কবে খুলবে ইয়াঙ্গুন-টেকনাফ বাণিজ্যপথ?

আগে নাফ নদীপথে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব থেকে পণ্য আসতো টেকনাফ স্থলবন্দরে। জাহাজ ও নৌযানের আনাগোনায় সরগরম থাকতো বন্দর এলাকা। কর্মব্যস্ত থাকতেন শত শত শ্রমিক ও ব্যবসায়ী। কিন্তু মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির দীর্ঘ সংঘাতের কারণে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে এই বাণিজ্যপথ।

এর মধ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা মংডুর সঙ্গে গত চার মাস ধরে সীমিত পরিসরে আমদানি-রফতানি চালু হলেও আগের কর্মচাঞ্চল্য ফেরেনি টেকনাফ স্থলবন্দরে। বরং এ সময়ে আমদানির তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি পণ্য রফতানি হয়েছে। 

বন্দর ও কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে মংডু থেকে টেকনাফে ১ হাজার ৮২৭ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে মংডুতে রফতানি হয়েছে ৪ হাজার ৮০৭ মেট্রিক টন পণ্য। একই সময়ে আমদানি থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৮ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ৫৩৬ টাকা।

ব্যবসায়ীদের দাবি, মংডুর সঙ্গে সীমিত বাণিজ্যে চাহিদা কম থাকায় বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হচ্ছে না। মূল বাণিজ্য ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াবের সঙ্গে হওয়ায় ওই রুট দুটি বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও বন্দরসংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন—কবে ফিরবে ইয়াঙ্গুন-আকিয়াবের সেই পুরোনো বাণিজ্য?

বন্দরে নেই আগের কর্মচাঞ্চল্য

সরেজমিনে দেখা যায়, টেকনাফ সদরের কেরুনতলী এলাকায় স্থলবন্দরে আগের তুলনায় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা অনেক কম। মংডু থেকে আসা ঘাটে মাছবোঝাই একটি ছোট নৌকা নোঙর করে আছে। অন্যদিকে টেকনাফ থেকে মংডুতে পাঠানোর জন্য আলু, কেক, প্লাস্টিকের চেয়ার, ময়দা, ডিম ও টাইলসসহ বিভিন্ন পণ্য ট্রাক থেকে ট্রলারে তোলা হচ্ছে।

আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য নেই

টেকনাফ স্থলবন্দরের শ্রমিক নেতা আজগর আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌আগে বন্দরে ৮০০ থেকে ১ হাজার শ্রমিক নিয়মিত কাজ করতেন। এখন মাত্র ১০০ থেকে ২০০ শ্রমিক কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে মূল বাণিজ্য বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের দুর্দিন যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যেও হতাশা বিরাজ করছে।

আমদানির চেয়ে চার গুণ রফতানি

বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে মিয়ানমারের মংডুর সঙ্গে সীমিত পরিসরে আমদানি-রফতানি শুরু হয়েছে। এ সময়ে দেড় হাজারের বেশি ট্রাকে বিভিন্ন পণ্য বাণিজ্য হয়েছে।

মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত মংডু থেকে ১ হাজার ৮২৭ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়। এসব পণ্য থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৮ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ৫৩৬ টাকা।

অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে মংডুতে রফতানি হয়েছে ৪ হাজার ৮০৭ মেট্রিক টন পণ্য। এসব পণ্যের মূল্য প্রায় ৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা বা ৩২ লাখ ৫৩ হাজার ৫২১ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ চার মাসে মংডুর সঙ্গে আমদানির তুলনায় রফতানির পরিমাণ প্রায় চার গুণ।

বাংলাদেশ থেকে মংডুতে রফতানি হচ্ছে আলু, ময়দা, ডিম, প্লাস্টিকের চেয়ার, টাইলস, ছাতা, স্যান্ডেল ও সাইকেলের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন পণ্য। বিপরীতে মিয়ানমার থেকে আসছে কাঠ, আইএনসি, কাঁকড়া ও নাইল্যা শুঁটকিসহ বিভিন্ন পণ্য।

বাণিজ্য বন্ধের শুরু যেভাবে

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের ১৬ জানুয়ারি ইয়াঙ্গুন থেকে টেকনাফের উদ্দেশে আসার পথে নাফ নদীতে পণ্যবাহী তিনটি বোট আটক করে আরাকান আর্মি। ১৬ দিন পর বোটগুলো ছেড়ে দেওয়া হলেও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে এরপর থেকে ইয়াঙ্গুন-আকিয়াব রুটে বাণিজ্য বন্ধ রাখে মিয়ানমার সরকার।

স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানিকারক ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘সীমান্ত বাণিজ্যের মূল অংশ ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব বন্দরের সঙ্গে। সংঘাতের কারণে এসব রুট বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা হতাশায় রয়েছেন। তবে গত চার মাস ধরে মংডুর সঙ্গে টেকনাফ স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানি চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকে বকেয়া থাকা এফডিডি ড্রাফটগুলো রসুন ও আদা ছাড়া অন্যান্য পণ্যের বিপরীতে খালাসের অনুমতি দেওয়া হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরতো। বিষয়টি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

১৫ শতাংশ কার্যক্রম সচল

টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট টেকনাফ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেড় বছরের বেশি সময় ধরে ইয়াঙ্গুন-আকিয়াব থেকে পণ্য আসা-যাওয়া বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানও লোকসানে রয়েছে। বর্তমানে মংডুর সঙ্গে সীমিত পরিসরে আমদানি-রফতানি চলছে। বলতে গেলে, বন্দরের মাত্র ১৫ শতাংশ কার্যক্রম সচল রয়েছে। বাণিজ্যপথ চালু না হওয়ায় বন্দরের আয় ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা লেগেছে।’

কমেছে রাজস্বও

টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব থেকে পণ্য আসা বন্ধ থাকলেও মংডুর সঙ্গে গত চার মাস ধরে বাণিজ্য চলছে। এতে সরকার ৮ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ৫৩৬ টাকার বেশি রাজস্ব পেয়েছে। তবে ইয়াঙ্গুন-আকিয়াব বাণিজ্য বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে।’

তিনি জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪৯ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি থেকে সরকার প্রায় ২৯৫ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। পরের অর্থবছরের একই সময়ে, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি কমে প্রায় ১১ হাজার মেট্রিক টনে নেমে আসে। ওই সময়ে রাজস্ব আদায় হয় প্রায় ৯১ কোটি টাকা। মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।’

পুরোপুরি সচল করতে সরকারের চেষ্টা চলছে

মিয়ানমারের সংঘাতের কারণে ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব বন্দর থেকে পণ্য আসা বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের সংঘাতের কারণে ইয়াঙ্গুন ও আকিয়াব বন্দর থেকে পণ্য আসা বন্ধ রয়েছে। তবে মংডুর সঙ্গে থেমে থেমে বাণিজ্য চলছে। স্থলবন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি সচল করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’