মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেল চালু হলেও সুন্দরবন সুরক্ষায় উদ্বেগ

মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেলখনন সম্পন্ন হওয়ায় নৌযান চলাচলের উপযোগী হয়েছে মংলা-ঘষিয়াখালি আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেল। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে রক্ষার জন্যই ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই চ্যানেলটি খনন ও পলি অপসারণের কাজ করা হয়। কিন্তু মংলা বন্দর ব্যবহারকারীরা এখনই সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে নৌযান বন্ধে আগ্রহী নন। এর ফলে সুন্দরবনের সুরক্ষার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মীরা।

অভ্যন্তরীণ নৌ বন্দর কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) সূত্র জানায়, মংলা-ঘষিয়াখালি আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেল দিয়ে এখন সর্বোচ্চ ১৫ ফুট গভীরতার পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করছে। ফলে সুন্দরবনের শ্যালা নদী দিয়ে আর কোনও নৌযান চলাচলের প্রয়োজন নেই। খনন সম্পন্ন হওয়ায় নৌ-যান চলাচলের জন্য উপযোগী হয়েছে মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেলটি। অভ্যন্তরীণ নৌ বন্দর কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) চ্যানেলের প্রশস্তকরণ ও সংরক্ষণের জন্য খনন চালিয়ে যাচ্ছে। কার্যকরিতা ঠিক রাখার জন্য এই চ্যানেলের সঙ্গে সংযুক্ত ৮৩টি খালে আরও খনন কাজের দাবি জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, মংলা বন্দরের সঙ্গে দেশের নৌ-যোগাযোগের দূরত্ব কমানোর জন্য ১৯৭৪ সালে ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ মংলা-ঘষিয়াখালি আন্তর্জাতিক নৌরুট চালু হয়। কিন্তু প্রভাশালীরা বাঁধ দিয়ে এই চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত ৮৩টি খালে  চিংড়ি চাষ করে। এছাড়া পলি পড়ে খালের ২২ কিলোমিটার এলাকায় নৌ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এর ফলে ২০১০ সালের পর এই চ্যানেলটি নাব্যতার সংকটে পড়ে। এর কারণে ২০১১ সালে সুন্দরবনের ভেতরের শ্যালা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল শুরু হয়। সুন্দরবনকে সুরক্ষার জন্য ২০১৪ সালের ১ জুলাই ২৫০ কোটি ব্যয়ে মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেল থেকে এক কোটি ঘন মিটার পলি অপসারণের কাজ শুরু হয়। এর মধ্যেই ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনা ঘটে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চ্যানেলটি দ্রুত খনন কাজ শুরু হয়।মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেল

অভ্যন্তরীণ নৌ-বন্দর কর্তৃপক্ষ খুলনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সাঈদুর রহমান বলেন, ‘৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকার দেড়শ থেকে তিনশ ফুট চওড়া চ্যানেলটি ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর খনন শেষ হয়। এরপর নৌ চলাচলের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চ্যানেলটি খুলে দেওয়া হয়। গত এক বছরে মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেল দিয়ে ৬ থেকে ৮ ফুট গভীরতার ২৩ হাজার ৫০১টি এবং ১০ থেকে ১৪ ফুট গভীরতার ৯ হাজার ২৯৬টি পণ্যবাহী কার্গো চলাচল করেছে।’

মংলা বন্দর ব্যবহারকারী সমন্বয় পরিষদের মহাসচিব অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মংলা-ঘষিয়াখালি নৌ চ্যানেলটি সক্রিয় রাখার জন্য অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে সংযুক্ত ৮৩টি খাল অবমুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি চ্যানেলটি নিয়মিত ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে হবে। তাহলেই এ চ্যানেল সচল থাকবে এবং পানি প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে চ্যানেলটির নাব্যতা ধরে রাখা সম্ভব হবে। এর ফলে ধীরে ধীরে চ্যানেলের গভীরতাও বৃদ্ধি পাবে।’

