বদলে গেছে শিক্ষার্থীর মন

সুলতানা স্বাতী
১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০

আমি যে বছর এসএসসি পরীক্ষা দিই, কয়েকটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। পরে ওই পরীক্ষাগুলো আবার দিতে হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষা কঠিন হয়েছিল। তখন ৫০ নম্বর নৈর্ব্যক্তিক আর ৫০ নম্বর ছিল রচনামূলক পরীক্ষার জন্য। আমাদের সময়ে নৈর্ব্যক্তিকের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। ফলে পড়তে হতো পুরো বই। আমি ছিলাম আর্টসের ছাত্রী। নৈর্ব্যক্তিকের কারণেই সম্ভবত টেস্টে ইতিহাসে ফেল করেছিলাম। কী লজ্জার ব্যাপার!

আমার বাবা-মা দুজনেই শিক্ষক। পরে এসএসসির রেজাল্টে দেখা গেল, ইতিহাসে লেটার এসেছে। তখন লেটার মানে কোনো বিষয়ে ন্যূনতম ৮০ নম্বর পাওয়া। এর জন্য অবশ্য প্রচুর পড়তে হয়েছিল। পুরো ইতিহাস বই মুখস্থ করতে হয়েছিল। ইতিহাসে সাধারণত কী হয়? সাল আর নামগুলো মনে থাকে না। তাই আমাকে একেবারে লাইন বাই লাইন পড়তে হয়েছিল।

ঘটনাটির উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নরসিংদীর নাসিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এই স্কুলের ৩৮২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালেও স্কুলটির ৩২০ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছিল।

আলোচনা বা সমালোচনা হচ্ছে এই কারণে যে, স্কুলটিতে টেস্ট পরীক্ষায় যারা জিপিএ-৫ পায়নি, তাদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। যারা টেস্টে ভালো ফল করেছে, কেবল তারাই ওই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পেরেছে। বাকিদের অন্য স্কুল থেকে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে অনেকে এটাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করছেন। তাদের যুক্তি, এই স্কুলে যারা পড়বে, তারা বিষয়টি মাথায় রেখে শুরু থেকেই ভালো করে পড়বে। এই নীতিকে শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পড়াশোনা করানোর একটি কৌশল হিসেবেও দেখছেন তারা।

কিন্তু কথা হচ্ছে, সবার মেধা তো আর এক নয়। সবাইকে জিপিএ-৫ পেতেই হবে, এমনও নয়। তাহলে যারা টেস্টে জিপিএ-৫ পায়নি, তারা কেন এই স্কুল থেকে পরীক্ষা দিতে পারবে না? তারা তো দুই বছর বা অনেকে আরও আগে থেকে এই স্কুলে পড়ছে। এটাকে এই স্কুলের শতভাগ জিপিএ-৫ ধরে রাখার অপকৌশল বা বাণিজ্যিক স্বার্থ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

প্রশ্ন আসে, একটা স্কুল থেকে কেন সবাইকে জিপিএ-৫ পেতে হবে? এতে স্কুলের কী লাভ? পুরোটাই কি বাণিজ্য? নাকি আসলেই তারা ভালো শিক্ষার্থী বানানোর কারিগর? স্কুলের দায়িত্ব কি ভালো শিক্ষার্থী বানানো, নাকি ভালো মানুষ বানানো? যেসব শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায় না, তারা কি জীবনে ভালো কিছু করতে পারবে না? মনোবিজ্ঞান অবশ্য এমন কথা বলে না।

একটি পরীক্ষার ফলাফল একজন মানুষের মেধা, সম্ভাবনা কিংবা ভবিষ্যৎ সাফল্যকে পুরোপুরি নির্ধারণ করতে পারে না। একেকজন মানুষ একেকটি বিষয়ে ভালো করতে পারে। কেউ গণিতে ভালো, কেউ ভাষায়, কেউ সংগঠনে, কেউ সৃজনশীল কাজে, কেউ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে, কেউ আবার সমস্যার সমাধানে অসাধারণ।

সবাইকে জিপিএ-৫ পেতেই হবে কেন? যার যে দিকে আগ্রহ, তাকে সেদিকে ফোকাসড করা, বাবা-মায়ের পাশাপাশি কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব নয়? অথচ আমরা সন্তানকে শুধু ভালো করতে বলি না; আমরা চাই সে অন্যদের চেয়ে ভালো করুক। সন্তানের ফলাফল অনেক সময় বাবা-মায়ের সামাজিক মর্যাদার অংশ হয়ে যায়। প্রতিবেশীর ছেলে জিপিএ-৫ পেয়েছে, আত্মীয়ের মেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, তাহলে নিজের সন্তান কেন পারছে না?

এই চাপ শুধু শিক্ষার্থীর ওপর নয়, অভিভাবকের ওপরও আছে। অনেক বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের ভালো ফল যেন নিজের সামাজিক সাফল্যেরও প্রমাণ। ফলে শিক্ষা হয়ে ওঠে এক ধরনের প্রতিযোগিতা। আর এই প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় জিপিএ-৫ পাওয়াটাকেই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি বানিয়ে ফেলা হয়েছে। অথচ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যারা সফল হয়েছেন, তাদের সবাই কি পরীক্ষার খাতায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন? প্রকৃত শিক্ষা কি শুধুই পরীক্ষার খাতায় বেশি নম্বর পাওয়া? নাকি মেধা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও মানবিক গুণের বিকাশ ঘটানো? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কি শিক্ষার্থীদের এ প্লাস পাওয়ানো? নাকি তাদের ভালো, সহনশীল ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা?

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একজন শিক্ষার্থীর ওপর অতিরিক্ত ফলাফল-কেন্দ্রিক চাপ তার আত্মমূল্যায়নকে প্রভাবিত করতে পারে। যখন একটি শিশু বারবার শুনতে থাকে যে সর্বোচ্চ নম্বর না পেলে সে যথেষ্ট ভালো নয়, তখন তার মধ্যে ব্যর্থতার ভয়, হীনম্মন্যতা কিংবা নিজের সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।

এর সঙ্গে আজকের শিক্ষার্থীর সামনে আছে মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেম, রিলস, শর্টস ভিডিওসহ তাৎক্ষণিক বিনোদনের হাতছানি। সেই তাৎক্ষণিক আনন্দকে উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ার বই নিয়ে বসে থাকা তার কাছে কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীর মনোযোগ ধরে রাখাই এখন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

তার ওপর কয়েক বছর ধরে পরীক্ষা ব্যবস্থাও নানা অস্বাভাবিকতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। আগের জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে এইচএসসির ফল তৈরি করা হয়। পরের বছর, ২০২১ সালে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হলেও তা স্বাভাবিক পরীক্ষার মতো ছিল না। সীমিত বিষয়ে, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০২২ সালেও কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হয়।

অর্থাৎ ২০২০ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে স্কুল বন্ধ থাকা, অনলাইন বা অসম্পূর্ণ শিক্ষার মধ্যে। এরপর তারা ফিরেছে পরিবর্তিত সিলেবাস ও পরিবর্তিত পরীক্ষা ব্যবস্থায়। এই দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা তাদের পড়াশোনার অভ্যাস, মনোযোগ এবং পরীক্ষাকে দেখার মানসিকতায় কতটা প্রভাব ফেলেছে, আমরা কি কখনো তা গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছি?

এরপর ২০২৪ সালে আবারও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। আন্দোলন ও সহিংসতার কারণে কয়েক দফা পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত বাকি পরীক্ষাগুলো বাতিল করা হয় এবং বিকল্প পদ্ধতিতে ফল প্রকাশ করা হয়। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে একের পর এক এমন অভিজ্ঞতা কি পরীক্ষার প্রতি তার মনোভাব বদলে দিতে পারে না? 

আমাদের সময় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। পরীক্ষা আবার দিতে হয়েছিল। পরীক্ষা কঠিন হয়েছিল। কিন্তু আমরা পরীক্ষা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজিনি। বরং আবার বই খুলে বসেছিলাম।আর এখনকার শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে কি পরীক্ষা থেকে পালানোর মানসিকতা তৈরি হয়নি? কঠিন পরীক্ষা মানেই পরীক্ষা বাতিলের দাবি, পরীক্ষার চাপ মানেই সিলেবাস কমানোর দাবি, প্রস্তুতি কম হলে পরীক্ষার নিয়ম বদলে দেওয়ার প্রত্যাশা, এসব কি ধীরে ধীরে তাদের পরিশ্রম, অপেক্ষা এবং ব্যর্থতা মোকাবিলার ক্ষমতাকে দুর্বল করছে?

অবশ্যই সব শিক্ষার্থী এমন নয়। দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক উদ্বেগ থাকতে পারে। অন্যায্য প্রশ্নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও ন্যায্য হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের এটাও ভাবতে হবে, একটি প্রজন্ম যদি বারবার দেখে যে কঠিন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা পদ্ধতিই বদলে যেতে পারে, তাহলে পরীক্ষার প্রতি তার মানসিক ধারণাটিও কি বদলাবে না?

২০২৫ সাল থেকে ফলাফলের দিকে তাকালেও একটি পরিবর্তন চোখে পড়ে। ২০২৪ সালের অস্বাভাবিক উচ্চ পাসের হারের পর ২০২৫ সালে এসএসসিতে গড় পাসের হার নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে। ২০২৬ সালে তা আরও কমে হয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। এই কমে যাওয়া কি শুধু শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে না বলে? নাকি এর পেছনে আছে কয়েক বছরের শিক্ষা-বিচ্ছিন্নতা, পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন, পড়াশোনার অভ্যাসের পরিবর্তন, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ফলাফল-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা, সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব?

এর ফলে আজকের শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশের কি পরীক্ষাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে না? এই কয়েক বছরে কি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকে দেখার মানসিকতাই বদলে যায়নি? এই জায়গাটিতেই হয়তো আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীদের মন বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে শিক্ষার পরিবেশও। একদিকে জিপিএ-৫-এর প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক আনন্দ, তার সঙ্গে কয়েক বছরের অস্বাভাবিক পরীক্ষা ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সামনে তৈরি হয়েছে এক সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতা।

এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে, আমরা কি শুধুই জিপিএ-৫ তৈরির কারখানা বানাব, নাকি আমাদের সন্তানদের মুক্তচিন্তা, সৃজনশীলতা ও সুস্থ মানসিকতায় বড় হওয়ার মানবিক পরিবেশ গড়ে দেবো? আমরা যদি জিপিএ-৫-এর মোহ থেকে বের হতে না পারি এবং শিক্ষাকে ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলি, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা হয়তো জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক সনদধারী পাব। কিন্তু নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ কি পাবো?

লেখক: সাইকোলজিস্ট

/ইউএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এক মহাসড়কে বসেছে ১৪২৭ ক্যামেরা, ভুল করলেই অটো জরিমানা
এক মহাসড়কে বসেছে ১৪২৭ ক্যামেরা, ভুল করলেই অটো জরিমানা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে রিটের আদেশ আজ 
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে রিটের আদেশ আজ 
ভগত সিং-আম্বেদকরকেও ‘দিমাগি নকশাল’ বলতেন মোদি: কেজরিওয়াল
ভগত সিং-আম্বেদকরকেও ‘দিমাগি নকশাল’ বলতেন মোদি: কেজরিওয়াল
বর্ষায় ডুয়ার্স ভ্রমণ, জঙ্গল বন্ধ হলেও প্রকৃতির দরজা খোলা
বর্ষায় ডুয়ার্স ভ্রমণ, জঙ্গল বন্ধ হলেও প্রকৃতির দরজা খোলা
সর্বশেষসর্বাধিক