খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩০ জুলাই রাতে সিসিক নির্বাচনে মেয়র পদে ভোটের ফলাফল ঘোষণার সময় নির্বাচন অফিসের কাছে জেলা ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দিনার ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সদস্য আব্দুর রকিব চৌধুরীর সঙ্গে কমিটি নিয়ে কথা কাটাকাটিতে জড়ান রাজু। সেই ঘটনার রেশ ধরেই রাজুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন দেলোয়ার হোসেন।
নিহত রাজু মৌলভীবাজারের রাজনগর এলাকার বাসিন্দা ফজর আলীর ছেলে। তিনি সিলেট নগরীর উপশহর এলাকার ই-ব্লকে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। রাজু ছাত্রদলের রাজনীতির পাশাপাশি সিলেট ল’কলেজ থেকে এবছর এলএলবি প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় অংশ নেন। তিনি ল’কলেজের ২০১৬-২০১৭ বছরের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রাজু সবার বড়।
দেলোয়ার হোসেনের দাবি, ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সদস্য আব্দুর রকিব চৌধুরীর নেতৃত্বে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। তার গ্রুপের কর্মীরা রাজুকে প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। পাশাপাশি গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে ফেলে রেখে যায়। এরপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে নেওয়া হলে অস্ত্রপচারের পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজুর মাথায় দা দিয়ে আঘাত করা হয়। এছাড়া, তার পিঠে গুলির চিহ্ন রয়েছে। রবিবার (১২ আগস্ট) সকাল ১০টায় রাজুর হত্যা বিষয়টি নিয়ে আমরা বৈঠকে বসবো। এতে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।’ দেলোয়ার হোসেন জানান, গত বৃহস্পতিবার (৯ আগস্ট) রাতে রাজু আমাদেরকে আরিফ (মেয়র) ভাইয়ের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে উপশহরের একটি রেস্টুরেন্টে জন্মদিনের পার্টি দেয়। সেসময় সে সিলেট ছাত্রদলের কমিটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করে। তাকে যে এভাবে হত্যা করা হবে, তা চিন্তাও করতে পারছি না।’
সূত্র জানায়, মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষে শনিবার রাতে বিজয় মিছিল বের হয়। নির্বাচন অফিস থেকে মিছিলটি মেয়রের কুমারপাড়ার বাসায় আসে। সে সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আরিফুল হককে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। রাজুসহ ছাত্রদলের বিদ্রোহী গ্রুপের কয়েকজন এসময় আরিফুল হককে শুভেচ্ছা জানান। এরপর রাজু, উজ্জ্বল ও লিটন মোটরসাইকেল নিয়ে আরিফুল হক চৌধুরীর গলি থেকে বের হয়ে কুমারপাড়া পয়েন্টে আসামাত্রই ৫-৬টি মোটরসাইকেল তাদের গতিরোধ করে। এসময় হামলাকারীরা লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি তাদেরকে পিটিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর তিন জনকেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। হামলা ঠেকাতে রাজু দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পেছন দিক থেকে মোটরসাইকেলে বসা হেলমেট পরিহিত এক যুবক তাকে গুলি করে। এসময় হেলমেট পরিহিত যুবকটি আরও কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে সহপাঠীরা এসে রাজুসহ অন্য দুজনকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যান।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার আব্দুল ওয়াহাব (গণমাধ্যম) জানান, প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দেলের জের ধরে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রাজুর শরীরের একাধিক ধারলো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। এছাড়াও তার শরীরের গুলির আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য তার লাশ সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।
দলীয় সূত্র জানায়, গত ১৩ জুন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকরামুল হাসান স্বাক্ষরিত সিলেট কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে ২৮ সদস্যবিশিষ্ট জেলা কমিটিতে আলতাফ হোসেন সুমন সভাপতি ও দেলোয়ার হোসেন দিনার সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। আর ২৯ সদস্যবিশিষ্ট মহানগর ছাত্রদলের কমিটিতে সুদীপ জ্যোতি এষ সভাপতি ও ফজলে রাব্বী আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কয়েকটি গ্রুপ একত্রিত হয়ে সিলেটে মিছিল ও সভা করে। এমনকি কমিটি বাতিলের দাবিতে প্রত্যাখ্যানকারীরা সিলেটসহ কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়। তারা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দাবি করে— যদি নির্বাচনের আগে সিলেট ছাত্রদলের কমিটি বাতিল না করা হয়, তাহলে তারা বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হকের পক্ষে কাজ করবে না। কেন্দ্রীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতারা নির্বাচনের পর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে আশ্বস্ত করলে বিদ্রোহীরা তখন আরিফুল হকের পক্ষে প্রচারণা নামে।
আরও পড়ুন: সিলেটে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত ১