অন্যকে হেয় ও নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা, একধরনের মানসিক অসুস্থতা

লক্ষ করে দেখবেন, আমাদের চারপাশে এমন অনেকেই আছেন, যারা সবসময় অন্যকে হেয় ও হাসির পাত্র করে তোলার চেষ্টা করেন। এই কাজটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে যিনি করেন, ধরে নিতে হবে তিনি ‘গ্যাসলাইটিং’ করছেন। গ্যাসলাইটিং করতে গিয়ে তিনি সঙ্গীর মনের ওপর এমনভাবে চাপ দেন যে, সঙ্গী তার নিজের দেখা ঘটনা, অনুভূতি, স্মৃতি ও বিচারবোধকেই ভুল বলে মনে করেন।

এই যে মানুষ নিজের উপলব্ধি নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন, এখানেই গ্যাসলাইটিং করা ব্যক্তির সাফল্য। নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তির পক্ষে তখন ভিকটিমকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে যায়। একদিকে গ্যাসলাইটিংকারী ব্যক্তি মিথ্যা বলেন, অন্যদিকে এই মিথ্যার জন্যই ভিকটিমের নিজের বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা ক্ষয়ে যেতে থাকে।

আমাদের সমাজে ‘গ্যাসলাইটিং’ শব্দটি হয়তো পরিচিত নয়, কিন্তু এই আচরণ পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বন্ধুত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে খুবই চেনা। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দাম্পত্য ও প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে। একটু আলোচনা করলেই বোঝা যাবে, এই ধরনের চরিত্র কতটা পরিচিত আমাদের চারপাশে।

অন্যকে হেয় করার মাধ্যমে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতার নামই হচ্ছে গ্যাসলাইটিং, এটি একধরনের মানসিক অসুস্থতা। কাউকে ঘায়েল বা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে প্রথমেই তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করা, তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মাধ্যমে অসহায় ও দুর্বল করে দেওয়া, এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ।

পারিবারিক সহিংসতার একটি বড় অস্ত্র এই গ্যাসলাইটিং। দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে গ্যাসলাইটিংয়ের সবচেয়ে বেশি উদাহরণ পাওয়া যায়। কোনো স্বামী যখন তার স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, বা কোনো প্রেমিক যখন তার প্রেমিকার ওপর জোর খাটাতে চান, তখন তিনি এইভাবেই মানসিক নির্যাতনের পথ বেছে নেন।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি নিয়মিত তার স্ত্রীকে ঘরে এবং বাইরে অপমান করেন, অথবা অন্যের সামনে স্ত্রীর দোষত্রুটি নিয়ে হাসাহাসি করেন। পরে বিষয়টি আলোচনায় এলে তিনি বলেন, ‘আমি অপমান করিনি; তুমি ভুল বুঝেছ।’

একই ধরনের ‘অস্বীকার’ বারবার ঘটতে থাকলে আক্রান্ত সঙ্গী একসময় ভাবতে পারেন, আমি কি সত্যিই ভুল বুঝেছি? ভিকটিমের এই ভাবাটাই, অর্থাৎ এই পরাজয়টাই, গ্যাসলাইটিংয়ের মনস্তাত্ত্বিক শক্তি।

এই আচরণ পুরুষের বা স্বামীর ওপরেও হতে পারে। কোনো স্ত্রী যদি স্বামীকে অবিশ্বাস করেন বা সবসময় চোখে চোখে রাখতে চান, তখনই বুঝতে হবে এটি একটি অস্বাস্থ্যকর দাম্পত্য সম্পর্ক। এই সম্পর্ককেই মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন ‘গ্যাসলাইট আচরণ’।

এ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্ত্রীকে মুখের ওপর বলে ফেলা, ‘আরে, তুমি কী বোঝো? চুপ করো, মেয়েমানুষ, মেয়েমানুষের মতো থাকো।’ এসব কথাই তো বাঙালি সমাজে খুব স্বাভাবিক ও চর্চিত। নারীকে অসম্মান করা ও দুর্বল করে রাখার জন্য এ যেন চলমান প্রক্রিয়া।

