত্রিক যাত্রা পরবর্তী সময়ে সংকটে পড়েছে, কিন্তু প্রাথমিক সাফল্যের কারণ ছিল আন্দোলনের ফলাফলকে একক কোনও গোষ্ঠী পুরোপুরি দখল করতে পারেনি।

শ্রীলঙ্কার আরাগালয়া আন্দোলন আবার সতর্কবার্তা। ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, জ্বালানি-খাদ্য-ওষুধ সংকট এবং রাজাপাকসে পরিবারের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণ রাস্তায় নামে; আন্দোলনের ফলে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে পদত্যাগ করেন। কিন্তু পরে ‘ফ্রিডম হাউস’ মূল্যায়ন করে যে, আন্দোলন ‘সিস্টেম-ওয়াইড চেঞ্জ’ চাইলেও পরবর্তী সরকার গণতান্ত্রিক স্থিতি, নির্বাচন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। অর্থাৎ শাসক পতন এক জিনিস, ব্যবস্থা পরিবর্তন আরেক জিনিস।

বাংলাদেশও আজ সেই পরীক্ষার মুখে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান শাসক পতনের ইতিহাস তৈরি করেছে, কিন্তু বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের দিকে দৃশ্যমান যাত্রা কি তৈরি করেছে? যদি ছাত্র নেতৃত্ব জনগণের প্রতিনিধি না হয়ে নিজেরাই রাজনৈতিক ক্ষমতার দাবিদার হয়ে ওঠে, যদি অন্তর্বর্তী বা পরবর্তী সরকার সংস্কারের বদলে ক্ষমতা ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত থাকে, যদি নতুন রাজনৈতিক শক্তি জনতার কণ্ঠ না হয়ে নতুন এলিটে পরিণত হয়, তাহলে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হবেই। আজ জনপরিসরে ২৪-এর ছাত্র নেতৃত্বের প্রতি যে সমর্থনহীনতা বা আস্থাহীনতার কথা শোনা যায়, সেটি গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থান নয়। বরং সেটি গণঅভ্যুত্থানের নামে তৈরি হওয়া নতুন ক্ষমতার অহংকারের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া। মানুষ বলছে, আমরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, কিন্তু পেয়েছি নতুন ক্ষমতার বৃত্ত। আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র চেয়েছিলাম, কিন্তু দেখছি আন্দোলনের মালিকানা সীমিত হয়েছে। আমরা মর্যাদা চেয়েছিলাম, কিন্তু দেখছি মব-ভয়, তকমা আর রাজনৈতিক দখলদারি।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, শহীদের স্মৃতির ওপর মানুষের শ্রদ্ধা থাকলেও সেই স্মৃতির উত্তরাধিকার দাবি করা নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমেছে। আন্দোলনের সময় যারা নৈতিক সাহসের প্রতীক ছিল, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ, ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা, অপরিণত বক্তব্য বা রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অভিযোগ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারেনি। ফলে মানুষ আন্দোলনকে নয়, আন্দোলনের উত্তরসূরিদের প্রশ্ন করছে।

৫ আগস্টের দুই বছরপূর্তিতে তাই আত্মতুষ্টির বদলে আত্মসমালোচনা দরকার। এই দিনকে শুধু কিছু মানুষের উদযাপনের দিন হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির দিনও। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের যে স্বপ্নে ছাত্র, তরুণ, কৃষক, শ্রমিক, গৃহিণী, নারী, সংখ্যালঘু, ধর্মপ্রাণ ও ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ এক হয়েছিল, সেই স্বপ্ন এখনো পূর্ণ হয়নি। ইতিহাস ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে জনগণের সাহসের অধ্যায় হিসেবে মনে রাখবে। কিন্তু ইতিহাস একই সঙ্গে এটিও জিজ্ঞেস করবে, সেই সাহসের ফল কে ভোগ করল? জনগণ, নাকি নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র? ৫ আগস্টের প্রকৃত মর্যাদা তখনই রক্ষা পাবে, যখন এই অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার কোনও ছাত্রনেতা, কোনো সরকার, কোনও দল বা কোনও গোষ্ঠীর সম্পত্তি থাকবে না; বরং তা ফিরবে সেই জনগণের কাছে, যারা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নে রাস্তায় নেমেছিল।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লেস্টার, যুক্তরাজ্য

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিয়ের পর ক্লাবে বিশেষ সংবর্ধনা পেলেন রোনালদো
বিয়ের পর ক্লাবে বিশেষ সংবর্ধনা পেলেন রোনালদো
নির্মাণাধীন টানেল ধসে নিহত ৭, এখনও আটকা ১ শ্রমিক
নির্মাণাধীন টানেল ধসে নিহত ৭, এখনও আটকা ১ শ্রমিক
বর্ষায় বন্ধ দুধসাগর জলপ্রপাত, কবে খুলবে ও কীভাবে যাবেন
বর্ষায় বন্ধ দুধসাগর জলপ্রপাত, কবে খুলবে ও কীভাবে যাবেন
ছেলে চিকিৎসক, মেয়ে নার্স: ৫৪ বছরে এসএসসি পাস করলেন বাবা
ছেলে চিকিৎসক, মেয়ে নার্স: ৫৪ বছরে এসএসসি পাস করলেন বাবা
সর্বশেষসর্বাধিক