৭ দিন পর যুবকের লাশ শনাক্ত, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ

নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে অপহরণ করে গুমের অভিযোগ ওঠা সেই যুবকের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। উদ্ধারের সময়কার মরদেহের ছবি দেখে রবিবার (৫ এপ্রিল) দুপুরে মরদেহ শনাক্ত করেন ওই যুবকের স্বজনরা।

লাশ শনাক্ত হওয়া যুবকের নাম মো. শুভ (২১)। তিনি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পূর্ব ইসদাইর এলাকার রসুলবাগের ঝুট ব্যবসায়ী মো. সোহেল মিয়ার ছেলে। গত ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় ফতুল্লার ইসদাইর রেললাইন এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হন শুভ। তাকে অপহরণ করে গুমের অভিযোগে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সাখাওয়াত ইসলাম রানাকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে ১ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন তার মা মাকসুদা বেগম। মামলার অপর আসামিরা হলেন- সাখাওয়াত ইসলাম রানার অনুসারী কাসেম, সাব্বির, শাকিল, পাপ্পু, আলী মিয়া, জাহিদ, রাজ্জাক, ওয়াসিম, লাল শুভসহ অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচ জন। এর মধ্যে সাব্বির, রাজ্জাক ও ওয়াসিমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, ৩০ মার্চ সকালে রূপগঞ্জ থানার কাঞ্চন পৌরসভার কালনি এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা একটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেটির মাথা, মুখমণ্ডল, হাত বা ও বুকে আঘাতের চিহ্ন ছিল। শরীরে জখম ছিল। তখন পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় অজ্ঞাত লাশ হিসেবে দাফনের ব্যবস্থা করেছিল রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। খবর পেয়ে রবিবার সকালে অজ্ঞাতনামা সেই লাশের ছবি দেখে শুভর লাশ বলে শনাক্ত করেন মা।

মামলার এজাহারে শুভর মা মাকসুদা বেগম উল্লেখ করেছেন, অপহরণের ঘটনার ১৫-২০ দিন আগে চাষাঢ়া রেললাইন এলাকায় ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সাখাওয়াত ইসলাম রানার সঙ্গে শুভর বাগবিতণ্ডা হয়। এরপর থেকে রানা ও তার সহযোগীরা শুভকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় রানার অনুসারী শাকিল শুভকে ফোন করে ফতুল্লার পূর্ব ইসদাইর রেললাইন এলাকায় ডেনে নেন। সেখানে যাওয়ার পর রানাসহ তার অনুসারীরা শুভকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। একপর্যায়ে শুভ মাথায় আঘাত পেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান তারা। ওই সময় ইজিবাইকের পেছনে পেছনে শুভর মোটরসাইকেল চালিয়ে নিয়ে যান স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রানা। এরপর থেকে শুভ ও তার মোটরসাইকেলটির কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। 

ছেলের সঙ্গে রানার কী নিয়ে বিরোধ ছিল জানতে চাইলে মা মাকসুদা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তার বাবার ঝুট ব্যবসা অথবা অন্য কোনও বিষয় নিয়ে আমার ছেলের সঙ্গে রানার কথা কাটাকাটি হয়। এ ছাড়া আমার ছেলে আরও কয়েকজন লোকজন নিয়ে রানার চাঁদমারি এলাকার একটি রিকশার গ্যারেজে ভাঙচুর করেছে বলে শুনেছি। মূলত এসব নিয়ে আমার ছেলের সঙ্গে রানার বিরোধ তৈরি হয়। এরপর থেকে তারা ছেলেকে অহপরণ করে নিয়ে যায়। হত্যা করে লাশ গুম করে দেয়। আমি হত্যার বিচার চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ ছবি দেখে ছেলের লাশ শনাক্ত করেছি। অজ্ঞাত হিসেবে শুভর লাশ রূপগঞ্জে দাফন করা হয়েছে। এখন আমার ছেলের লাশ চাই। অন্ততপক্ষে ছেলের হাড়গুলো চাই।’

অপহরণের তিন দিন পর মামলা করার প্রসঙ্গে নিহতের বাবা মো. সোহেল মিয়া বলেন, ‌‘অপহরণের রাতেই থানায় গিয়েছি। তবে পুলিশের সহযোগিতা পাইনি। এ কারণে তিন দিন পর মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ।’

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচএম সালাউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ৩০ মার্চ অজ্ঞাতনামা এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। সে সময় তার পরিচয় না পেয়ে অজ্ঞাত হিসেবে লাশটি দাফন করা হয়। আজ নিহতের স্বজনরা লাশের ছবি দেখে পরিচয় শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে হত্যা মামলা করা হয়েছে। তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত করে অপহরণের ঘটনায় জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

লাশের পরিচয় শনাক্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হাসিনুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ঘটনায় ফতুল্লা থানায় অপহরণের মামলা হয়েছে। আজ সকালে লাশ শনাক্ত করেন স্বজনরা। এখন পর্যন্ত তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’

রূপগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মুক্তার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ৩০ মার্চ শুভর লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। তখন পরিচয় শনাক্ত হয়নি। ময়নাতদন্তে মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। ওই সময় লাশের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় রূপগঞ্জের কালনী রাজউকের কবরস্থানে দাফন করা হয়।’

তদন্তে হত্যার কারণ জানা গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। এ ছাড়া ফতুল্লা থানায় একটি অপহরণের মামলা হয়েছে। তবে কী নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তদন্তে সেটি বেরিয়ে আসবে।’

এ ব্যাপারে জানতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করে বন্ধ পাওয়া যায়।