সুন্দরবনে ‘জলে দস্যু, ডাঙায়ও দস্যু’, অসহায় বনজীবীরা

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের ওপর নানাভাবে নির্ভরশীল প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। কিন্তু প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনের কোলে বসবাসরত স্থানীয়দের মনে শান্তি নেই। জলে কুমির-ডাঙায় বাঘের সঙ্গে এখন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম বনদস্যু।

সুন্দরবনের বনদস্যুরাসাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার আব্দুল আজিজ ঢালী ও আব্দুল কালাম ঢালী দুই ভাই। তারা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের বাবা আবুল হোসেন ঢালীও সুন্দরবনকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ছোটবেলা থেকে আজিজ ও আব্দুল কালামেরও সুন্দরবনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে। মাছ ধরা, গোলপাতা ও জ্বালানি কাঠ আহরণ ছাড়া অন্যকোনও কাজ তাদের জানা নেই। কিন্তু কিছুদিন আগে সুন্দরবনের দস্যুদের হাতে ধরা পড়ে তারা এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

দস্যুবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ভয়াল সেই দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আব্দুল আজিজ ও আবুল কালাম বলেন, ‘বাদায় (বন) গেলেই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন এলাকা কেন্দ্রিক দস্যুদের চাঁদা দিয়েই যেতে হয়। তারপরও মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়। মুক্তিপণ না দিলে গাছে ঝুলিয়ে নির্যাতন করে। সব ভুলতে পারি কিন্তু দস্যুদের অত্যাচারের কথা ভুলিতে পারি না। দস্যুদের হাতে পড়ে অনেকের প্রাণ গেছে।’

তারা আরও বলেন, ‘কোনরকমে নদীতে মাছ ধরে নিজেদের সংসার চালিয়ে থাকি। দস্যুদের টাকা দিতে আজ আমরা নিঃস্ব। বন থেকে যা উপার্জন করি সব নিয়ে যায় বনদস্যুরা। বাঘে ধরলে তো একজনের জীবন যায়। কিন্তু বনদস্যু ধরলে পরিবারের সবার জীবন যায়।’

গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম আলী আজম টিটো বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় ডজন খানিক বনদস্যু বাহিনী। এসব দস্যু বাহিনীর টোকেন ছাড়া জেলেদের মৎস্য সম্পদ আহরণ সম্ভব হচ্ছে না। প্রতি বছর বনদস্যুরা প্রায় ১ লাখেরও বেশি জেলে ও বাওয়ালিদের কাছ থেকে মুক্তিপণের দাবিতে আদায় করছে ২০০ কোটি টাকা। আর টোকেনবিহীন জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে। সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও গোন হিসাবে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময় দস্যুদের সরবরাহকৃত এ টোকেন নিতে হচ্ছে জেলেদের।’

শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা ও পদ্মপুকুর এলাকার খোকন মিস্ত্রি, আসাদ, রেজাউল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তাদের কাছে থাকা জাল, নৌকা, ডিজেল, চাল, ডাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মালামালও দস্যুরা নিয়ে যাচ্ছে। এই বনদস্যু দলগুলোর হাতে মুক্তিপণের দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই অপহৃত হচ্ছেন অসংখ্য জেলে-বাওয়ালি।’

এদিকে কদমতলা স্টেশন অফিসার শ্যামাপ্রসাদ রায় বলেন, ‘সম্প্রতি সুন্দরবনে হয়ে যাওয়া অপারেশন পাইরেটস হান্ট ও স্মর্ট পেট্রোলিংয়ে মাধ্যমে কোনও দস্যুকে আটক না করতে পারলেও তাদের আস্তানা থেকে বিভিন্ন সরঞ্চাম উদ্ধার করা হয়েছে।’

র‌্যাবের কাছে বনদস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণজেলে-বাওয়ালি ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বাহিনী আত্মসর্ম্পণ করেছে। এছাড়া অনেক বাহিনীর প্রধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। তারপরও ওই সব বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ডাররা পুনরায় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের নামে বাহিনী গড়ে পুরোদমে জেলে অপহরণসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে আরও একটি সমস্যা আছে, অপহৃত জেলে বা বাওয়ালির আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে না।’