দেখা যায়, দাম্পত্য সম্পর্কে স্ত্রীর ওপর গ্যাসলাইটিং প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে কাজ করতে শুরু করে। একসময় নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ভুক্তভোগী নারী কিছু স্মরণ করার জন্য বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সঙ্গীর মতামতের ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেন। এই নিপীড়নের আরও অনেক চেহারা আছে। যেমন, সঙ্গীর ওপর নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া, তাকে আদেশ করা এবং সেই আদেশ মানতে বাধ্য করা।

তবে গ্যাসলাইটিংয়ের অংশ হিসেবে স্ত্রী এবং স্বামী দুজনেই যা করতে পারেন, তা হচ্ছে পরস্পরের গতিবিধির ওপর নজর রাখা, সন্দেহ করা, বাজে কথা বলা, অসম্মান করা ইত্যাদি। এমনও হয় যে, প্রতিপক্ষ আপসেট না হওয়া পর্যন্ত তাকে উত্ত্যক্ত করা।

যারা গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার হন, তারা চট করে বুঝতেই পারেন না যে তারা গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার হচ্ছেন। এর ফলে ভিকটিম অনিশ্চিতবোধ করেন, নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন অথবা নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

একসময় তিনি নির্যাতনকারী ব্যক্তির কাছে ক্রমাগত ক্ষমা চান, নিজেকে দুর্বল, এমনকি নিজেকে পাগলও মনে করেন। অবস্থা এতটাই নাজুক হয় যে, অনেক সময় ভুক্তভোগী নিজেই নির্যাতনকারীর ব্যবহার অন্যদের কাছে গোপন করেন, এমনকি মাঝেমধ্যে সমর্থনও করেন। এইভাবে ভুক্তভোগী মানুষ নিজেকে একা করে ফেলেন।

গ্যাসলাইটিং নিয়ে অনেকগুলো গবেষণায় দেখা গেছে যে, গ্যাসলাইটিং করেন তিনি খুব সহজেই নিজের দোষ ও আচরণের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন। অন্যের যেকোনো অনুভূতিকে সহজেই অস্বীকার করেন। এমন আচরণ করেন, যাতে ভিকটিম তার নিকটজন বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এইভাবে একজন মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হলে তার পক্ষে বাস্তবতা যাচাই করার ও সামাজিক সাপোর্ট পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।

গ্যাসলাইটিং বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবস্থাতেও দেখা যায়। এখানে বিয়েকে দুই ব্যক্তির সম্পর্ক নয়, দুই পরিবারের সম্পর্ক হিসেবেও দেখা হয়। ফলে সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য গ্যাসলাইটিং আচরণকে সমাজ ও পরিবার স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে। সেক্ষেত্রে পরিবারের সম্মান, ব্যক্তির জীবনের কষ্টকর অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন মানসিক নির্যাতনের ভিকটিমকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

ফলে সমস্যায় পড়া নারী বা পুরুষকে, বিশেষ করে নারীকে বলা হয়, সবকিছু মেনে নিতে। এই মেনে নিতে নিতে একপর্যায়ে যখন ভুক্তভোগীর নির্যাতিত হওয়ার অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা হয় ও তাকে দুর্বল করে ফেলা হয়, তখন তা হয় গ্যাসলাইটিংয়ের সামাজিক রূপ। শুধু নির্যাতনকারী ব্যক্তি নয়, পরিবার ও সমাজের প্রতিক্রিয়াও কখনো কখনো গ্যাসলাইটিংয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

এই ‘গ্যাসলাইট’ শব্দটি কেন মানসিক নির্যাতনের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হলো, এটা বুঝতে হলে ১৯৩৮ সালে প্রদর্শিত একটি নাটক ও ১৯৪৪ সালের একটি সিনেমা সম্পর্কে জানতে হবে। সেখান থেকেই এই ‘গ্যাসলাইট’ শব্দটি নেওয়া হয়েছে।

