আমাদের মানবতা কোথায়? 

ড.প্রণব কুমার পাণ্ডে
০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

একজন মানুষ মেট্রোরেলে উঠেছিলেন বাড়ি ফিরবেন বলে। কিন্তু তাঁর আর বাড়ি ফেরা হলো না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ৬৪ বছর বয়সী সহযোগী অধ্যাপক নাজিবুর রহমান গত ২৪ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোরেলে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর ছেলের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বারবার একটু বসার জায়গা চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তাঁকে আসন ছেড়ে দেননি। একসময় তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

ঘটনাটি পড়ে মনটা ভারী হয়ে আসে। বারবার মনে হয়,একজন মানুষ কি এতটাই অসহায় হয়ে পড়তে পারেন যে, অসুস্থ শরীর নিয়ে একটু বসার জায়গা চেয়েও তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়? আশপাশে এত মানুষ, অথচ তাঁর জন্য একটু জায়গা হলো না! আমরা কি সত্যিই এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি যে, একজন মানুষের অসহায়ত্বও আমাদের স্পর্শ করে না?

একটি আসনের দাম কতই-বা? কয়েক মুহূর্তের একটু অস্বস্তি, নিজের আরামটুকু সামান্য সময়ের জন্য বিসর্জন দেওয়া। একজন বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষকে বসতে দেওয়ার জন্য এর বেশি কিছু তো করতে হয় না। অথচ সেই সামান্য ত্যাগটুকুও আমরা অনেক সময় করতে চাই না। কেন? আমরা কি এতটাই ব্যস্ত, নাকি নিজের আরামটুকু অন্যের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মূল্যবান মনে করতে শিখেছি?

আমার মনে হয়, আমাদের মধ্যে একধরনের নীরব উদাসীনতা তৈরি হয়েছে। আমরা ভাবি, অন্য কেউ নিশ্চয়ই সাহায্য করবে। পাশের মানুষটিও হয়তো একই কথা ভাবেন। এভাবে সবাই যখন অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তখন শেষ পর্যন্ত অসহায় মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকে না। অথচ সামান্য একটু সহানুভূতি হয়তো তাঁর জীবনে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারতো।

একবার নিজের বাবা কিংবা মায়ের কথা ভাবুন— যাঁরা সারাজীবন নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে আমাদের বড় করেছেন। এবার কল্পনা করুন, আপনার সেই বাবা বা মা একদিন ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। শরীরটা ভালো লাগছে না, মাথা ঘুরছে। দুর্বল কণ্ঠে বলছেন, বাবা, একটু বসতে দেবে? অথচ আশপাশের কেউ তাঁর দিকে তাকাচ্ছে না। কেউ নিজের আসন ছেড়ে দিচ্ছে না। তখন আপনার কেমন লাগবে? বুকের ভেতরটা কি হাহাকার করে উঠবে না? মনে হবে না— কেউ যদি একটু সাহায্য করতো! তাহলে যে মানুষটিকে আমরা চিনি না, তাঁর ক্ষেত্রেও কি একই মানবিক অনুভূতি কাজ করা উচিত নয়? তিনিও তো কারও বাবা, কারও স্বামী, কারও প্রিয় মানুষ। তাঁরও একটি পরিবার আছে, বাড়িতে হয়তো কেউ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর জীবনও সমান মূল্যবান, তাঁর কষ্টও আমাদের বিবেককে স্পর্শ করার কথা।

সবচেয়ে বড় কথা, আমরাও একদিন বয়স্ক হবো। আমাদের শরীর দুর্বল হবে, হাঁটতে কষ্ট হবে, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবো না। সেদিন আমরাও হয়তো কারও কাছে একটু বসার জায়গা চাইবো, একটু সহানুভূতি প্রত্যাশা করবো। আজ  আমরা অন্যের সঙ্গে যেমন আচরণ করছি, আগামী দিনের সমাজও হয়তো আমাদের সঙ্গে তেমন আচরণ করবে।

এই ঘটনায় আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে নাজিবুর রহমানের ছেলের বক্তব্য। বাবাকে হারানোর অসহনীয় শোকের মধ্যেও তিনি কাউকে আক্রমণ করেননি। বরং বয়স্ক মানুষদের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। একজন সন্তান কতটা সংযমী ও মানবিক হলে এমন মুহূর্তেও অন্যদের প্রতি সহমর্মিতার আহ্বান জানাতে পারেন! তাঁর এই আবেদন আমাদের আরও বেশি ভাবিয়ে তোলে। কারণ বাবাকে হারানোর পরও তিনি আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নেড়েছেন।

