‘চুরি’র উদ্দেশ্যেই ইউএনও’র ওপর হামলা চালানো হয়: র‌্যাব

র‌্যাবের হাতে আটক দুই আসামি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াহিদা খানমের সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে প্রবেশ করে তাকে ও তার বাবাকে হাতুড়ি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর আহত করার ঘটনার প্রধান আসামি আসাদুল হক’সহ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। বাকি দুজন হলেন হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী নবিরুল ও মিশনে অংশ নেওয়া সান্টু কুমার বিশ্বাস।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসাদুল হক ইউএরও ওপর হামলা করে তাকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টার কথা স্বীকার করেছে। সেই সঙ্গে এ ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন নবিরুল ইসলাম। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধা ৭টায় রংপুর নগরীর ষ্টেশন এলাকায় র‌্যাব ১৩ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন রংপুর র‌্যাব ১৩ প্রধান কমান্ডার রেজা আহাম্মেদ ফেরদৌস।

র‌্যাব জানায়, ২ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে সন্ত্রাসীরা ইউএনও ওয়াহিদা খানমের সরকারি বাসভবনের দোতলার ভেন্টিলেটর কেটে তার শয়ন কক্ষে প্রবেশ করে এবং ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর শেখকে হাতুড়ি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরতর আহত করে। এ ঘটনায় ওয়াহিদা খানমের ভাই শেখ ফরিদ উদ্দিন বাদী হয়ে ঘোড়াঘাট থানায় মামলা দায়ের করেন। রুজুর পর র‌্যাব ১৩ রংপুর চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির ছায়া তদন্ত শুরু করে।

৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টা পর্যন্ত দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট, হাকিমপুর, বিরামপুর থানার বিভিন্ন এলাকায় হামলার সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালায়। প্রথমে হাকিমপুর উপজেলার কালিগজ্ঞ এলাকা থেকে অসাদুল হককে গ্রেফতার করা হয়। তার বাবার নাম আমজাদ হোসেন। বাড়ি উপজেলার সাগরপুর গ্রামে। ।

ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর সে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে ঘোড়াঘাট এলাকা থেকে ফরাস উদ্দিনের ছেলে নবিরুল ও খোকা চন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে সান্টু কুমার বিশ্বাসকে গ্রেফতার করা হয়। তারা সকলেই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা জানায়। পরে তাদের জবানবন্দি অনুযায়ী তল্লাশি চালিয়ে ঘটনাস্থলের সিসি টিভির ফুটেজে প্রাপ্ত একজন আসামির চুন মাখা লাল টি-শার্ট উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে নবিরুল ও আসাদুল মুল পরিকলপনাকারী।  কিন্তু কি কারণে তারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে তা নিশ্চিত হতে হলে তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে র‌্যাব ১৩ প্রধান জানান, এ ঘটনায় র‌্যাবের সাফল্য হচ্ছে আসামি আসাদুলের স্বীকারোক্তি নেওয়া। আসাদুলের দাবি অনুযায়ী এটি নিছক চুরির অভিপ্রায় থেকে সংঘটিত ঘটনা। তবে মোটিভ বের করার জন্য আমাদের আরও গভীর তদন্ত ছাড়া মন্তব্য করা যাবে না। তিনি বলেন, চূড়ান্ত কোনও মন্তব্য করার মতো সময় এখনো আসেনি।

প্রসঙ্গত, বুধবার দিনগত রাত আড়াইটার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ইউএনও'র সরকারি বাসভবনে ঢুকে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। প্রথমে গেটে দারোয়ানকে বেঁধে ফেলে তারা। পরে বাসার পেছনে গিয়ে মই দিয়ে উঠে ভেনটিলেটর ভেঙে বাসায় প্রবেশ করে হামলাকারীরা। ভেতরে ঢুকে ভারী ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং আঘাত করে ইউএনও ওয়াহিদাকে গুরুতর আহত করে তারা। এ সময় মেয়েকে বাঁচাতে এলে বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখকে (৭০) জখম করে দুর্বৃত্তরা। পরে তারা অচেতন হয়ে পড়লে মৃত ভেবে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। ভোরে স্থানীয়রা টের পেয়ে তাদের উদ্ধার করেন।

ওয়াহিদাকে প্রথমে রংপুরে ও পরে রংপুর থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে ঢাকায় আনা হয়। বর্তমান তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে ইউএনও ওয়াহিদার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমানের নেতৃত্বে তার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। রাত সোয়া ৯টা থেকে শুরু হয়ে রাত সোয়া ১১টা পর্যন্ত চলে এই অস্ত্রোপচার।

অস্ত্রোপচারের পর ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘যখন প্রথম তাকে নিয়ে আসা হয় তখন ব্যান্ডেজ করা ছিল, অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়ার পর দেখা যায় মাথায় মোট ৯টা আঘাতের চিহ্ন। একটা খুব বড়, যার ভেতর দিয়ে হাড় ভেঙে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। বাকি আটটা ইনজুরি ছিল। তার ভেতরে ছিল মাথার দুই পাশে তিনটা করে ছয়টি, মুখের ওপরে একটি, নাকের ওপরে একটি এবং চোখের নিচে একটি। ভেতরে ঢুকে যাওয়া হাড় বের করা হয়েছে, রক্তক্ষরণ বন্ধ করা হয়েছে। অন্য আঘাতগুলোও সব রিপেয়ার করা হয়েছে। আমরা আশাবাদী। তবে এটা হেড ইনজুরি, ব্রেইনের ভেতরে রক্তক্ষরণের ব্যাপার। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন কিনা এখনই আমরা বলতে পারবো না। তাকে অন্তত ৭২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার পর বলতে পারবো। শরীরের ডান পাশ প্যারালাইজড ছিল, সেটা আশা করি সচল হয়ে যাবে। তবে তাতে সময় লাগবে।‘

আরও পড়ুন-

ইউএনও’র ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে: কাদের 

‘জাহাঙ্গীর ও আসাদুলের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সেই প্রশ্ন আমারও’

অস্ত্রোপচার সফল হলেও আশঙ্কামুক্ত নন ইউএনও ওয়াহিদা

ডান সাইড প্যারালাইজড হয়ে গেছে ওয়াহিদার

ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলায় দুই জন আটক

ইউএনও’র ওপরে হামলার ঘটনায় মামলা

ইউএনও’র ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি

এটা সিরিয়াস ক্রাইম: রংপুর বিভাগীয় কমিশনার

ইউএনও’র ওপর হামলাকারী ছিল পিপিই পরা

ইউএনও’র ওপর এমন হামলা বিশ্বাস করতে পারছেন না কেউ

ইউএনও ও তার বাবাকে কুপিয়ে ‘মৃত ভেবে’ ফেলে রেখে যায় হামলাকারীরা

ভেন্টিলেটর ভেঙে বাসায় ঢুকে ইউএনও’র ওপর হামলা