মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত অন্তত পাঁচজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছেন। এর মধ্যে দুইজন যৌথ বাহিনীর হেফাজতে, দুইজন ডিবি পুলিশের হেফাজতে এবং একজন থানা হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে বগুড়ায় ডিবি হেফাজতে আসাদুজ্জামান আসাদ নামে এক তরুণের মৃত্যু এবং এর কয়েক দিন আগে ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে মীর্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত নামে আরেক তরুণের মৃত্যুর ঘটনা জনমনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। উভয় ঘটনার পর ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে বক্তব্য গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু কেবল ঘটনার ব্যাখ্যা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর অভিযোগ প্রতিরোধে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বা নেওয়া হবে, তা জানার অধিকার দেশের সাধারণ নাগরিকের রয়েছে। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই প্রশ্ন অযৌক্তিক নয়, বরং অত্যন্ত স্বাভাবিক।
রাষ্ট্রের কাছে কোনও ব্যক্তি গ্রেফতার হওয়ার পর তার জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কারণ তখন তিনি আর নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অবস্থায় থাকেন না। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু কখনোই একটি স্বাভাবিক ঘটনা নয়, বরং এটি আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির একটি কঠিন পরীক্ষা। হেফাজতে প্রতিটি মৃত্যু রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—রাষ্ট্র কি তার হেফাজতে থাকা একজন মানুষের জীবন রক্ষার সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী কোনও ব্যক্তিকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। একইসঙ্গে ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ ও দণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু কেবল একটি ফৌজদারি তদন্তের বিষয় নয়—এটি সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
এই কারণেই বাংলাদেশ নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছিল। আইনটি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখে। আইনটির মূল দর্শন ছিল—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা, দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনটির কার্যকর প্রয়োগ এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এখনও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও রাষ্ট্রের ওপর একই ধরনের দায়িত্ব আরোপ করেছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তি (আইসিসিপিআর)-এর সদস্য রাষ্ট্র। এই চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ জীবনের অধিকার এবং ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ নির্যাতনের নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করেছে। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এর ৩ ও ৫ নম্বর অনুচ্ছেদেও একই নীতি প্রতিফলিত হয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস অনুযায়ী হেফাজতে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় হেফাজতে কোনও অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে দ্রুত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত পরিচালনা করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্বীকৃত বাধ্যবাধকতা।
হেফাজতে প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। যদি বলা হয়, কোনও ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তাহলে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কিনা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল কিনা এবং কোনও অবহেলা ছিল কিনা—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। আবার যদি আত্মহত্যার দাবি করা হয়, তাহলে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত হেফাজতে এমন ঘটনা কীভাবে সম্ভব হলো, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ঘাটতি ছিল কিনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন কিনা, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়। এসব প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর ছাড়া জনআস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়।
হেফাজতে মৃত্যু প্রতিরোধে এখন প্রয়োজন কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। গ্রেফতারের পর বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, হেফাজতে নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ, জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ ও হাজতখানায় কার্যকর সিসিটিভি নজরদারি, আইনজীবী ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। সেই আস্থা কেবল অপরাধ দমনের মাধ্যমে নয়— আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, মানবাধিকার সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই প্রতিটি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় সত্য উদঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনই ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অভিযোগ আর না ওঠে, সে জন্য দৃশ্যমান ও কার্যকর সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাষ্ট্রের শক্তির প্রকৃত পরিচয় বলপ্রয়োগে নয়, বরং আইনের প্রতি তার আনুগত্যে। রাষ্ট্রের হেফাজতে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা কোনও অনুগ্রহ নয়— এটি সংবিধান, আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব। তাই প্রতিটি হেফাজতে মৃত্যু আমাদের কাছে একটিই বার্তা দেয়-জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, সত্য উদঘাটন করতে হবে এবং এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে হেফাজতে থাকা কোনও মানুষের জীবন নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন না ওঠে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী
