আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে পাহাড়ধসের দুর্গতরা

বন্ধ করে দেওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন দুর্গতরা (ছবি: প্রতিনিধি)জুনে পাহাড় ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খোলা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো গত ৭ সেপ্টেম্বর বন্ধ করে দিয়েছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। পাহাড় ধরে ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল হারানো হাজারো ঠাঁই নিয়েছিলেন শহরের ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে। প্রায় তিন মাস এসব আশ্রয়কেন্দ্রেই দিন কাটিয়েছেন তারা। এই সময়ের মধ্যেও নিজেদের ফিরে যাওয়ার কোনও জায়গা করতে পারেননি অনেকে। ফলে থাকা-খাওয়া নিয়ে সংকটে পড়ে গেছেন তারা। কোথায় যাবেন, কী খাবেন, এসবের কূল-কিনারা করতে না পারলেও আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান দুর্গত এই মানুষগুলো।

আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ১৫-২০ জনের মতো সেখানে রয়ে যান। তবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পানির সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারাও এখন সরে যাচ্ছেন।  এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে পশ্চিম দেবাশিষ নগর এলাকার লিপিকা চাকমা বলেন, ‘এখানে থাকার মতো কোনও পরিস্থিতি নেই। তাই ভাড়া বাসায় চলে যাব।’ আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে বলার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘এরকম হলে আমাদের আগেই টাকা-পয়সা দিয়ে দিত। আমরা পুরনো বাড়ি মেরামত করে থাকতাম। এখন প্রায় তিন মাস পর হঠাৎ করে আমাদের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে চলে যেতে বলা হয়েছে। সরকার আমাদের পুনর্বাসন করবে বলে বেঈমানি করেছে।’

আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন জগদীশ চামকা। সিলেটে স্বল্প বেতনের বেসরকারি চাকরি করতেন তিনি। পাহাড় ধসের খবর শুনে কোম্পানির কাছে ছুটি চাওয়ায় চার দিন পরও ছুটি না পাওয়ায় চাকরি ছেড়ে পরিবারের কাছে ছুটে আসেন। তিন মাস পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন। কিন্তু এবার কোথায় যাবেন তা নিয়ে দিশেহারা বলে জানান তিনি। আর জগদীশ চাকমার স্ত্রী জয়া চাকমা বলেন, ‘১৩ জুন থেকেই আমার দেড় বছরের বাচ্চা জ্ঞানবীরকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছি। আমাদের বার বার পুনবার্সন করার কথা বললেও কিছুই করেনি সরকার। এখন ত্রিশ কেজি চাল আর এক হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ছাড়তে বলছে। কিন্তু এই সামান্য টাকা আর চাল নিয়ে আমরা কোথায় যাবো?’আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে কোথায় যাবেন ভাবছেন পাহাড়ধসের দুর্গতরা (ছবি প্রতিনিধি)

জয়া চাকমার মতো পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছেন ভেদভেদী কিনামনি পাড়ার হিরো বড়ুয়াও। তিনি বলেন, ‘আগের বাসায় থাকার মতো অবস্থা নেই। তাই দুই ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে থেকে গেলাম আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু এখন কী করবো!’

তিনি আরও বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বৈদ্যুতিক পাখাগুলো সরিয়ে নিয়ে গেছে। গরমে মরছি আমরা। অন্যদিকে পানির ট্যাংকের পানিও ফুরিয়ে গেছে। পানি সংকট আর গরমে এখানে আর থাকারও অবস্থা নেই। আমরা তিন পরিবার মিলে মাসে পাঁচ হাজার টাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়েছি। কিন্তু কোনও কাজের সন্ধানও পাচ্ছি না।’

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত একশ’ ৪০টি পরিবারের মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্তদের ছয় হাজার করে টাকা, দুই বান্ডেল টিন ও ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আংশিক ক্ষতিগ্রস্তদের এক হাজার টাকা ও ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। সরকার থেকে বরাদ্দ পেলে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ভবিষ্যতে তা বিতরণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে গত তিন মাসব্যাপী বিদ্যুৎ, ফ্যান, পানির লাইন, দুই বেলা খাবার ও চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

উল্লেখ্য, গত ১৩ জুন রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসে পাঁচ সেনাসদস্যসহ একশ’ ২০ জন নিহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১২ হাজার সাতশ’ ৫৩টি পরিবার। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত এক হাজার দুইশ’ ৩১ ও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৯ হাজার পাঁচশ’ ৩৭টি পরিবার। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় মানুষদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার ব্যবস্থা করেছিল স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু পাহাড় ধসের পর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রাঙামাটি পৌরসভার ছয় নম্বর ওয়ার্ডের একশ’ ৪০ পরিবারকে সরকারি ত্রাণ সহায়তার মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বিদায় দেওয়া হয় গত ৫ সেপ্টেম্বর। ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকিদেরও বিদায় করে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন- 'এতদিন তো মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল, এখন তো রাস্তায় নামিয়ে দিলো’