আমরা অনেক সময় বয়স্ক মানুষকে আসন ছেড়ে দেওয়াকে একধরনের অনুগ্রহ বলে মনে করি। অথচ বিষয়টি মোটেও এমন নয়। বয়স্ক, অসুস্থ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অগ্রাধিকার আসন কোনো দয়ার বিষয় নয়; এটি তাঁদের ন্যায্য অধিকার। তাঁদের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া আমাদের মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব। এটি কোনো বিশেষ মহত্ত্বের পরিচয় নয়, বরং একজন বিবেকবান মানুষের স্বাভাবিক আচরণ।

অবশ্য শুধু ব্যক্তিগত সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব নয়। গণপরিবহনে অগ্রাধিকার আসনের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসাসহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কর্তৃপক্ষকে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু নিয়ম ও আইন যতই থাকুক, মানুষের হৃদয়ে সহানুভূতি না থাকলে সেগুলো কখনোই যথেষ্ট হবে না।

আমাদের সন্তানরাও আমাদের দেখেই শিখছে। বাসে, ট্রেনে কিংবা রাস্তায় আমরা কীভাবে অন্য মানুষের সঙ্গে আচরণ করি, তারা সবকিছুই লক্ষ্য করে। আমরা যদি বয়স্ক মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও নিজের আসন না ছাড়ি, তারাও একদিন সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করবে। কিন্তু আমরা যদি একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই, নিজের আসন ছেড়ে দিই, তাহলে তারা শিখবে মানবিকতা আসলে কী। একজন শিশুর সামনে এমন একটি ছোট্ট মানবিক আচরণ হয়তো অনেক বড় বক্তৃতার চেয়েও বেশি কার্যকর শিক্ষা।

আমরা উন্নয়নের কথা বলি। সেতু নির্মাণ করি, সড়ক তৈরি করি, মেট্রোরেল চালু করি। এসবই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত সভ্যতা শুধু তার অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। পরিমাপ করতে হয় সে দেশের মানুষ কতটা মানবিক এবং সমাজের দুর্বল মানুষগুলোর প্রতি কতটা যত্নশীল, তা দিয়ে। মেট্রোরেল যত দ্রুতই চলুক, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সহানুভূতি যদি পিছিয়ে পড়ে, তাহলে সেই উন্নয়নের পূর্ণতা কোথায়?

আজ  নাজিবুর রহমানের চলে যাওয়ার ঘটনা আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছে। সেই আয়নায় শুধু অন্যদের নয়, নিজেদেরও দেখা দরকার। আমরা কি কখনো কারও অসহায়ত্ব দেখেও চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি? কেউ সাহায্য চাইলে কি ভেবেছি, অন্য কেউ এগিয়ে আসবে? নিজের সামান্য আরামটুকু ধরে রাখতে গিয়ে কি কখনো অন্যের কষ্টকে উপেক্ষা করেছি?

পরের বার বাসে, ট্রেনে কিংবা মেট্রোরেলে কোনো বয়স্ক মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে একটু উঠে দাঁড়াবেন। অসুস্থ কাউকে দেখলে জিজ্ঞেস করবেন, আপনার কি কোনো সাহায্য লাগবে? মনে রাখবেন, আপনার কাছে এটি হয়তো কয়েক মুহূর্তের সামান্য ত্যাগ, কিন্তু অন্য একজনের কাছে সেটিই হতে পারে অনেক বড় সহায়তা।

আজ একজন বাবা চলে গেলেন। তাঁর পরিবার আর তাঁকে ফিরে পাবে না। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার ঘটনাটি যদি আমাদের একটু ভাবতে শেখায়, অন্যের বিপদে এগিয়ে আসতে শেখায়, তাহলে অন্তত এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে আমরা একটি মানবিক শিক্ষা নিতে পারবো।

আসুন, আর কোনো বাবাকে, আর কোনো মাকে, আর কোনো প্রিয় মানুষকে— এমন অসহায় অবস্থায় পড়তে না দিই। নিজের সামান্য আরামটুকুর চেয়ে অন্য একজন মানুষের জীবন ও সম্মানকে বেশি  মূল্য দিতে শিখি।

আজ  আবারও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে, কিছুটা কষ্ট নিয়ে, কিছুটা লজ্জা নিয়ে— আমাদের মানবতা কোথায়? অন্যের মধ্যে সেই মানবতা খোঁজার আগে আসুন, নিজেদের হৃদয়ের ভেতর একবার খুঁজে দেখি।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর

 

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসনে জামায়াতের ১৫ দাবি
পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসনে জামায়াতের ১৫ দাবি
আমুসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিলেন ট্রাইব্যুনাল
আমুসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিলেন ট্রাইব্যুনাল
ট্রিপল মার্ডার মামলায় পাঁচ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৮ জনের যাবজ্জীবন
ট্রিপল মার্ডার মামলায় পাঁচ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৮ জনের যাবজ্জীবন
আমাদের মানবতা কোথায়? 
আমাদের মানবতা কোথায়? 
সর্বশেষ সর্বাধিক