রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে বাড়ছে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিন ১৫-২০ জন করে মারা যাচ্ছেন। একই সঙ্গে হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারি চলছে। আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে করোনায় ছয় জন ও উপসর্গে ১৩ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে গত ১১ দিনে ১৯০ জনের মৃত্যু হলো। রবিবার (১১ জুলাই) সকালে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর ৪৩ থেকে ৪৫ শতাংশই করোনা ইউনিটের। যেটা আরও বৃদ্ধির শঙ্কা প্রকাশ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমন শঙ্কাকে আগে থেকে আঁচ করে আগামী দুই সপ্তাহের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান হাসপাতাল পরিচালক।
এদিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কিছুক্ষণ পরপর স্বজনের আহাজারি শোনা যায়। হাসপাতালে আনার পর জরুরি বিভাগে কিংবা করোনা ওয়ার্ডে মৃত্যু হচ্ছে কারও কারও।
রবিবার হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, করোনার ইউনিটগুলোতে আক্রান্ত রোগীর সেবায় ব্যস্ত সময় পার করছেন স্বজনরা। প্রায় সব রোগীর মুখে অক্সিজেন ও মাস্ক। অনেক রোগী নাভিশ্বাস ছাড়ছেন। কয়েকজন রোগীকে হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা দিতে দেখা যায়।
হাসপাতালের ২২ নম্বর করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর ছেলে ওসমান আলী জানান, তার বাবাকে এক সপ্তাহ আগে ভর্তি করেছেন। প্রথমদিকে অবস্থা খারাপ থাকলেও এখন ভালো। তার স্যালাইন চলছে। কিন্তু তিনি স্থির থাকছেন না। কয়েকবার হাত থেকে রক্তও ঝরেছে। তাই বেড থেকে নামিয়ে বারান্দায় রেখেছেন।
তিনি আরও জানান, করোনা ইউনিটে রোগীদের খাবার থেকে শুরু ব্যবস্থাপনা সুন্দর। তবে মাঝেমধ্যে নার্সদের ডাকলে আসেন না। আন্তরিক চিকিৎসক আছেন। হাসপাতাল থেকে বেশ কিছু ওষুধ ও ইনজেকশন সরবরাহ করা হয়। গত সাত দিনে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার।
হাসপাতালের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন দাদির সেবা করছিলেন ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি জানান, তাদের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে। গত পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে। করোনা রোগীদের হাসপাতাল থেকে যে সহযোগিতা করা হয় সেটি ইতিবাচক। কিন্তু গরিব রোগীদের জন্য সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা ভালো পাচ্ছেন। তবে যাতায়াতে বেশি ভাড়া গুনতে হয়। কুষ্টিয়া থেকে প্রায় ১৮ হাজার টাকা শুধু ভাড়া গুনতে হয়েছে তাদের।
শামীম ইয়াজদানী বলেন, রাজশাহী মেডিক্যালে করোনা রোগী বাড়ছে। এদের অধিকাংশ খুব খারাপ অবস্থায় ভর্তি হচ্ছেন। যাদের প্রায় প্রত্যেকের অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। করোনা রোগীদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। করোনা ওয়ার্ড ঘুরে দেখেছি। রোগীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তবে যে হারে রোগী বাড়ছে, চিকিৎসা দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা চিকিৎসক ও নার্সের তুলনায় রোগী বেশি। রোগী বাড়লে চিকিৎসাসেবা কমে যায়। রোগীদের সন্তুষ্টির মাত্রাও কমে। চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে কোনও রোগী চিকিৎসা অবহেলায় মারা না যায়।
শামীম ইয়াজদানী আরও বলেন, শনিবার (১০ জুলাই) সকাল ৮টা থেকে রবিবার (১১ জুলাই) সকাল ৮টার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে রাজশাহীর নয়, নাটোরের ছয়, পাবনার এক, নওগাঁর দুই ও কুষ্টিয়ার এক জন রয়েছেন। এদের মধ্যে করোনা নেগেটিভ হওয়ার পর মারা গেছেন দুই জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৪ জন। বর্তমানে হাসপাতালের ৪৫৪টি করোনা ডেডিকেটেড শয্যার বিপরীতে ৫১৮ জন রোগী ভর্তি আছেন।
শনিবার রাতে দুটি ল্যাবে রাজশাহী জেলার ৪৯৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১২৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ২৫ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা আগের দিনের তুলনায় ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ কম। এর আগের দিন শুক্রবার ছিল ৩৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। গত বৃহস্পতিবার ছিল ১৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, বুধবার ছিল ২৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ, মঙ্গলবার ছিল ২১ দশমিক ৯২ শতাংশ, সোমবার ২৯ দশমিক ০৩ শতাংশ।
ঈদুল ফিতরের পর থেকে রাজশাহীতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় গত ১১ জুন সিটি করপোরেশন এলাকায় এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করে প্রশাসন। পরে সেটা দুই দফা বাড়িয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর ১ জুলাই থেকে কঠোর লকডাউন শুরু হয়।