সুশাসন কোথায়, চারদিকে কেবলই অনিশ্চয়তা

গেলো বৃহস্পতিবার ঘুম ভাঙলো গরমে অস্থির হয়ে। কারণ কী? ফ্যান চলছে না। বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের এই বাসায় জেনারেটর চলে। তবে আমাদের আবার প্রি-পেইড মিটার। টাকা বাকি পড়লেই বিদ্যুৎ কেটে দেয়। আগে ডিপিডিসি থেকে মেসেজ পাঠাতো—অনেকটা ওয়ার্নিং মেসেজ বলা যায়। মোটামুটি বিল মাইনাস হওয়ার আগেই জানিয়ে দিতো। এখন কেন জানি সেই মেসেজ আর আসে না। ফলে অনেক সময় বিল দিতে দেরি হয়ে যায়।

আর এক টাকাও যদি মাইনাস দেখায়, সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ বন্ধ। এরপর আপনি বিল দেবেন। ঘণ্টাদুয়েক অপেক্ষা করবেন। তারপর বিদ্যুৎ আসবে। সেদিন বিদ্যুৎ চলে গেল। চেক করে দেখলাম, এখনও টাকা জমা আছে। ফোন দিলাম বাসার কেয়ারটেকারকে। তিনি বললেন, জেনারেটরে তেল নেই। তাই জেনারেটর ছাড়া হয়নি। মানে এখন প্রায় ঘণ্টাখানেক বিদ্যুৎ থাকবে না।

রান্নাঘরে গেলাম। চুলা জ্বালালাম। চুলায় যে আগুন, এই আগুনে একটা রুটি সেঁকা তো দূরের কথা, বাসনের তলা গরম হতেও ঘণ্টাখানেক লেগে যাবে। আমাদের বাসায় গ্যাসের এই অবস্থা মোটামুটি দুই বছর ধরেই। সকালে গ্যাস থাকে না। কিছুটা আসে দুপুরে।

সন্ধ্যায় আবার থাকে না। রাতে আবার আসে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তাই আমরা ইনডাকশন চুলা ব্যবহার করি। কিন্তু সেদিন তো বিদ্যুৎই নেই। সুতরাং, ইনডাকশনও চলবে না। তাহলে এখন কী করবো? নাস্তা করবো কীভাবে?

প্রশ্নটা ছোট। কিন্তু এই ছোট প্রশ্নের মধ্যেই এখন আমাদের বেশিরভাগ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের বড় একটা সংকট লুকিয়ে আছে। গ্যাস নেই। বিদ্যুৎ নেই। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। সেই অনুপাতে আয় বাড়ছে না। ফলে রান্নাঘরের একটা সাধারণ সকালের নাস্তাও কখনও কখনও একটা বড় হিসাবের বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

হুট করে বাইরে গিয়ে রেস্টুরেন্টে খেয়ে আসবেন? সেটাও সহজ নয়। একবেলা রেস্টুরেন্টে চারজনের খাবারের যে টাকা লাগে, সেই টাকায় অনেক পরিবারের কয়েক দিনের বাজার হয়ে যায়। নিম্ন আয়ের মানুষের কথা না হয় বাদই দিলাম। একটা কলা, একটা পাউরুটি—এগুলোও এখন হিসাব করে কিনতে হয়। একটা সাগর কলা কিনতেও এখন ১২ থেকে ১৫ টাকা গুনতে হয়।

মধ্যবিত্তের অবস্থাটা ধীরে ধীরে এমন জায়গায় যাচ্ছে, যেখানে প্রয়োজন আর সামর্থ্যের মধ্যে দূরত্বটা বেড়েই চলেছে। অথচ বিল দিতে হচ্ছে ঠিকই। গ্যাসের বিল দিতে হচ্ছে। বিদ্যুতের বিল দিতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকলে ইন্ডাকশন চালাতে বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটরের জন্য বাড়তি খরচ। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার কিনলে তার আলাদা খরচ। অর্থাৎ আপনি কোনোভাবেই খরচ কমাতে পারবেন না। একটা না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা করতে গেলে বরং খরচ আরও বাড়বে।

আর সেটা এই আপনাকেই বহন করতে হবে। এটা কিন্তু শুধু একটা পরিবারের সমস্যা নয়। জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু রান্নাঘরে নয়, কারখানা পর্যন্ত পৌঁছেছে। গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত বা কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গ্যাসের ঘাটতির বড় প্রভাব পড়েছে।

এর মানে হলো, সমস্যাটা শুধু বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার নয়। ফ্যান বন্ধ থাকার নয়। সমস্যাটা মানুষের জীবনযাত্রার। সমস্যাটা অর্থনীতির। সমস্যাটা মানসিক চাপের। কারণ একজন মানুষ যখন প্রতিদিন হিসাব করতে বসেন—আজ গ্যাস পাবো তো? কখন পাবো? রান্না কখন করবো? বিদ্যুৎ থাকবে তো? বিদ্যুৎ না থাকলে, ফ্রিজের রাখা খাবার নষ্ট হবে না তো? সন্তানের পড়াশোনা কখন হবে? মাসের শেষে বাজারের টাকা থাকবে তো? তখন সংকটটা শুধু জ্বালানি সংকটে থাকে না। তা ধীরে ধীরে জীবনযাপনের সংকটে পরিণত হয়।

এসব ছাড়াও বাড়ছে বাজার খরচ। চাল, ডাল, তেল, ডিম কিংবা সবজি—এমন কোনও নিত্যপণ্য নেই, যার গায়ে ‘আগুন’ লাগেনি। কিন্তু বাজারের এই চড়া দামের বিপরীতে মধ্যবিত্তের আয় কি সেই অনুপাতে বেড়েছে? অনেকেই ১০-১৫ বছর ধরে একই চাকরি করছেন। বেতন বাড়ছে না। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর ইনক্রিমেন্ট হয় না। পাঁচ-সাত বছর পর একবার হয়তো কিছুটা বেতন বাড়ে। কোথাও মূল বেতনের দুই শতাংশ, কোথাও পাঁচ শতাংশ।

এর মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লো। এখন বাসা ভাড়া আবারও বাড়বে। জেনারেটর চালানোর অজুহাতে সার্ভিস চার্জ বাড়বে। বাজারে তো আগে থেকেই আগুন। এখন সেটা আরও বাড়বে। সন্তানের পড়াশোনার খরচ বাড়বে। চিকিৎসার ব্যয় বাড়বে। এমনকি রিকশা- সিএনজি ভাড়াও বাড়বে। এর মধ্যে যদি গ্যাস-বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবার সংকট দেখা দেয়, তাহলে খরচের লিস্টে বিকল্প ব্যবস্থার খরচও যোগ হবে। সঞ্চয় তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই দায়!

আচ্ছা, আমরা সাধারণ নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রকে কী দেই? আমরা প্রতিবছর আমাদের আয় থেকে কর দেই। বিদ্যুতের বিল দেই। গ্যাসের বিল দেই। পানি ও অন্যান্য সেবার বিল দেই। বাজারে গিয়ে প্রতিটি পণ্যের দামের মধ্যেও নানা ধরনের কর ও শুল্কের অংশ পরিশোধ করি। বিনিময়ে আমরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কী চাই? রান্নার জন্য নিয়মিত গ্যাস, বিদ্যুৎ। নিরাপদ পানি। মোটামুটি চলার মতো রাস্তাঘাট (উন্নয়নের নামে মাসের পর মাস ধরে কাটা রাস্তা নয়)। স্বাভাবিক গণপরিবহন। আর নিরাপত্তা। খুব বেশি কিছু কি?

কিন্তু বাস্তবতা কী? রাষ্ট্র আমাদের কী দেয়? বিদ্যুৎ নেই—জেনারেটর চালাতে হবে। গ্যাস নেই—ইনডাকশন বা সিলিন্ডার কিনতে হবে। বর্ষাকালে ঘণ্টাখানেক বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট ডুবে যাবে। আর তখন রিকশা, সিএনজি—সবকিছুর ভাড়া বেড়ে যাবে। জিনিসপত্রের দাম বেশি—বাজারের খরচ বাড়াতে হবে।

আবার সংসারের সব সংকট সামলে আপনি যদি খুব কষ্ট করে কিছু টাকা জমিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনেন— সেখানে ট্যাক্স কাটা হবে। আগে অন্তত এই খাত থেকে ট্যাক্স কাটা হতো না। বা হলেও কম কাটা হতো। অথচ বেশিরভাগ বয়স্ক মানুষ তাদের পেনশনের টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে, সেই ইন্টারেস্ট দিয়ে সংসার চালাতো। এখন সেটাও সম্ভব হয় না। ব্যাংকে রাখলেও হাজারটা সার্ভিস চার্জ আর ট্যাক্স কাটা যাবে। আবার কোনও কোনও বেসরকারি ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে— সেই জমানো টাকা আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে শুরু হয় নতুন মানসিক চাপ। জমানো টাকা দিয়ে জমি কিনে রাখবেন, সেটাও বেদখল হওয়ার ভয়।

অথচ আমরা জানি না, ঠিক কবে আমরা নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাবো। আগামী মাসের বাজার কত হবে। চাকরি থাকবে কিনা। ব্যাংকের টাকা রেখে নিশ্চিন্ত থাকবো। বা জমি কিনে বেদখল হওয়ার ভয় থাকবে না। তাই মধ্যবিত্তের সংকটটা শুধু টাকার নয়। অনিশ্চয়তারও। আর এই অনিশ্চয়তা শুধু গ্যাস-বিদ্যুৎ বা বাজারদর নিয়েই নয়, ভবিষ্যত নিয়েও। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী অনার্স ও মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন। এসএসসি ও এইচএসসিতেও ছিল জিপিএ-৫। অর্থাৎ পড়াশোনার জায়গায় তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

এখন তিনি শিক্ষক পদে আবেদন করেছেন। কিন্তু তার ভয়—চাকরিটা কি হবে? কারণ তার কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নেই। কোনও ‘মামা-কাকা’ নেই। কাউকে ধরে চাকরি পাওয়ার মতো প্রভাবও নেই। তো একজন মানুষ যখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারেন না, তখন তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।

আর যখন একটি প্রজন্ম বারবার দেখে— যোগ্যতা থাকলেও নিশ্চয়তা নেই, পরিশ্রম করলেও নিশ্চয়তা নেই, টাকা জমালেও নিশ্চয়তা নেই, নিজের ঘরেও মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা নেই— তখন তারা দেশ, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থা হারাতে শুরু করে। এ কারণেই হয়তো আজকাল তরুণদের সঙ্গে কথা বললে দেখি, তারা কেউ এদেশে থাকতে চায় না। সবাই ভাবছেস কীভাবে দেশ ছাড়া যায়!

প্রশ্ন হলো, এই সংকটগুলো কি আকস্মিক? নাকি বছরের পর বছর জমা হওয়া পরিকল্পিত ব্যর্থতা?

লেখক: সাইকোলজিস্ট