ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী এলাকার অন্যতম গ্যাসক্ষেত্র সালদা ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইনে ছিদ্র করে গ্যাস চুরির দুঃসাহসিক চেষ্টা করেছে একটি চোরাই চক্র। তবে গ্যাস লাইনে ছিদ্র করার পর তীব্র গতিতে গ্যাস বের হতে থাকায় বিপাকে পড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় চক্রটির সদস্যরা।
উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইনে ছিদ্র করায় বিকট শব্দে গ্যাস বের হওয়ার আওয়াজে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক দেখা দেয়। গ্যাস নির্গমন থেকে অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। পরে শনিবার দিনভর সঞ্চালন লাইনটি মেরামতের চেষ্টা করেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এলাকাবাসী এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে জানা যায়, গত বুধবার রাতে ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের ধোপাখলা, সাগরতলা ও নোয়াপাড়া এলাকার নির্জন গ্রামীণ সড়কের পাশে সালদা-বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস সঞ্চালন লাইনে ছিদ্র করে গ্যাস চুরির চেষ্টা করা হয়।
আবাসিক ও বাণিজ্যিকভাবে চুনের কারখানায় গ্যাস সরবরাহের উদ্দেশ্যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওই সঞ্চালন লাইনে ছিদ্র করে সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে চোরাই চক্রের সদস্যরা। তবে লাইনে থাকা গ্যাসের তীব্র চাপের কারণে একপর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা।
এদিকে গ্যাস বের হওয়ার বিকট শব্দে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন জানান, চোরাই চক্রের সদস্যরা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস লাইনে ছিদ্র করে গ্যাস চুরির চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কোনও রকমে সেটি ধামাচাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর থেকেই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস লাইনের শব্দ ও নির্গত গ্যাসকে কেন্দ্র করে এলাকায় আগুন আতঙ্ক দেখা দেয়। পরে শনিবার দিনভর বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড কর্তৃপক্ষ চোরাই চক্রের ফুটো করা গ্যাস লাইনটি মেরামতের চেষ্টা করে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম মিয়া বলেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে এই গ্যাস লাইন ছিদ্র করা সম্ভব না। আর দ্বিতীয়ত এখানে যিনি বিতরণ লাইনের দায়িত্বে আছেন, তার বাড়ির পাশে, তার জমিতেই এই ঘটনা ঘটেছে। তার জমিতে একটা গাছ দিয়া গাছ কাটবো—এমন সাহস এই এলাকার কারও হয় নাই। অথচ তার জায়গায় এই কাজটা হইছে রাতের আঁধারে। তার বাড়ির পাশে, মানে যে লাইনের দায়িত্বে আছে তার বাড়ির পাশে এ কাজগুলো হইছে। দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনা হোক। আমরা তাদের শাস্তি দাবি করছি।
এলাকার বাসিন্দা মো. মমিন জানান, ঘনবসতি এলাকা। এখানে দেখেন বসতি বাড়ি আছে অনেক। হাজার হাজার মানুষ এখানে বসবাস করছে। যদি এখান থেকে আগুন ধইরা যেতো, কি যে অবস্থা হইতো। চক্রটি রাতের আঁধারে এই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইন থেকে অবৈধভাবে ছিদ্র করে গ্যাস চুরি করার চেষ্টা করেছে। ছিদ্র করে দুইটা লাইন নিয়েছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নাই। দেখেন, গ্যাসের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইন বন্ধ করার পরেও কীভাবে আওয়াজ হচ্ছে। আমরা গ্যাস চুরির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের জিএম (অপারেশন) জাহিদুর রেজা বলেন, ‘এটা তো একটি হাই প্রেসার লাইন। হাই প্রেসার লাইন বলতে এক পাশে হলো সালদা গ্যাস ফিল্ড আর ওই দিকে হলো বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড। এই দুইটা গ্যাস ফিল্ডের মাঝখানে এটা হলো ১০ ইঞ্চি পাইপলাইন। এটা আমরা অপারেট করতেছিলাম ৬০০ পিএসআই দিয়ে। এই ৬০০ পিএসআই লাইনে কে বা কাহারা এখানে ফুটো করে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। এখান থেকে আপনারা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছেন যে, দুটি অফটেক বের করছে। তার মধ্যে একটিতে তারা কানেকশন দিতে—অর্থাৎ পাইপটা ছিদ্র করছে—আর একটিতে করতে পারে নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার এসে আমরা মাটি খুঁড়ে জিনিসটা দেখলাম যে কী করছে। তো আমরা জানতে পারছি যে, এখান থেকে তারা কেউ গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তো সেদিনই আমাদের ভিজিল্যান্স ডিপার্টমেন্টকে আমরা কল করি। তারা এই এলাকায় ড্রোন দিয়ে সার্ভে করে দেখছে যে, পার্শ্ববর্তী কোল্লা পাথরে তারা একটি চুন ফ্যাক্টরি পাইছে। আর ওই চুন ফ্যাক্টরিটা হলো লো প্রেসার লাইন, অর্থাৎ আমার বাসাবাড়ির যে লাইনটা আছে, সে লাইন থেকে নিয়ে চুন ফ্যাক্টরি করছে।’
জাহিদুর রেজা বলেন, চুনের ফ্যাক্টরিটা আমরা এখন প্রায় বন্ধ অবস্থায় পাইছি। বন্ধ মানে হয়তোবা ওই প্রেসার দিয়ে তারা চালাইতে পারে নাই। আমি যেটা সাসপেক্ট করতেছি, তারা লো প্রেসারে যেহেতু গ্যাস পাচ্ছিল না, এখান থেকে গ্যাস নিয়ে আশেপাশে কোথাও শিফট করার মতো জায়গায় তারা চিন্তাভাবনা করতেছিল।’
তিনি বলেন, আমরা এখন গ্যাস ফিল্ডের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইনের গ্যাসটা বন্ধ রেখে, ওই দিকে ওদেরকেও ইনফর্ম করে, অর্থাৎ বাপেক্স এবং বিজিসিএলের সঙ্গে আমরা যৌথভাবে এই লাইনের গ্যাসটা বন্ধ করে মাঝখানের গ্যাসটুকু বাতাসে ছেড়ে দিয়ে এখন আমরা এটাকে কিল করতেছি। ওরা যা যা করছিল, কারণ ওদের তো এগুলোর কোনও বৈধতাও নাই। যেকোনো সময় এটা ফেটে একটা বড় ধরনের দুর্ঘটনা হতে পারতো। আমরা এটাকে কেটে অ্যাজ ইউজুয়াল পাইপলাইনে নিয়ম অনুযায়ী যা যা করার, সেটা করার চেষ্টা করতেছি।’
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সালদা গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে। ১৯৯৮ সালের ২৮ মার্চ থেকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে তিনটি কূপ থেকে গড়ে সাড়ে ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।