‘নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস’-এর আলোকে মানবিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক

একটি রাষ্ট্র কতটা, গণতান্ত্রিক ও মানবিক; তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে ক্ষমতাহীন মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা থেকে। কারাগারে থাকা মানুষরা সেই ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠীরই অংশ। আদালতের আদেশে তারা স্বাধীনতা হারিয়েছেন, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাদের মর্যাদা, জীবন, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার হারাননি। তাই একটি আধুনিক রাষ্ট্রে কারাগার কখনো প্রতিশোধের স্থান হতে পারে না; বরং এটি হতে হবে আইনের শাসন, মানবিকতা এবং পুনর্বাসনের একটি প্রতিষ্ঠান। এই দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো জাতিসংঘের ‘নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস’।  

২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ রেজুলেশন ৭০/১৭৫-এর মাধ্যমে বন্দিদের প্রতি আচরণের জন্য জাতিসংঘের ন্যূনতম মানদণ্ড (ইউনাইটেড ন্যাশনস স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলস ফর দ্য ট্রিটম্যান্ট অব প্রিজনার্স) গ্রহণ করে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এর নামকরণ করে নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস। প্রায় ২৭ বছর কারাবন্দি থেকেও যিনি প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার, পুনর্মিলন ও মানবিকতার পথ বেছে নিয়েছিলেন, তার নামেই এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নামকরণ নিছক প্রতীকী নয়; বরং এটি রাষ্ট্র গুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়, কারাগারের দেয়ালের ভেতরেও মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।

নেলসন ম্যান্ডেলা রুলসের মূল দর্শন অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা সীমিত করা আদালতের দেওয়া শাস্তি হতে পারে, কিন্তু তাকে নির্যাতন করা, অমানবিক পরিবেশে রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা কিংবা তার মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা কখনোই শাস্তির অংশ হতে পারে না। বন্দিরা তাদের স্বাধীনতা হারান, কিন্তু তাদের মানবাধিকার হারান না। রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাদের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

বাংলাদেশের সংবিধানও এই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে, ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা এবং ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ বা দণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি (আইসিসিপিআর) এর সদস্য রাষ্ট্র। ফলে কারাগারে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীন রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।

বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। এরমধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, বন্দিদের জন্য দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি, বিচারাধীন বন্দির উচ্চ হার, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব, নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী বন্দিদের বিশেষ চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা এখনো বড়  চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশে কারাগারে থাকা অধিকাংশ মানুষই বিচারাধীন; অর্থাৎ তারা এখনও আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হননি। তাই তাদের মানবিক মর্যাদা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের আইনি দায়িত্ব নয়; এটি ন্যায়বিচারেরও অপরিহার্য শর্ত। বিচারাধীন অবস্থায় কোনো ব্যক্তি যেন অবহেলা, অমানবিক পরিবেশ বা চিকিৎসার অভাবের কারণে অতিরিক্ত শাস্তির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করাই একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। এতে বলা হয়েছে, প্রত্যেক বন্দির জন্য এমন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, যা সমাজের অন্য নাগরিকদের জন্য বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার সমমানের। কারা স্বাস্থ্যব্যবস্থা জাতীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত থাকবে; গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিকে প্রয়োজন হলে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠাতে হবে; মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে; নারী বন্দি, শিশু এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে নির্যাতন এবং যেকোনো ধরনের নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশে সময়ে সময়ে কারাগারে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। প্রতিটি ঘটনার কারণ এক নয়। কোথাও দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, কোথাও চিকিৎসাজনিত জটিলতা, আবার কোথাও অবহেলা বা নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে। কিন্তু যেকোনো পরিস্থিতিতেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব একই-প্রতিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে অনুসন্ধান করা, প্রয়োজন হলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করা এবং তদন্তের ফলাফল জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা। জবাবদিহি নিশ্চিত হলেই কেবল জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হয়।

নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস কারাগারকে শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে না; এটি পুনর্বাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করে। অধিকাংশ বন্দিই একদিন সমাজে ফিরে আসবেন। তাই শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, বই পড়ার সুযোগ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থা করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হলে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি। ঔপনিবেশিক আমলের কারাগার আইন, ১৮৯৪-এর পরিবর্তে মানবাধিকারভিত্তিক একটি আধুনিক কারা আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা কমাতে দ্রুত বিচার, জামিনের কার্যকর ব্যবহার এবং বিকল্প শাস্তির পরিধি বাড়াতে হবে। কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও সমাজকর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন ও নিয়মিত পরিদর্শন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বন্দিদের মানবিক মর্যাদা রক্ষার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বহন করে। সে কারণে নেলসন ম্যান্ডেলা রুলসে প্রতিফলিত নীতিমালা কেবল একটি আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা নয়; বরং বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থাকে আরও মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক করে গড়ে তোলার একটি কার্যকর মানদণ্ড।  এর মাধ্যমে কারাগার, থানা, ডিবি কার্যালয়সহ রাষ্ট্রীয় হেফাজতের সব স্থান নিয়মিত স্বাধীনভাবে পরিদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা নির্যাতন, অমানবিক আচরণ এবং হেফাজতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস আমাদের শেখায়, কারাবন্দি ব্যক্তি রাষ্ট্রের শত্রু নন; তিনি রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা একজন মানুষ। তাই তার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব। আইন তার নিজস্ব পথে চলবে, আদালত বিচার করবে; কিন্তু কারাগারের দেয়ালের ভেতরে একজন মানুষের মানবিক মর্যাদা যেন কখনো ক্ষুণ্ণ  না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই একটি সভ্য ও আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয়। মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি বাস্তব পথনির্দেশ।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী