ডুবেছে চট্টগ্রাম নগরী: প্রকল্প নিয়ে মেয়র ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ঠেলাঠেলি

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করতে পারে না বলেই সিডিএকে এ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। কারণ জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশন অযোগ্য।’ বুধবার (৯ আগস্ট) দুপুরে সিডিএর সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

এর আগে গত ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতা সমস্যার বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘জলাবদ্ধতার ভয়াবহ অবস্থা তৈরির জন্য সিডিএ দায়ী। সিডিএ জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নে যোগ্য নয়। কোটি টাকা খরচ হলেও জলাবদ্ধতা নিরসন হয়নি।’

সর্বশেষ ৭ আগস্ট নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজে সিডিএ সমন্বয় করছে না অভিযোগ তুলে ক্ষোভ জানান মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নেই। এরপরও মানুষজন সিটি করপোরেশনকে গালিগালাজ করছে। জলাবদ্ধতা নিয়ে গত রবিবার সকালে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন মেয়র। সেখানে তিনি লেখেন, ‘তারা (সিডিএ) করপোরেশনকে কোনও কিছুই জানায়নি। ইচ্ছামতো কাজ করছে। এত বড় একটি প্রকল্প, চট্টগ্রামবাসীর বাঁচা-মরারও প্রশ্ন, এরপরও তারা সমন্বয় করছে না।’

মূলত সিটি মেয়রের এসব বক্তব্যের জেরেই সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে সিডিএ। মেয়রের এমন বক্তব্য সত্য নয় উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে সিডিএর চেয়ারম্যান বলেন, ‘সিডিএ যোগ্য না হলে প্রকল্প দিয়েছে কেন? বরং তারা যোগ্য নয় বলে এই সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পায়নি। এবার ভারী বৃষ্টিতেও ডুবেনি চাকতাই-খাতুনগঞ্জ। কারণ সেখানে স্লুইসগেট বসানো হয়েছে। এতে নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে কোটি কোটি টাকার পণ্য। এটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণেই হয়েছে। অতীতে অল্প বৃষ্টিতেই ডুবে যেতো চাকতাই-খাতুনগঞ্জ।’

সংবাদ সম্মেলনে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিচালক লে. কর্নেল শাহ আলী বলেন, ‘পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনরায় খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন শীর্ষক সিডিএর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী। প্রকল্পের অধীনে নগরীর ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টির সংস্কার ও সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। বাকি ২১টি প্রকল্পের আওতাভুক্ত নয়। ৩৬টি খালের মধ্যে ১৬টির সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। ৯টি খালের কাজ চলমান। বাকি ১১ খালের কাজ শেষ করতে সময় লাগবে। কারণ এসব খালের জমি অধিগ্রহণ শেষ করতে পারেনি সিডিএ। তবে প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় এবং ২১টি খাল সংস্কার না করায় সুফল মিলছে না। নগরীতে এক হাজার ৬০০ নালা আছে। এসব নালা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এসব কাজ বাস্তবায়ন হলে সুফল মিলবে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ দিন ধরে জলাবদ্ধ অবস্থায় আছে চট্টগ্রাম নগরী। গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিতে নগরীর বেশিভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়েন লাখো মানুষ। তবে মঙ্গলবার বিকাল থেকে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে। কিছু জায়গা থেকে পানি নেমে গেছে। তবে সাধারণ মানুষের মাঝে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এত টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি না মেলায় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চার প্রকল্পের কাজ চলমান। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনরায় খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক সিডিএর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী। ২০১৭ সালের আগস্টে প্রকল্পটির অনুমোদন হয়। পরের বছর কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; যা অনুমোদনের অপেক্ষায়।

বাকি তিন প্রকল্পের মধ্যে এক হাজার ৬২০ কোটি ৭৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ‘নগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পাশাপাশি দুই হাজার ৭৪৬ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ টাকায় ‘কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুঘাট সেতু থেকে চাকতাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। এ ছাড়া এক হাজার ৩৭৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বহদ্দারহাটের বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খননের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিটি করপোরেশন।

আরও পড়ুন: জলাবদ্ধতার কারণ খুঁজতে সভা করেছে চসিক