সেই কাহিনীতে একজন নির্যাতনকারী স্বামী প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, তার স্ত্রী হ্যালুসিনেট বা কল্পনা করছেন। এটা প্রমাণ করার জন্য তিনি তাদের গ্যাস পাওয়ারের লাইটকে একবার উজ্জ্বল করেন এবং একবার আলো কমিয়ে দেখান। স্ত্রী যখন বলেন, লাইটটির আলো কম-বেশি হচ্ছে বারবার, তিনি বলেন, না, আলো ঠিকই আছে, তার স্ত্রীই ভুল দেখছেন।

এই করে তিনি স্ত্রীকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন এবং একসময় স্ত্রী নিজেও বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, তিনি আসলেই ভুল দেখছেন এবং তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ।

বহু বছর ধরে মানসিক নির্যাতনের জন্য এই অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ‘গ্যাসলাইটিং’ টার্মটি আমাদের সমাজে নতুন। পারিবারিক নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে এই ইস্যুটি ইদানীং সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন ফোরামে আলোচিত হচ্ছে। অনেকেই এই গ্যাসলাইটিংকে ‘ইমোশনাল অ্যাবিউজ’ করার অস্ত্র হিসেবে মনে করছেন।

অনেকেই গ্যাসলাইটিং ও মতবিরোধকে এক মনে করেন, কিন্তু এটা এক নয়। গ্যাসলাইটিংয়ের ভিকটিম প্রথম দিকে কথা বললেও পরে নিজেকে গুটিয়ে নেন। তিনি মতবিরোধ ঘটানোর কোনো অবস্থাতেই থাকেন না।

গ্যাসলাইট শুধু দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেই ঘটে, তা নয়। বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যেও ঘটে। অন্যের সামনে দুর্বল, বোকা, লেখাপড়ায় খারাপ, কিছু পারে না, এই ধরনের কথা বলে শাস্তি দিতে চান। এতে করে সন্তানের আত্মবিশ্বাস একেবারে নষ্ট হয়ে যায়।

আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন, যারা ইচ্ছা করে অন্য মানুষের বয়স, চেহারা, পোশাক, লিঙ্গ, জেন্ডার ধারণা, জাতি, ধর্ম ও বিশ্বাস নিয়ে বাজে মন্তব্য করেন বা ছোট করেন। এটাকে জাতিগত গ্যাসলাইটিং বলে।

চাকরির ক্ষেত্রেও মানুষকে নানাভাবে হেয় করা হয়। একজন দক্ষ কর্মীকেও তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করার মাধ্যমে পেশাগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও গ্যাসলাইটিং হয়।

কেউ কীভাবে গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার হচ্ছেন এবং এই নির্যাতনের হাত থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবেন, তা বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞানীরা নানা ধরনের উপায় বলে দিয়েছেন। কেউ যদি মনে করেন যে তিনি গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার এবং এর থেকে মুক্তি চাইছেন, তাহলে তাকে নিজের তথ্যের পক্ষে প্রমাণ জোগাড় করতে হবে, যেন কেউ বলতে না পারেন যে আপনি তথ্য ভুল বলছেন বা কথা ভুলে যাচ্ছেন।

বন্ধু বা কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুদ্ধি নেওয়া যায়। এরাই দরকারের সময় সাক্ষী হিসেবে থাকবেন। এ ছাড়া ভয়েস রেকর্ড করে রাখলে আইনি লড়াইয়ে কাজে লাগবে। সহায়তা কেন্দ্র ও মনোবিজ্ঞানীর সাপোর্ট নেওয়া যেতে পারে। বন্ধু ও পরিবারের সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে, যেন নির্যাতনকারী ব্যক্তি অন্যদের কাছে মিথ্যা গল্প দাঁড় করাতে না পারেন।

গ্যাসলাইটিং হচ্ছে জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের অংশ। কেউ যখন সঙ্গীর ওপর এভাবে নিয়ন্ত্রণ খাটানোর চেষ্টা করেন, তখন তাকে লাল পতাকা দেখানো উচিত। অর্থাৎ তাকে এড়িয়ে চলতে হবে। খুব সহজ না হলেও, এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক