নুসরাত হত্যা মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী ও বিচারিক আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর হাফেজ আহমেদ বলেন, ‘আইনের শাসনের মূল কথাই হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। অন্যায়কারী শাস্তি পেলে, ভুক্তভোগীরা বিচার পেলে একটি স্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি হয়। যেটি সমাজে একটি শান্তির পরিবেশ তৈরি করে। নুসরাত হত্যাকাণ্ডের রায়ে এখন সেই ধরনের স্বস্তিদায়ক আবহ তৈরি হয়েছে। মানুষ আশা করছেন, উচ্চ আদালতেও দ্রুততম সময়ে এই মামলা নিষ্পত্তির পর অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত হবে। অন্যায় করলে যে পার পাওয়া যায় না এবং একটি সাধারণ পরিবারও যে আইনের সহযোগিতা পায়, সেটিও পরিষ্কার হলো এই রায়ের মধ্য দিয়ে।’
বাদীপক্ষের আরেক অ্যাডভোকেট আকরামুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিবেকবান মানুষ মাত্রই নুসরাত হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ, ব্যথিত ও মর্মাহত হন। তাকে অগুন দিয়ে যে নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হলো, তা নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে জোর দাবি উঠে সমাজের সব পক্ষ থেকে। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার যে ইতিহাস রয়েছে আমাদের, সেই বাধা ঠেলে নুসরাত হত্যার বিচার হবে কিনা, হলেও সেটা কত সময়ের মধ্যে হবে, এসব নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা দূর করে অবশেষে আজ রায় এসেছে। উচিত সাজা পেয়েছে সব অপরাধী।’
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই রায়ের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মাত্র ৬১ কার্য দিবসে মামলা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে, যা বাংলাদেশের বিচারের ইতিহাসে নজিরবিহীন। মানুষের সোচ্চার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধও এই হত্যার বিচারে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আত্মহত্যা বলে গুজব চাউর করেও নিজেদের বাঁচাতে পারেনি ঘাতকরা। এছাড়া গণমাধ্যমের ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়। মূলত সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ন্যায়বিচারের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। এবং তা হয়েছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে।’
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা রায়ে সন্তুষ্ট নন। দ্রুত রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে যাবেন এবং আপিল আবেদন করেন। আহসান কবির বেঙ্গল বলেন, ‘আসামিরা ন্যায়বিচার পাননি। তাদের ওপর অবিচার হয়েছে। একটি আত্মহত্যার ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আমরা সাত কার্যদিবসের মধ্যেই হাইকোর্টে আপিল করবো।’
ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে হাত-পা বেঁধে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আসামিদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এই টাকা আদায় করে নুসরাতের পরিবারকে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ আজ বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টা ২১ মিনিটে এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি মানুষের সামনে আনার জন্য সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ। রায় শুনে আসামিরা কান্নায় ভেঙে পড়ে।
দণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামিরা হলো—সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
নুসরাত হত্যা মামলায় বাদীপক্ষে ছিলেন বিচারিক আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর হাফেজ আহমেদ, অ্যাডভোকেট আকরামুজ্জামান ও অ্যাডভোকেট এম শাহজাহান সাজু।
আর আসামিপক্ষে ছিলেন হাইকোর্টের আাইনজীবী অ্যাডভোকেট ফারুক আহমেদ ও এনামুল হক, ফেনী আদালতের সিনিয়র আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু, কামরুল হাসান, নূরুল ইসলাম, ফরিদ উদ্দিন নয়ন ও মাহফুজুল হক, আহসান কবির বেঙ্গল, সিরাজুল হক মিন্টুসহ ২০ জন আইনজীবী।
আরও পড়ুন...
নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড
রায় শুনে কান্নায় ভেঙে পড়ে আসামিরা
নুসরাত হত্যা মামলার রায় আজ, ফেনীতে নিরাপত্তা জোরদার
রায়কে ঘিরে নিরাপত্তা শঙ্কায় নুসরাতের পরিবার
এখনও পড়ার টেবিল গুছিয়ে রাখেন নুসরাতের মা
সর্বোচ্চ সাজার প্রত্যাশা বাদীপক্ষের, আসামিপক্ষের আশা ‘বেনিফিট অব ডাউট’
‘আপুকে ফিরে পাবো না, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে কিছুটা শান্তি পাবো’
ছয় মাস ধরে ঘুম নেই নুসরাতের মায়ের চোখে (ভিডিও)