তিনি আরও  বলেন, ‘ঘষিয়াখালি চ্যানেলটিতে ১৫ ফুট গভীরতার নৌযান চলাচল করতে পারছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ভালো অবস্থান। কিন্তু এখনই সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে নৌযান চলাচল একেবারেই বন্ধ করলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শ্যালা নদী দিয়ে কিছু এলাকায় সহজেই দ্রুততার সঙ্গে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু ওইসব রুটে ঘষিয়াখালি হয়ে যেতে হলে সময় ও খরচ বেড়ে যাবে। তাই বিষয়টি ভাবনায় রাখতে হবে। আর ব্যবসায়ীরা শ্যালা নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ভাবনায় রাখবেন।’মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেল

পরিবেশ অধিদফতরের খুলনার বিভগীয় পরিচালক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘চ্যানেলটি পরিপূর্ণভাবে চালু থাকলে মংলা বন্দর সক্রিয় থাকবে। আর এ অঞ্চলের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটবে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সুরক্ষাও মিলবে।’

খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুস সামাদ বলেন, ‘মংলা-ঘষিয়াখালি নৌ চ্যানেল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করা সম্ভব হবে। তাহলেই তেলবাহী ট্যাংকার ও সার বোঝাই জাহাজ ডুবির মতো নৌ দুর্ঘটনার হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করা সহজ হবে।’

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নৌ চ্যানেলটির সঙ্গে সংযুক্ত উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ২৩৪টি খালের প্রত্যেকটি খাল এলাকার প্রভাবশালীরা ১ হাজার ৮০০- এর বেশি অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে প্রায় দুই যুগ ধরে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ করে আসছিল। ফলে চ্যানেলের সঙ্গে সংযুক্ত এ সব খাল মরে যায়। এতে আন্তর্জাতিক এ রুটের নাব্যতা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। এক পর্যায়ে ২০১১ সালে চ্যানেলটি নৌ চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে যায়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে গেলে সরকার ওই রুটটি বন্ধ করে দিয়ে মংলা-ঘষিয়াখালি আন্তর্জাতিক চ্যানেলটি খননের মাধ্যমে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেল 

এ অবস্থায় বাগেরহাট জেলা প্রশানের পক্ষ থেকে বিষয়টি তুলে ধরা হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৬ সালের জুন মাসে ২৩৪টি সরকারি খালের অবৈধ ১ হাজার ৮০০টি বাঁধ অপসারণের জন্য ৬৩২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর এ বছর খালের বাঁধ অপসারণে প্রশাসন মাঠে নামে।

বিআইডব্লিটএর  অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এস এম ফরহাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা অনেক আগেই পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চ্যানেল সংলগ্ন খাল কেটে দেওয়ার কথা বলেছিলাম। বর্তমানে খালগুলো কেটে দেওয়ার ফলে এই চ্যানেলে পানি প্রবাহ বেড়ে গেছে এবং পলি পড়ার হার  অনেক কমে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চ্যানেল দিয়ে ১২ ফুট গভীরতার জাহাজ চলাচলের অনুমতি থাকলেও বর্তমানে ১৫ ফুট গভীরতায় জাহাজ অনায়াসে যাতায়াত করতে পারছে।’মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেল

রামপাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজিব কুমার রায় বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে স্থানীয় সাংসদ, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সরকারি খালের অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মংলা-ঘষিয়াখালি চ্যানেল সংলগ্ন সরকারি খাল অবমুক্ত করে দেওয়ার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক এই নৌরুটের ওপর। প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা সরকারি খালগুলো অবমুক্ত করে দেওয়ার ফলে জোয়ারের সময় চ্যানেলের পানি ওই সব খাল ও তার শাখা প্রশাখায় যায় এবং তা আবার ভাটার সময় নেমে আসছে। ফলে চ্যানেলে পানি প্রবাহ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে স্রোত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পলি জমার হার কমতে শুরু করেছে। ড্রেজিংয়ের পর ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে চ্যানেলটি খুলে দেওয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ এ রুট দিয়ে মংলা বন্দরে চলাচল করছে। ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে খাল কেটে দেওয়ায় এ চ্যানেলটি খুব বেশি সক্রিয় হয়েছে বলে চ্যানেল বিশেষঞ্জরা মনে করছেন।

আরও পড়ুন- 


চীনের প্রেসিডেন্টের কাছে বিএনপির দুই প্রত্যাশা

/এআর/এফএস/