বেতন বাড়ানোর দাবিতে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর পোশাক শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে যুবলীগের এক নেতার আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়ার ছবি গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার এক সপ্তাহ পরেই গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে নিহত হন পোশাকশ্রমিক আঞ্জুয়ারা খাতুন। এর তিনদিনের মাথায় ১১ নভেম্বর নিহত হন আরেক শ্রমিক জালাল উদ্দিন। ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার টাকা করার দাবিতে ওই সময়ের আন্দোলনে আরও কয়েকজন পোশাক শ্রমিক প্রাণ হারান। তখন এটিকে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় শ্রমিক অসন্তোষ বলে অভিহিত করা হয়েছিল।
২০২৩ সালে যখন ওই আন্দোলন হয়, তখন পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ছিল ৮ হাজার ৩০০ টাকা। সরকারের নিয়োগ করা মজুরি বোর্ড সর্বনিম্ন বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা করার ঘোষণা দিলেও শ্রমিকরা তা মানেনি। তাদের দাবি ছিল, জীবনযাপনের ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে সাড়ে ১২ হাজার টাকায়ও সংসার চালানো কঠিন।
তিন বছরের মাথায় একইভাবে রাজপথে পোশাক শ্রমিকরা। বর্তমানে তাদের ন্যূনতম মাসিক বেতন সাড়ে ১২ হাজার টাকা। কিন্তু এবার তাদের দাবি, ৩০ হাজার টাকা। দেশের কতগুলো পোশাক কারখানার মালিক এই বেতন দিয়ে ব্যবসা চালু রাখতে পারবেন; চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা কতটা বাস্তবসম্মত এবং সরকার এই দাবি না মানলে পোশাক খাতের অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়াবে—সেই বিতর্কের মধ্যেই বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে বাংলা ট্রিবিউনের একটি খবরের শিরোনাম: ‘সাভারে নেই কোনও আন্দোলন, কাজে যোগ দিয়েছেন পোশাক শ্রমিকরা।’ খবরে বলা হয়, ‘শ্রমিক অসন্তোষের পর স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের কর্মপরিবেশ। সকাল থেকে ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ ডিইপিজেডের সব কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে উৎপাদন কার্যক্রম। শ্রমিকদের কেউ কারখানার নিজস্ব পরিবহনে, আবার কেউ পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে এসে কাজে যোগ দেন। কারখানাগুলোর সামনে শ্রমিকদের স্বাভাবিক উপস্থিতি দেখা গেছে।’
এর আগের দিন বুধবার সাভারের চেহারা ছিল ঠিক উল্টো। সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল আর ফুলবাড়িয়ায় পুলিশের সাথে পোশাক শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে কয়েকজন আহত হন। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। হেমায়েতপুরে পদ্মার মোড়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেন বিক্ষোভকারীরা। আগুন দেওয়া হয় দুটি মোটরসাইকেলেও। শ্রমিকদের সাথে সংঘর্ষে সাভার মডেল থানার ওসিসহ কয়েকজন আহত হন। এদিন গাজীপুরের সাইনবোর্ড ও নলজানি এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে টিয়ার শেল ও সাউন্ড নিক্ষেপ করে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। হাজীগঞ্জ-পোস্ট অফিস সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে।
এদিন সন্ধ্যায় পোশাক কারখানার মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে সচিবালয়ে বৈঠক করেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা। বৈঠক শেষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, পোশাক শ্রমিকদের সব দাবি বিবেচনা করেই আলোচনা হচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো গঠন করা হবে। আর জানুয়ারি মাসেই তারা নতুন কাঠামোতে বেতন পাবেন। তবে সেই বেতন শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা কি না, মন্ত্রী তা বলেননি। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পোশাক কারখানার মালিকরা দাবি করেন, টানা চার দিনের আন্দোলনে অন্তত দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সাভার, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের জন্য শ্রমিকরা জড়ো হতে থাকেন। যদিও কিছু সময় পরই তারা সড়ক ছেড়ে চলে যান। এদিনও সহিংসতার আশঙ্কায় শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় শক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ আসে এই খাত থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রফতানির পরিমাণ ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার। গত জুলাই মাসের খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে। যদিও বাংলাদেশের রফতানি কমেছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাক রফতানিতে শীর্ষে থাকা ভিয়েতনামের রফতানি বেড়েছে।
