রোহিঙ্গারা খিচুড়ি খেতে পারতেন না। খিচুড়ি যে একটা খাবার—এটাই তারা বুঝতেন না।
২০১৭ সাল। ২৫ আগস্ট থেকেই বন্যার ঢলের মতো তারা এদেশে আসতে শুরু করেন। দীর্ঘ যাত্রায় তারা ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। নিজের সব কিছু হারিয়ে তারা বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত।
ভেবে দেখুন, এপারে বাংলাদেশের কক্সবাজার। ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। মাঝখানে নাফ নদী।
নৌকায় করে, পায়ে হেঁটে, কখনও নদী সাঁতরে— শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে রোহিঙ্গারা আসছেন। পেছনে ফেলে আসছেন তাদের প্রিয় জন্মভূমি। যেখানে তাদের জন্ম, শৈশব- কৈশোর, বেড়ে ওঠা। কারও সেখানে বিবাহিত জীবনের শুরু, কারও প্রায় সারা জীবনের স্মৃতি।
সঙ্গে করে প্রায় কিছুই আনতে পারেননি। কারও কোলে বাচ্চা। কারও হাতে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র। কারও হাতে একটি মেকআপ বক্স। কেউ আবার সঙ্গে এনেছেন স্রেফ এক কৌটা মরিচের গুঁড়া। রোহিঙ্গা নারীরা সাজতে ভালোবাসতেন। তারা ঝাল খেতে পছন্দ করেন।
কেউ এসেছেন সপরিবারে। কেউ এসেছেন পরিবারের সবাইকে হারিয়ে। আছেন অন্তঃসত্ত্বা নারী, মেয়ে, শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ। কোনও মেয়ে এসেছেন একেবারেই একা। কোনও নারী এসেছেন স্বামীকে ছাড়া। কেউ জানেন না— তার স্বামী বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। কোনও মা এসেছেন ছেলেকে হারিয়ে। কেউ জানেন না, যাকে পেছনে ফেলে এসেছেন, তাকে আর কোনও দিন দেখতে পারবেন কিনা।
নিজের দেশ থেকে এভাবে বিতাড়িত হয়ে আসা শুধু এক জায়গা ছেড়ে আরেক জায়গায় চলে আসা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গভীর এক মানসিক বিপর্যয়। কয়েক দিন আগেও যে মানুষটি নিজের বাড়িতে ঘুমিয়েছেন, নিজের রান্নাঘরে রান্না করেছেন, পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন—হঠাৎ একদিন তাকে সবকিছু ফেলে পালাতে হয়েছে। পেছনে তখন মৃত্যু, আগুন আর ধ্বংসের স্মৃতি।
সামনে সম্পূর্ণ অজানা এক দেশ। সেই দেশের মানুষ কেমন হবে? গ্রহণ করবে? নাকি তাড়িয়ে দেবে? এই প্রশ্নগুলোর কোনও উত্তর না জেনেই হাজার হাজার মানুষ নাফ নদী পেরিয়ে এ দেশে এসেছিলেন। তারা যখন এ দেশে পৌঁছেছেন, তখন শুধু ক্ষুধার্ত বা ক্লান্তই ছিলেন না। ছিলেন আতঙ্কিতও। ভয় ও অনিশ্চয়তার মাঝেই এ দেশে শুরু হয়েছিল রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ অজানা এক নতুন জীবন।
এ দেশে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করার কয়েক দিনের মধ্যেই বেশ কয়েকটি এনজিও সেখানে কাজ শুরু করে। ইউএনএইচসিআর, রেড ক্রিসেন্টসহ আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বহু সংস্থার অবিরাম তৎপরতায় রোহিঙ্গারা মোটামুটি দ্রুতই জরুরি মানবিক সহায়তার আওতায় আসতে শুরু করেন।
তো প্রথমে যখন তারা এ দেশে আসেন, এনজিওগুলোর পক্ষ থেকে তাদের জন্য খিচুড়ির ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ—কেউ এক চামচও তা মুখে দিতে পারেননি। কারণ, তারা এই খাবারের সঙ্গে পরিচিত নন। আগে কখনও খাননি। না খেয়ে থেকেছেন, তবু মুখে নিতে পারেননি।
শয়ে শয়ে প্যাকেট খিচুড়ি নষ্ট হয়েছে। পরে তাদের জন্য মুরগির মাংসের ব্যবস্থা করা হতো। সেটাও তারা খেতেন প্রচুর ঝাল মিশিয়ে। ওই যে সঙ্গে করে নিয়ে আসা কৌটাভর্তি মরিচের গুঁড়া—সেই গুঁড়া মিশিয়ে। বেঁচে তো থাকতে হবে।
ভেবে দেখুন, একেবারে ভিন্ন এক জনগোষ্ঠীর মানুষ এ দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আমরা তাদের ভাষা জানি না, তারাও আমাদের ভাষা জানেন না। তাদের আর আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, চলাফেরা, ওঠাবসা—প্রায় সব কিছুতেই পার্থক্য।
তারা জানেন না এ দেশে কতদিন তাদের থাকতে হবে। আমরাও জানি না তারা কত দিন থাকবেন। প্রথমদিকে অস্থায়ী ক্যাম্পে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হতো। ছোট ছোট জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে হতো। সেখানেই ঘুম, সেখানেই দিনের পর দিন কাটানো। প্রাকৃতিক কর্ম সারার জন্যও ছিল সীমিত ব্যবস্থা।
আর বিপুল সংখ্যক মানুষের এই অস্থায়ী বসতির মধ্যেই তৈরি হচ্ছিল নানা ধরনের ঝুঁকি। কেউ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কোনও নারীর অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া হচ্ছে। কোনও শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
এই সবকিছু সামলে তাদের জন্য মোটামুটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা সহজ কাজ ছিল না।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে আজ অনেক ধরনের কথা বলা হয়। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও অনেক কিছু বলা হয়। কিন্তু সবকিছুর পরও একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক বিপর্যস্ত মানুষকে ছোট্ট একটি এলাকায় আশ্রয় দেওয়াটাও কম বড় সাহসের পরিচয় নয়।
যদিও সেই সিদ্ধান্তের সুরাহা আজও হয়নি। তখন যদি তাদের আশ্রয় দেওয়া না হতো, কী হতো? মিয়ানমারের গুলি খেয়ে, আগুনে পুড়ে কিছু মানুষ মারা যেতেন। কেউ হয়তো সীমান্তে আটকা পড়তেন। কেউ বিভিন্ন পথে ছড়িয়ে পড়তেন। অনেকে অবৈধভাবে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। কেউ হয়তো মানবপাচারকারীদের হাতে পড়তেন। আর অনেকে হয়তো যেভাবেই হোক বাংলাদেশের জনস্রোতে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করতেন।
২০১৭ সালের আগস্টের পর কয়েক মাসেই প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এর আগে থেকেই বাংলাদেশে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি।
ফলে বাংলাদেশের কক্সবাজারে গড়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতিগুলোর একটি।
আর এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে বিপুল সংখ্যক মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ, অবকাঠামো ও সামাজিক জীবনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। পাহাড় কেটে বসতি, বন উজাড়, ভূমিধসের ঝুঁকি, ঘনবসতি, অগ্নিকাণ্ড ও বর্ষার দুর্যোগ—সব মিলিয়ে ক্যাম্পের জীবন নিজেই আরেক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তার ওপর আবার খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল এই জনগোষ্ঠী। কয়েক বছর ধরেই তাদের জন্য আসা আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসছে। ফলে সেখানে চাহিদা বাড়ছে। আর অভাবের সাথে সাথে অপরাধও বাড়ছে।
২০১৭ সালে যে মানুষগুলো জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশের সন্তান আজ বাংলাদেশেই বড় হচ্ছে। একটি শিশুর জন্ম হয়েছে ক্যাম্পে, তার শৈশব কেটেছে ক্যাম্পে, আর তার ভবিষ্যৎ কোথায়—সেই প্রশ্নের উত্তরও অনিশ্চিত। রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে গভীর দিক সম্ভবত এখানেই।
একটি প্রজন্ম জন্ম নিচ্ছে পরিচয়হীনতার মধ্যে। তারা নিজেদের মাতৃভূমি মিয়ানমার দেখেনি, আবার বাংলাদেশও তাদের নিজস্ব দেশ নয়। ক্যাম্পের বাইরের পৃথিবী তাদের কাছে দূরের এক বাস্তবতা।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া ছিল মানবিকতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। কিন্তু কোনও দেশই অনির্দিষ্টকাল অন্য দেশের নাগরিকদের স্থায়ীভাবে আশ্রয় দিয়ে যেতে পারে না। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রত্যাবাসনই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল পথ।
সেদিন যারা এসেছিল, তারা ভেবেছিল— কয়েক দিন, কয়েক মাস কিংবা বড়জোর কিছু সময়ের জন্য আশ্রয় নেবে। তারপর বাড়ি ফিরবে। কিন্তু দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৯ বছর। কিন্তু তারা এখনও ফিরতে পারেনি। কেন? এর উত্তরটি আসলে বড়ই জটিল।
কারণ তারা ফিরবে কোথায়? যে দেশে তাদের নাগরিকত্বই নিশ্চিত নয়, সেখানে? তাই রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি শুধু তারা কবে ফিরবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—তারা কি আদৌ ফিরতে পারবে?
নাকি একটি পুরো প্রজন্ম পরিচয়হীনতার সংকট নিয়ে বছরের পর বছর বাংলাদেশেই থেকে যাবে? আন্তর্জাতিক মহলের কাছে রোহিঙ্গা সংকট কি এখনও জরুরি এক মানবিক সংকট? নাকি দীর্ঘদিন ধরে চলতে চলতে এটি ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়া এক সংকটে পরিণত হচ্ছে?
বিশ্বের সামনে এসেছে নতুন যুদ্ধ। নতুন শরণার্থী সংকট। নতুন মানবিক বিপর্যয়। এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয় না রোহিঙ্গারা। তাই কি তাদের পরিচয়হীনতার সংকট ভুলতে বসেছে পুরো বিশ্ব?
অথচ ২০১৭ সালের এই দিনে যখন রোহিঙ্গারা প্রথম এ দেশে আসতে শুরু করে, তখন ভেবেছিলাম—আমরা এই মানবিকতা দেখিয়ে হয়তো বিরাট কিছু করতে যাচ্ছি। কিন্তু আজ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর ভার বহন করা আমাদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে চেপে বসেছে।
লেখক: সাইকোলজিস্ট