দুবলার ফিসারম্যান গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, প্রতি বছর বনদস্যুরা প্রায় ১ লাখেরও বেশি জেলে ও বাওয়ালিদের কাছ থেকে ২০০ কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করছে। আর মুক্তিপণ না পেয়ে গত তিনবছরে পশ্চিম সুন্দরবনসহ চারটি রেঞ্জে দস্যুদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন জেলে। আর র্যা বসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৭ বনদস্যু বাহিনী প্রধানসহ ৪৫ জন মারা গেলেও থামেনি দস্যুতা।

এদিকে, জুলাই মাসে সাতক্ষীরা রেঞ্জের পশ্চিম সুন্দরবনের কালিন্দা নদীর গোড়া এলাকা থেকে মাছ ধরে লোকালয়ে ফেরার সময় অস্ত্রধারী ২৭ সদস্য বিশিষ্ট আলিম বাহিনী ট্রলারসহ চার জেলেকে মুক্তিপণের দাবিতে ট্রলারসহ জিম্মি করে। এছাড়া জোনাব বাহিনী ১৬ আগস্ট ২ জন জেলে ও ২০ আগস্ট ৪জন জেলেকে মুক্তিপণের দাবিতে জিম্মি করে।

দস্যু বাহিনীর জিম্মিদশা থেকে ফিরে আসা জেলে হালিম, এরশাদ আলী, আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৈধভাবে সরকারের কাছ থেকে পাশ নিয়ে সুন্দরবনে ঢুকলেও দস্যুরা জিম্মি করে আদায় করছে মুক্তিপণ। মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাপক মারধর করে। এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। বাঘ, কুমির, সাপের চেয়ে সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক এখন ডাকাত। ডাকাতরা বনজীবীদের নিঃস্ব করে ছাড়ে।’

মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোড়ল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পশ্চিম সুন্দরবনসহ এই অঞ্চলে আইয়ূব বাহিনী, জোনাব বাহিনী, আলিম বাহিনী, রেজা বাহিনী, শাহিনুর বাহিনী, হযরত বাহিনী, নোয়া মিয়া বাহিনীসহ প্রায় ডজন খানিক বাহিনী রয়েছে। তাদের কাছে রয়েছে ভারি ও মাঝারি ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ। বনে জেলে-বাউয়াল ও মৌয়ালরা ঢুকলেই কোনও না কোনও বাহিনী তাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। বনের উপর যাদের জীবন। তারা এখন বনে যেতে পারে না দস্যুদের ভয়ে। তাদের জীবন আজ দুর্বিসহ।’

তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘সুন্দরবনের কলাগাছিয়া, দোবেকেসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দস্যু বাহিনী একদিকে থাকে আর একদিকে সুন্দরবন বনবিভাগের বন সংরক্ষক বাহিনী থাকে। তারা যে যার মতো কাজ করে কেউ কারও মুখোমুখি হয় না। প্রতিকার না পেয়ে জেলে-বাওয়ালিরা নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় এখন আর দস্যুদের হাতে জিম্মি হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা কোনও জনপ্রতিনিধিদের অবহিত করে না। নিজেরা দস্যুদের কাছে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে নেয়।’

পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জ সহকারী জুয়েল চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলে-বাওয়ালিদের কাছ থেকে আইয়ূব বাহিনী, জোনাব বাহিনী, আলিম বাহিনী, আমজাদ বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর নাম শোনা যায়। কিন্তু আমাদের সামনে কখনও কোনও বাহিনী পড়ে না।’

সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মাকছুদ আলম বলেন, ‘সুন্দরবনে দস্যু দমনে বিভিন্ন বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৭ বনদস্যু বাহিনী প্রধানসহ ৮১ জন মারা গেছে। নানামুখী অভিযানে আগের তুলনায় দস্যু বাহিনী অনেক দমন হয়েছে। তাছাড়া বনজীবীরা মুখে দস্যুদের বিরুদ্ধে বললেও কখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগ করে না।’

/এমও/