ওয়াশরুমের ছাদে লুকিয়ে পুলিশকে ছয় গুলি—রুদ্ধশ্বাস অভিযানে ধরা পড়লো মোবারক

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ওয়াশরুমের ফলস ছাদে লুকিয়ে থাকা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ‘গলা কাটা মোবারককে’ গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযান চলাকালীন তিনি ফলস ছাদ থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করেন। কয়েক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালিয়ে গতকাল বুধবার ভোরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার তিন সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

গ্রেফতার মোবারক হোসেন কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত। তিনি রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ একাধিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

পুলিশ জানায়, গত কয়েকদিন ধরে বেশ কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়েও মোবারক ওরফে ‘গলা কাটা মোবারককে’ গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের একটি বাড়িতে মোবারকের অবস্থানের খবর পেয়ে পুলিশ তাই সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। বাড়ির লোহার দরজা ভেঙে ভেতরের একটি ওয়াশরুমে প্রবেশ করতেই ফলস ছাদ থেকে পুলিশের ওপর গুলি চালাতে থাকেন মোবারক। পরপর ছয়টি গুলি করেন। এতে আহত হন চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য। একপর্যায়ে মোবারকের গুলি আটকে যায়, তখনই পুলিশ তাকে নামিয়ে এনে গ্রেফতার করে ফেলে। ওই বাড়ি থেকে মোবারকের তিন সহযোগীকেও গ্রেফতার করে পুলিশ। 

তারা হলেন- মো. রায়হান, মো. ফরিদ ও মো. নাছির। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় তিনটি পিস্তল এবং পিস্তলের ২৩টি ও শটগানের চারটি গুলি। অভিযানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ ছাড়াও ফটিকছড়ি থানার ওসি রবিউল আলম খান, তারেক আজিজের দেহরক্ষী পুলিশ কনস্টেবল মামুনুর রশিদ, ফটিকছড়ি থানার কনস্টেবল শাহ নেওয়াজ ও সাদ্দাম হোসেন আহত হন। তারা চিকিৎসা নিয়েছেন।

যেভাবে গ্রেফতার

অভিযানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ। অভিযানের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ২৯ জুলাই ডেভিড ইমনকে গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায় মোবারক ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রয়েছেন। এ জন্য সেখানে পুলিশ কয়েক দফায় অভিযান চালায়; কিন্তু ধরা যায়নি। সর্বশেষ গত সোমবার ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মোবারকের সহযোগী আরাফাত, মো. মুন্না, ইকবাল ও বাবুলকে গ্রেফতার করা হয়।’ 

তারেক আজিজ বলেন, ‘নিজেকে পাহাড়ে নিরাপদ মনে না করে মোবারক ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় তার পূর্বপরিচিত একটি বাসায় অবস্থান নেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর মোবারক যে বাসায় অবস্থান নিয়েছিলেন সেখানে গত মঙ্গলবার রাত ৩টার দিকে পুলিশ বাসাটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। কিন্তু বাসার দরজা ছিল লোহার তৈরি। বারবার পুলিশ বলার পরও দরজা খোলা হয়নি। গত ২৯ জুলাই নোয়াখালীতে সন্ত্রাসী রায়হানকে ধরতে পুলিশ যাওয়ার পর তিনি বাসার ছাদ টপকে পালিয়ে যান। বাসাটির ছাদ থেকে লাফিয়ে রায়হানের মতো মোবারকও পালাতে পারেন, সেজন্য পুলিশ সদস্যরা দেয়াল টপকে বাসার ছাদেও অবস্থান নেন। দেড় ঘণ্টা পুলিশ সদস্যরা ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে লোহার দরজাটি ভাঙা হয়। তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে ৪টা।’

৫ আগস্ট থানা থেকে লুট হয়েছিল পুলিশের অস্ত্রটি

তিনি বলেন, ‘পুলিশ বাসাটিতে ঢোকার পর ওয়াশরুমের ওপরে থাকা ফলস ছাদে মোবারকের সহযোগী রায়হানকে পাওয়া যায়। তাকে সেখান থেকে ধরা হয়। এভাবে ফলস ছাদের ভেতর থেকে নাছির ও ফরিদকে ধরা হয়। সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ভেতর থেকে গুলি করতে পারে, সে জন্য সতর্কতার সঙ্গে অভিযান দলটি এগোয়। একপর্যায়ে বাসার ভেতরের কক্ষের একটি ওয়াশরুমের ফলস ছাদের ওপর মোবারককে পাওয়া যায়। পুলিশ ওই কক্ষে ঢুকতেই মোবারক তার হাতে থাকা ব্রাজিলের তৈরি তরাস পিস্তল থেকে গুলি করতে থাকেন। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। একে একে ছয়টি গুলি করেন মোবারক। পুলিশ গুলি করে মোট সাতটি। একটি গুলি তারেক আজিজের কানের পাশ দিয়ে যায়। মোবারক সপ্তম গুলিটি করার সময় আটকে যায়। পরে তাকে ফলস ছাদ থেকে নামিয়ে আনা হয়। তার হাতে থাকা পিস্তলটি উদ্ধার করে পুলিশ। এটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র। মোবারককে গ্রেফতারের পর ফটিকছড়ি ও রাউজানে অস্ত্র উদ্ধারে বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়।’

তারেক আজিজ বলেন, ‘গ্রেফতারের পর অস্ত্র লুট ও পুলিশের ওপর হামলা—এ দুই মামলায় আদালতে মোবারকের রিমান্ড চাওয়া হয়। বৃহস্পতিবার আদালত চার দিন করে মোট আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ফটিকছড়ি থানায় দায়ের করা অস্ত্র ও পুলিশের ওপর হামলার পৃথক দুই মামলায় তাদের এ রিমান্ড মঞ্জুর হয়।’

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘মোবারক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। পাহাড়ের দুর্গম এলাকাকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতেন। এ কারণে পুলিশ সহজে তাকে ধরতে পারতো না। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ খবর পেয়ে মোবারককে তার চার সহযোগীসহ গ্রেফতার করে। রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। অভিযানে একটি ৯ এমএম বিদেশি পিস্তল, একটি ৭ দশমিক ৬৫ এমএম বিদেশি পিস্তল, একটি বিদেশি রিভলবার ও একটি দেশীয় তৈরি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া গুলি, তিনটি ম্যাগাজিন ও গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।’