পোশাকশিল্পের একটি বড় শক্তি হলো, এই খাতে বিপুল মানুষের, বিশেষ করে কম শিক্ষিত বিশাল জনগোষ্ঠী, যাদের বড় অংশ নারী—তাদের কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান খাত এটি। পরিসংখ্যান বলছে, এই শিল্পে বর্তমানে ৪২ থেকে ৪৪ লাখ মানুষ সরাসরি কর্মরত, যাদের অর্ধেকের বেশি নারী শ্রমিক। তারা গ্রামীণ নারীসমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে এক নীরব সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছে বলেও মনে করা হয়।
প্রশ্ন হলো, বিপুল সম্ভাবনাময় এই খাতের শ্রমিকদের কেন কিছুদিন পরপর বেতন বাড়ানোর দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়। কেন প্রায়ই বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ করতে হয়। বিশেষ করে প্রত্যেক ঈদের আগে কেন পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভের শিল্পাঞ্চল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে? তার মানে সারা পৃথিবীতে সুনাম অর্জন করলেও এবং রফতানি আয়ের শীর্ষে থাকলেও তৈরি পোশাক খাত এখনও পেশাদার বা শ্রমিকবান্ধব হয়ে ওঠেনি? নাকি দেশি-বিদেশি কোনো গোষ্ঠী সব সময়ই এই খাতে অস্থিরতা জিইয়ে রেখে তাদের রাজনৈতিক ও অন্যান্য স্বার্থ আদায় করতে চায়?
মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা দাবি পোশাক শ্রমিকদের। এই দাবির সাথে একাত্ম এবং তাদের প্রতি সংবেদনশীল থেকেই প্রশ্নটি তোলা দরকার যে, এখনই ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি দেওয়ার সক্ষমতা মালিকদের আছে কি না? অন্য পেশার ন্যূনতম মজুরির সাথেও এর সঙ্গতি রাখা দরকার। অন্য পেশায় কি ন্যূনতম মজুরির কোনো কাঠামো আছে? জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে দেশের শিল্প-কারখানাগুলো যে ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে এখনই ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি দিতে হলে কতগুলো কারখানা টিকে থাকবে—সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার। তবে এটাও ঠিক যে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সাড়ে ১২ হাজার টাকায় একটা পরিবার চলতে পারে না। সেক্ষেত্রে বেতন বাড়ানোরও বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে শ্রমিকদের দাবিকৃত ৩০ হাজার টাকা মজুরি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, শুধু শ্রমিকের বেতন নয়, বরং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শ্রম ব্যয়ও বাড়বে। যেমন ওভারটাইম, ছুটি, বিভিন্ন সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি। সেইসাথে পোশাক খাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, জ্বালানি ও উৎপাদন খরচ, অর্ডারের চাপ এবং কম মার্জিনের সমস্যাও আছে। সুতরাং, একলাফে সাড়ে ১২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হলে সেই বাড়তি টাকা কোথা থেকে আসবে, এই প্রশ্নেরও সুরাহা করতে হবে।
পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর হিসাবে, করোনা মহামারির কারণে দেশে ২০২০-২১ সালে ৩১৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল। করোনা-পরবর্তী সময়ে প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখতে না পারাসহ নানা কারণে বন্ধ হয়েছে আরও ২৬০টি কারখানা। একইভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের পরেও অসংখ্য শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে যেসব শিল্প কারখানার মালিক ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতি এবং শেখ হাসিনার সরকারের সাথে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন—তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়েছে।
তার ওপর বাংলাদেশের পোশাকের ক্রেতারা যদি একই দামে পোশাক কিনতে চান এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর পুরো বোঝা বাংলাদেশের কারখানার ওপর পড়ে, সেটি আরেক সংকটের জন্ম দেবে। তবে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর পুরো অর্থই ক্রেতার কাছ থেকে আসতে হবে এমনও নয়। বরং মালিকদেরও একটি অংশ বহন করতে হবে। কেননা, মালিকদের এটা মনে রাখতে হবে যে, শ্রমিকদের ঘাম ও রক্তের বিনিময়ে সারা বিশ্বের বাজারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পরিচিতি পেয়েছে। সুতরাং, সেই শ্রমিকদের টিকে থাকা, তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মালিকদেরই।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক