বৃষ্টি এলেই ভিজতেন, রোদ উঠলেই পুড়তেন; অবশেষে ঘর পেলেন কফিল প্রামাণিক

ওপরে পলিথিনের ছাউনি। পাটখড়ির বেড়া। ভেতরে ছোট্ট একটি চৌকি। ছাউনির পলিথিন ভেদ করে প্রখর রোদের আঁচে অতিষ্ট হতেন। বৃষ্টি এলে গড়িয়ে পড়তো পানি। আবার বাতাস এসে উড়িয়ে নিত পলিথিনের ছাউনি-পাটখড়ির বেড়া। জীর্ণ শীর্ণ সেই ঘরে এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে কষ্টে বাস করছিলেন বৃদ্ধ কফিল প্রামাণিক (৭০) এবং তার ৫২ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী ছেলে আসমত।

তবে বৃদ্ধ কফিল প্রামাণিকের কষ্টের দিন শেষ হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের দেওয়া টিনের ছাউনির একটি ঘর পেয়েছেন তিনি। কফিল প্রামাণিকের নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়নের মানইর গ্রামের বাসিন্দা।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, শুক্রবার বিকালে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ আনুষ্ঠানিকভাবে ওই বৃদ্ধের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন। মাথা গোঁজার নিরাপদ ঠাঁই পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন বৃদ্ধ পিতা-পুত্র।

বৃদ্ধ কফিল প্রামাণিক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বৃষ্টি এলেই পলিথিন ছাপিয়ে পানি পড়তো তার ঘরে। এখন না খেয়ে থাকলেও শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন। তিনি সংসদ সদস্যসহ অন্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

বড়াইগ্রাম উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, মানইর গ্রামের পাকা সড়ক ঘেঁষে কফিল প্রামাণিকের পলিথিনের ছোট্ট সেই ঘর। সেখানেই বৃদ্ধ কফিল প্রামাণিক ও তার প্রতিবন্ধী ছেলে বাস করতেন। তাদের দুর্দশা নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি স্থানীয় সংসদ সদস্যের নজরে আসে। কফিল প্রামাণিকের নিরাপদ আবাস তৈরিতে উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এমপির নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অর্থায়ন করা হয় ঘর নির্মাণের জন্য। সহায়তায় এগিয়ে আসে ঢাকাস্থ বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতি। যৌথ অর্থায়নে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় এক কক্ষের একটি টিনের বেড়া টিনের ছাউনির ঘর নির্মাণ করা হয়।

খোকন মোল্লা, আরদেশ আলীসহ বেশ কয়েকজন বলেন, জীবনের এক পর্যায়ে পোলিও রোগে আক্রান্ত ছেলে আসমত অন্ধ হয়ে যান। স্ত্রী সন্তান নিয়ে তারও সংসার ছিল। অন্ধ হওয়ার পর স্ত্রী ছেড়ে চলে যান। মারা যান মেয়েটিও। সেই থেকে বাবা কফিল প্রামাণিকের সঙ্গেই বসবাস তার। নিজেদের নামে এক টুকরো জমি থাকলেও সেখানে ঘর তোলার সামর্থ্য ছিল না। এর মধ্যে প্যারালাইজড হয়ে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন কফিল প্রামাণিকও। তবে জীবিকার তাগিদে অন্যের দুয়ারে সাহায্যের জন্য ছুটতেন আসমত। যা জুটতো তাতেই দিনাতিপাত করতেন বাবা-ছেলে। বাস করতেন জীর্ণ সেই ঘরে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য বলেন, পলিথিনের ঘর বাস করা পিতা-পুত্রের জন্য রোদ-বর্ষা কোনটিই স্বস্থির ছিল না। অসুস্থ দুই ব্যক্তি অসহায় জীবন যাপন করতে দেখে তারাও ব্যথিত হতেন। আর্থিক টানাপোড়েনে দুই বেলা আহার যোগাড় করাই কঠিন ছিল। সেখানে একটি ঘর নির্মাণ করা ছিল স্বপ্নের মতো।

কফিল প্রামাণিকের সেই স্বপ্ন পূরণে ঘরের চাবি নিয়ে হাজির হন এমপি আবদুল আজিজ। এ সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট দূর করতে বিদ্যুৎচালিত পানির পাম্প দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন সংসদ সদস্য। এছাড়া আর্থিকভাবে ওই বৃদ্ধের পাশে দাঁড়ানোয় ধন্যবাদ জানান তিনি।

চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বড়াইগ্রাম উপজেলা সমিতির সভাপতি সাবেক সিভিল সার্জন শামসউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসাইন, জোনাইল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম রাসেল, পিকেএসএফের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মনির হোসেনসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।

আসমত আলী বলেন, বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ব্যাপক কষ্টে ছিলেন। পলিথিনের ঘুম আসতো না। বৃষ্টি এলেই পড়তো পানি। ঘর পেয়ে সব সংকট দূর না হলেও অন্তত মাথাগুজার ঠাঁই পেলেন তারা। এখন দিনশেষে ভিক্ষা করে বাড়ি ফিরলেও রাতে অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন তারা।

সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ বলেন, বৃদ্ধের দুঃখে কষ্টে বসবাস করার দিনগুলো এখন অতীত। নতুন ঘরটিতে এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন প্রবীণ কফিল প্রামাণিক। এই বৃদ্ধের অন্যান্য সংকট দূর করতে তিনি ব্যবস্থা নেবেন।