নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন, পানি নিষ্কাশন—সবই খুঁটিয়ে দেখলেন। কোথাও অসন্তোষ প্রকাশ করলেন, কোথাও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। শুধু একটি ছোট্ট আক্ষেপ থেকে গেলো। যদি সফরসূচিতে কোনো সাধারণ মানুষের রান্নাঘরও থাকতো! কারণ নগরের সৌন্দর্য চোখে দেখা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বাস্থ্য দেখা যায় চুলার আগুনে।
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য বস্তু কী? সোনা নয়, ডলার নয়, জ্ঞানও নয়; সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য বস্তু হলো সকালের একটুখানি নীল আগুন। যে আগুন একসময় হাঁড়ির নিচে জ্বলতো, এখন তা শুধু সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তির ভাষায় জ্বলে। রান্নাঘরে গ্যাস নেই, কিন্তু বিবৃতিতে চাপ যথেষ্ট। পাইপলাইনে বাতাস, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের কথায় স্বস্তি।
ঢাকার অসংখ্য পরিবার এখন নতুন এক জাতীয় খেলায় অংশ নিয়েছে। খেলার নাম, ‘গ্যাস এসেছে কি আসেনি’। ভোর ৫টায় একজন চুলার নব ঘোরান, আরেকজন পাইপে কান লাগান, তৃতীয়জন পাশের বাসায় ফোন করেন—আপনাদের ওখানে গ্যাস এসেছে? রাজধানীতে এখন আর মানুষ, ‘কেমন আছেন?’ জিজ্ঞেস করে না। জিজ্ঞেস করে, ‘গ্যাস এসেছে?’ কোথাও যদি ৪০ সেকেন্ডের জন্য নীল শিখা দেখা যায়—খবর এমন গতিতে ছড়িয়ে পড়ে, যেন জাতীয় নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়েছে!
একসময় মানুষ গ্যাসের চুলা কিনতো রান্না করার জন্য। এখন কেনে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে! ড্রয়িংরুমে কেউ ছবি টাঙায়, রান্নাঘরে আমরা ‘টাঙিয়ে’ রেখেছি একটি গ্যাসচুলা। ব্যবহার হয় না, কিন্তু উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখতে ভালো লাগে। মাঝে মাঝে আগুন এমন টিমটিম করে ওঠে, যেন রাষ্ট্র নাগরিককে চোখ টিপে বলছে, ‘দেখুন, চেষ্টা তো করছি!’
ধানমন্ডি থেকে যাত্রাবাড়ী, মিরপুর থেকে পুরান ঢাকা—সবখানেই একই কাহিনি। হাঁড়িতে ভাতের চেয়ে বেশি সেদ্ধ হচ্ছে মানুষের ধৈর্য। একটি ডিম সিদ্ধ হতে যত সময় লাগে, ততক্ষণে তিনটি টকশো, পাঁচটি সংবাদ সম্মেলন এবং সাতটি আশ্বাস শেষ হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, গ্যাস নেই, কিন্তু বিল আছে। এ যেন এমন এক প্রেম, যেখানে দেখা নেই, কথা নেই, সম্পর্ক নেই, তবু প্রতি মাসে খোরপোশ দিতে হয়। সেবা অদৃশ্য, বিল দৃশ্যমান। গ্যাসের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে, বিলের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিলই সম্ভবত দেশের সবচেয়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থা।
কর্মজীবী মানুষের সকাল এখন যুদ্ধক্ষেত্র। কেউ আধসেদ্ধ ভাত টিফিনে ভরে অফিসে যাচ্ছেন, কেউ হোটেলের গতকালের পরোটা গরম না করেই খেয়ে নিচ্ছেন। যাদের সেই সামর্থ্যও নেই, তারা নতুন এক খাদ্যদর্শন আবিষ্কার করেছেন—খালি পেটে দেশপ্রেম; যা খেলে নাকি ক্ষুধা কিছুটা কম লাগে!
সবচেয়ে নির্মম দৃশ্য শিশু আর বৃদ্ধদের পরিবারে। শিশুর দুধ গরম করা যাচ্ছে না, কারণ আগুন নেই। বৃদ্ধের নরম ভাত রান্না করা যাচ্ছে না, কারণ গ্যাসের অস্তিত্ব এখন কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কণার মতো—আছে বলেও ধরা যায় না, নেই বলেও প্রমাণ করা যায় না।
এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়। এলপিজি। সেখানে গিয়ে বোঝা যায়, আগুনও এখন শ্রেণিবিভক্ত। যার পকেট মোটা, সে সিলিন্ডার কিনে। যার পকেট মাঝারি, সে বিদ্যুতের ইন্ডাকশন চুলায় যায়। আর যার পকেটে বাতাস ছাড়া আর কিছু নেই, সে ফিরে যায় লাকড়ির চুলায়। রাজধানীর বহুতলের বারান্দায় ধোঁয়া উঠছে। উন্নয়নের স্মার্ট নগরে বসে মানুষ আবার আদিম সভ্যতার রান্না শিখছে। এটাকেই বোধহয় বলে উন্নয়নের রিভার্স গিয়ার।
তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। আমাদের রাষ্ট্র সমস্যা সমাধানে যতটা পারদর্শী নয়, সমস্যা ব্যবস্থাপনায় তার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। প্রথমে একটি কমিটি হবে। তারপর একটি তদন্ত কমিটি হবে। এরপর একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি সেই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য আরেকটি কমিটি গঠন করবে। শেষে বলা হবে, ‘সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’ তারপর নাগরিকদের শেখানো হবে, এটিই নতুন স্বাভাবিক। বিবর্তনের সর্বশেষ সংস্করণ—হোমো অ্যাডজাস্টমেন্টাস।
এদিকে জনসংযোগ বিভাগের কর্মচাঞ্চল্যে কোনো ঘাটতি নেই। কোথাও বৃক্ষরোপণ, কোথাও সেলফি, কোথাও উদ্বোধন, কোথাও হাসিমুখে শিশুদের সঙ্গে ছবি। ক্যামেরার সামনে সবকিছুই সবুজ। শুধু রান্নাঘরের ক্যামেরাটা বোধহয় ইচ্ছা করেই বন্ধ রাখা হয়েছে। কারণ সেটি চালু হলে দেখা যাবে, হাঁড়িতে ভাত নেই, আগুন নেই, আছে শুধু দীর্ঘশ্বাসের বাষ্প।
জনসংযোগ অবশ্য দোষের কিছু নয়। জনপ্রতিনিধি মানুষের কাছে যাবেন, সেটাই কাম্য। কিন্তু মানুষও চায়, ক্যামেরা একদিন তাদের রান্নাঘরেও যাক। কারণ ভোটাররা সেলফি খেয়ে বাঁচে না, ভাত খেয়ে বাঁচে। সংবাদ সম্মেলনের করতালিতে ক্ষুধা মেটে না।
আমাদের দেশে আরেকটি অদ্ভুত রাষ্ট্রীয় দর্শন গড়ে উঠেছে। মনে করা হয়, যত বেশি আন্তর্জাতিক সফর হবে, যত বেশি সমঝোতা স্মারক সই হবে, যত বেশি কূটনৈতিক করমর্দনের ছবি প্রকাশ হবে, তত দ্রুত বুঝি সাধারণ মানুষের হাঁড়িতেও ভাত ফুটবে। যেন ওয়াশিংটনে একটি চুক্তি সই হলেই মোহাম্মদপুরের রান্নাঘরে ডালের হাঁড়ি নিজে থেকেই টগবগ করে ফুটতে শুরু করবে। অথচ একজন গৃহিণীর কাছে ভূরাজনীতি মানে পৃথিবীর মানচিত্র নয়; মানে রান্নাঘরের গ্যাসের চাপ। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত জোট, বাণিজ্যযুদ্ধ কিংবা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্লেষণ শোনার আগে তিনি খুব সাধারণ একটি প্রশ্নের উত্তর চান—‘আজ চুলায় আগুন জ্বলবে তো?’ কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দিয়ে রাতের টকশো চলে, সংসার চলে আগুনে।
তবে নাগরিকেরা এখনো রসবোধ হারাননি। বরং রাষ্ট্র যত কম গ্যাস দিচ্ছে, মানুষ তত বেশি ব্যঙ্গ উৎপাদন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ লিখছেন,‘সতর্কীকরণ: আজ গ্যাস এসেছে, সবাই জরুরি ভিত্তিতে হাঁড়ি বসান।’ আরেকজনের পরামর্শ,‘আবহাওয়া অফিসের মতো গ্যাস অফিসও প্রতি তিন ঘণ্টা পরপর বুলেটিন দিক—আজ উত্তরায় হালকা শিখা, মিরপুরে দমকা বাতাস, যাত্রাবাড়ীতে গ্যাসের সম্ভাবনা নেই।’ কেউ আবার লিখেছেন, ‘লোডশেডিংয়ের পর গ্যাসশেডিং, সামনে হয়তো নিশ্বাসশেডিংও চালু হবে।’ এমনকি অনেকে বলছেন, গ্যাসের চাপ এখন এতটাই রহস্যময় যে এটি জানতে বিজ্ঞানী নয়, জ্যোতিষীর প্রয়োজন।
এই হাসিগুলো আসলে হাসি নয়। এগুলো দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের আত্মরক্ষামূলক ভাষা। মানুষ যখন রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমাধান পায় না, তখন সমস্যাকেই কৌতুক বানিয়ে ফেলে। কারণ কান্না একসময় ক্লান্ত হয়ে যায়, কিন্তু ব্যঙ্গ কখনো অবসর নেয় না। ব্যঙ্গই তখন নাগরিকের শেষ প্রতিবাদ, শেষ আত্মসম্মান।
রাষ্ট্রেরও বুঝতে হবে, উন্নয়নের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা একনেক বৈঠকে বড় বড় প্রকল্প অনুমোদনে হয় না, হয় রান্নাঘরের চুলার সামনে। সেখানে রঙিন অ্যানিমেশন, পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইড কিংবা প্রবৃদ্ধির গ্রাফ কাজ করে না। সেখানে হিসাব খুব সরল—আগুন জ্বলে, অথবা জ্বলে না। মাঝখানে কোনো প্রেস ব্রিফিং নেই, কোনো পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যাও নেই।
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু আকাশছোঁয়া ভবন, ঝকঝকে এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা বিদেশি বিনিয়োগের অঙ্কে মাপা যায় না। উন্নয়নের সবচেয়ে নির্ভুল সূচক লুকিয়ে থাকে একটি সাধারণ পরিবারের রান্নাঘরে। ভোরবেলা একজন মা কত মিনিটে ভাতের হাঁড়ি চড়াতে পারছেন, একটি শিশু সময়মতো নাশতা পাচ্ছে কি না, একজন কর্মজীবী মানুষ আধসেদ্ধ ভাত নয়, ঠিকমতো রান্না করা খাবার নিয়ে কর্মস্থলে যেতে পারছেন কি না—এসবের মধ্যেই উন্নয়নের প্রকৃত প্রতিবেদন লেখা থাকে। কারণ নাগরিক যখন দিনের পর দিন আধসেদ্ধ ভাত খায়, তখন উন্নয়নের পরিসংখ্যানও কাঁচা বলে মনে হয়।
এখন সময় এসেছে ক্যামেরার সামনে উন্নয়নের অভিনয় নয়, রান্নাঘরে উন্নয়নের বাস্তবতা নিশ্চিত করার। পাইপলাইন সংস্কার দ্রুত শেষ করতে হবে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে, এলপিজির বাজারকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে—সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চ নয়, নাগরিকের রান্নাঘরই সরকারের সবচেয়ে বড় জনমত জরিপ কেন্দ্র। সেখানে ভোট হয় প্রতিদিন, ব্যালট ছাড়াই। আর সেই নির্বাচনের একমাত্র ব্যালটপেপার হলো—চুলায় আগুন জ্বলছে কি না।
ইতিহাসও শেষ পর্যন্ত খুব কঠিন প্রশ্ন করে না। সে শুধু জানতে চায়, একটি সরকারের আমলে মানুষের ঘরের চুলাটা জ্বলেছিল, নাকি শুধু মঞ্চের আলো আর বক্তৃতার আগুনই কেবল জ্বলজ্বল করেছিল।




