শেখার বয়স নেই, চাকরির বয়স কেন? 

সুলতানা স্বাতী
০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

আমার দাদির বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১০ বছর বয়সে। তখন তিনি ক্লাস থ্রিতে পড়তেন। দাদি প্রায় ৯০-৯২ বছর বেঁচে ছিলেন। আমি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই দেখেছি, পড়াশোনার প্রতি তার তীব্র আগ্রহ। আমরা কী পড়ছি, কীভাবে পড়ছি, তা নিয়ে তার আগ্রহের অন্ত ছিল না। এমনকি আমাদের বাসায় যারা কাজ করতেন, তাদেরও নিয়ম করে পড়াতেন। অঙ্ক করাতেন। নিজেও আমাদের বাংলা বইগুলো নিয়ে পড়তেন।

দাদির সেই আগ্রহের কথা মনে হলে এখন ভাবি, তিনি যদি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতেন, তাহলে হয়তো তার হাতেও এসএসসি-এইচএসসির সার্টিফিকেট থাকতো। কিন্তু সেই ৩০-৪০ এর দশকে বাল্যবিবাহটাই নিয়ম ছিল। এছাড়া সংসার আর সামাজিক বাস্তবতাও হয়তো সেই সুযোগ দেয়নি। অথচ শেখার আগ্রহটা তার শেষ দিন পর্যন্ত ছিল।

সম্প্রতি খবরের কাগজে দেখলাম, ৫১ বছর বয়সী শেফালী বেগম এইচএসসি পাস করেছেন। শুধু পাস নয়, জিপিএ পেয়েছেন ৪.২১। বয়সটা কিন্তু কম নয়! তারপরও পড়াশোনার প্রতি কী অদম্য আগ্রহ তার! আর সেই আগ্রহের স্বীকৃতিও পেয়েছেন ভালো ফলাফলের মধ্য দিয়ে।

জানা গেলো, অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর পর বিয়ে ও সংসারের কারণে তার পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল। কিন্তু মনের মধ্যে পড়াশোনার ইচ্ছেটা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। পরে সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে এসএসসি পাস করেন, এরপর এইচএসসি। এখানেই থেমে থাকতে চান না। তার ইচ্ছা, আরও পড়াশোনা করবেন, অনার্সও পাস করবেন।

মানুষের মনে ইচ্ছা থাকলে তিনি কত কিছুই না করতে পারেন! শেফালী বেগম যেন আবারও তা বুঝিয়ে দিলেন।

অথচ আমরা অনেকে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা হেলায় হারাই। পড়াশোনা করতেই চাই না! শেফালী বেগম তিন সন্তানকে বড় করেছেন, তাদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। সংসারের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি নিজের স্বপ্নটাকেও বাঁচিয়ে রেখেছেন। মরে যেতে দেননি।

তার এই অর্জন তাই শুধু একজন নারীর পরীক্ষায় পাস করার গল্প নয়। এটি নিজের ইচ্ছাকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প, নতুন করে শুরু করার গল্প।

শেখার কোনো বয়স নেই—কথাটা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু এই কথার বাস্তব অর্থ কতটা উপলব্ধি করি?

এখন পড়াশোনার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কেউ মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিলেও পরে আবার শুরু করতে পারেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি রয়েছে উন্মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা ও বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ। কিন্তু অনেকেই জানেন না, দীর্ঘ বিরতির পরও পড়াশোনায় ফেরা সম্ভব। কেউ কেউ মনে করেন, বয়স হয়ে গেছে, এখন আর পড়াশোনা করে কী হবে! বা এই বয়সে আবারও শুরু করলে লোকে কী বলবে!

শেফালী বেগমের অর্জন তাদের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে। যারা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, যারা সংসারের চাপে নিজের স্বপ্ন ভুলে গেছেন, কিংবা যারা মনে করেন, তাদের আর কিছু শেখার নেই—তারা নতুন করে শুরু করার কথা ভাবতে পারেন। অন্তত নিজেদের বলতে পারেন, একবার চেষ্টা করে দেখলে ক্ষতি কী!

তবে শুধু ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সব বাধা অতিক্রম করা যায় না। প্রয়োজন সুযোগ, সহযোগিতা এবং অনুকূল পরিবেশও। সবাই তা পায়ও না। আমাদের অনেক রকম সিস্টেম সেটা পেতে দেয় না।

আর এখানেই আমার কিছু প্রশ্ন আছে।

শেফালী বেগম হয়তো আরও পড়াশোনা করবেন। অনার্স, এমনকি মাস্টার্সও পাস করতে পারেন। এরপর যদি তার মনে হয়,চাকরি করবেন, নিজের উপার্জনে স্বাবলম্বী হবেন, তাহলে কী হবে? তিনি কি চাকরির সুযোগ পাবেন? সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারবেন?

বাংলাদেশে সাধারণভাবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর। এমপিওভূক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদে নিবন্ধনের বয়সসীমা ৩৫ বছর। অর্থাৎ একজন নারী যদি সংসার ও সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব সামলে পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন, তাহলে তার অর্জিত যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে প্রচলিত অনেক চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ আর থাকবে না।

এখানে শুধু শেফালী বেগমের কথা বলছি না। আমাদের দেশে অনেক মেয়ের অনার্স-মাস্টার্স শেষ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। সংসার ও সন্তান সামলাতে গিয়ে চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে ওঠে না। আবার অনেকে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও, সন্তান প্রতিপালনের জন্য চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। সন্তান বড় হলে বা পারিবারিক দায়িত্বের চাপ কমলে তারা আবার কর্মজীবনে ফিরতে চান। কিন্তু তত দিনে বয়সের সীমা পেরিয়ে যায়।

আবার এমন মানুষও আছেন, যারা অল্প বয়সে পড়াশোনার গুরুত্ব বুঝতে পারেন না। পরে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেন, আরও পড়াশোনা করার দরকার ছিল। তখন তাদের মধ্যে নতুন করে শেখার আগ্রহ তৈরি হয়। কেউ ডিগ্রি অর্জন করতে চান, কেউ নতুন দক্ষতা শিখতে চান, কেউবা চাকরির পরীক্ষায় বসার স্বপ্ন দেখেন।

কিন্তু বয়সের কারণে তাদের অনেকের জন্যই সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়।

আমি বুঝি না, একজন মানুষ ৪০, ৪৫ কিংবা ৫০ বছর বয়সে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসতে পারবেন না কেন? যদি তিনি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেন এবং প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হন,তাহলে শুধু বয়সের কারণে তাকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে কেন?

অবশ্যই সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা নির্ধারণের পেছনে প্রশাসনিক ও নীতিগত বিবেচনা রয়েছে। তবে সেই নীতির মধ্যে এমন মানুষদের জন্য বিকল্প সুযোগের কথা ভাবা যায় না? যারা দেরিতে পড়াশোনা শেষ করেছেন, যারা পারিবারিক দায়িত্ব পালনের কারণে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেননি, তাদের জন্য দক্ষতা ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ বাড়ানো যায় না?

একজন মানুষ যদি ৫০ বছর বয়সেও নতুন কিছু শেখার সামর্থ্য ও আগ্রহ রাখেন, তাহলে তার কর্মক্ষমতা সম্পর্কে আগেভাগেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ কী? বয়স বাড়লেই কি মানুষের শেখার ক্ষমতা, কাজের দক্ষতা কিংবা সমাজে অবদান রাখার সামর্থ্য শেষ হয়ে যায়?

আমরা চাই, নারীরা শিক্ষিত হোন, আত্মনির্ভরশীল হোন, নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পান। অথচ আমাদের ব্যবস্থায় এমন অনেক নারী আছেন, যারা শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পেলেও সেই শিক্ষাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পান না। তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, পুনরায় কর্মজীবনে প্রবেশের ব্যবস্থা এবং দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

শেফালী বেগমের সাফল্য আমাদের আনন্দিত করে। তার সামনে আরও এগিয়ে যাওয়ার পথ খুলে যাক, এটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে তার অর্জন আমাদের এমন একটি ব্যবস্থার কথা ভাবতে শেখাক, যেখানে মানুষ যেকোনো বয়সে শিখতে পারবেন এবং সেই শিক্ষাকে কাজে লাগানোর সুযোগও পাবেন।

কারণ শেখার বয়স নেই—এই কথাটি তখনই সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হবে, যখন শেখার পর নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগও মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

লেখক: সাইকোলজিস্ট

/এপিএইচ/ 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘স্যরি’ কেন বললো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন 
‘স্যরি’ কেন বললো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন 
৫১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা
৫১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল এল-সাইয়েদ
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল এল-সাইয়েদ
তৃতীয় দিনের আন্দোলনে ফের উত্তপ্ত ফতুল্লা, শ্রমিক-পুলিশ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া
তৃতীয় দিনের আন্দোলনে ফের উত্তপ্ত ফতুল্লা, শ্রমিক-পুলিশ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া
সর্বশেষ সর্বাধিক