ঈদ শুভেচ্ছার আড়ালে ‌‘দৃষ্টিকটু আত্মপ্রচারণা’

ঈদ শুভেচ্ছা সংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ও গেট নির্মাণে ছেয়ে গেছে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা। দুটি রাজনৈতিক দলের নেতারাই মূলত এবার ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তবে এই শুভেচ্ছা সংবলিত ফেস্টুন সাঁটানোর মধ্যে সরকারদলীয় নেতারাই এগিয়ে রয়েছেন। তারা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগাম প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিরা। তবে এটিকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দৃষ্টিকটু আত্মপ্রচারণা বলে জানিয়েছে সচেতন নাগরিক ফোরাম।

সরেজমিনে দেখা যায়, জনবহুল স্থান, বাজার এলাকা, জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে মোড়ে ঈদ শুভেচ্ছা সংবলিত ফেস্টুন-ব্যানারের ছড়াছড়ি। রাস্তার পাশে, বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছে ঝোলানো রঙিন ব্যানারে ‘ঈদ মোবারক’ শুভেচ্ছা বার্তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ছবি ও নাম। টানানো এসব পোস্টার ও ব্যানারে ঈদের শুভেচ্ছার পাশাপাশি নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরছেন তারা। অনেকেই নিজেদের আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে ইঙ্গিত দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ জনসেবার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। 

সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা এবং রাস্তা সংলগ্ন বিভিন্ন বাসা-বাড়ির দেয়াল দখল করে রেখেছে অসংখ্য পোস্টার। উদ্দেশ্য আগামী দিনে স্থানীয় সরকারের অনুষ্ঠিতব্য পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষে মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নিজেদের পরিচয় জাহির করে ঈদের শুভেচ্ছা বার্তা জানান দেওয়া।

এই শুভেচ্ছা সংবলিত ফেস্টুন সাঁটানোর মধ্যে সরকারদলীয় নেতারাই এগিয়ে রয়েছেন

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শ্রীপুরে ঈদের শুভেচ্ছা জানান দিয়ে ইতোমধ্যে পোস্টার ও বিলবোর্ড সাঁটিয়েছেন উপজেলা নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আক্তারুল আলম মাস্টার, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী শ্রীপুর উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি শরিফুল ইসলাম সরকার, শ্রীপুর পৌরসভা নির্বাচনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী শ্রীপুর পৌর বিএনপির সদস্যসচিব বিল্লাল হোসেন, গাজীপুর জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক এস এম আবুল কালাম আজাদ, শ্রীপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল হক মোল্লা, শ্রীপুর পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন, শ্রীপুর পৌর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা খোকন প্রধান, মাওনা ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম সরকার, কৃষক দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সম্পাদক মাসুদ রানা, তেলিহাটি ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক নূরুল আমীন আকন্দ, শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোছলেহ উদ্দিন প্রমুখ। তারা নির্বাচন করবেন বলে ফেস্টুন-ব্যানারে দোয়া চেয়েছেন। আবার অনেকেই শুধু ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তবে সবার উদ্দেশ্য আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি এমনটাই বলছেন ভোটার ও স্থানীয় লোকজন।

শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আক্তারুল আলম মাস্টার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন। পরে দলে সবোর্চ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে দলের মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাই। দলের দুর্দিনে সব শ্রেণির নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছি। নেতাকর্মীদের সুখ-দুঃখ ও বিপদে সবসময় পাশে থেকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছি। আগামী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আমি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জনগণের সেবা করার জন্য চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবো।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগাম প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিরা

একই কথা বলেছেন শ্রীপুর পৌরসভা নির্বাচনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী গাজীপুর জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক এস এম আবুল কালাম আজাদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদের আনন্দঘন মুহূর্তে আমি শ্রীপুর পৌরসভার সর্বস্তরের মানুষকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির পাশাপাশি মানুষের পাশে থেকে কাজ করছি। আগামী নির্বাচনে পৌরবাসীর সমর্থন নিয়ে আমি মেয়র নির্বাচন করতে ইচ্ছুক।’

মাওনা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী আরিফুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে মূল দলেও বিভিন্ন পদে থেকে সবসময় নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম এখনও আছি। পাশাপাশি আমি সবসময় শুম, অর্থ ও বিভিন্নভাবে সেবা দিয়ে এলাকার উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। ঈদের এই শুভক্ষণে সবার দোয়া ও সমর্থন কামনা করছি। নির্বাচিত হলে ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের সমস্যা সমাধান ও সেবা পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।’

এটিকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দৃষ্টিকটু আত্মপ্রচারণা বলে জানিয়েছে সচেতন নাগরিক ফোরাম

শ্রীপুর উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি শরিফুল ইসলাম সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তার ঈদ শুভেচ্ছা সংবলিত বিলবোর্ড এবং গেট নির্মাণের ব্যানারে লেখা রয়েছে আগামী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হবেন।

তবে এ ধরনের প্রচার দৃষ্টিকটু আত্মপ্রচারণার প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে বলে মনে করেন শ্রীপুর পৌর সচেতন নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সস্তা সুনামের আশায় পৌর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না নিয়েই রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন লাগাচ্ছেন। এতে পৌসভার স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। ব্যানার-ফেস্টুনের কারণে ব্যস্ততম মাওনা চৌরাস্তায় চুরি ছিনতাই রোধে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরা কোনও কাজেই আসছে না। এগুলোর কারণে ক্যামেরাগুলো আড়ালে পড়ে গেছে এবং স্বাভাবিক যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। আত্মপ্রচারণার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে ব্যানার-ফেস্টুন সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাকে অমান্য করে রাজনৈতিক নেতারা তাদের দলীয় পরিচিতি তুলে ধারার জন্যই এ সুযোগ নিয়েছেন।’